সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছেন ‘গৃহে যে দাসী, শয়নে যে অপ্সরা, বিপদে যে বন্ধু, রোগে যে বৈদ্য, কার্য্যে যে মন্ত্রী, ক্রীড়ায় যে সখী, বিদ্যায় যে শিষ্য, ধর্মে যে গুরু এমন স্ত্রীকে কি কেউ পরিত্যাগ করিতে পারে?’ এই অমর বাণীর বাস্তব প্রতিফলন যেন আমরা দেখলাম উর্মি হীরার জীবনে। একজন আদর্শ জীবনসঙ্গী পাওয়া সত্যিই ঈশ্বরের পরম আশীর্বাদ যা এসেছিল বুলেট বৈরাগীর জীবনে। মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রেমের অসংখ্য অমর কাহিনি আমরা পড়েছি মহাভারত–এর অনন্ত প্রেমগাথা, কবি চণ্ডীদাস–এর প্রেমের কাব্য, সম্রাট শাহজাহান ও মমতাজ মহল–এর চিরন্তন ভালোবাসা। কিন্তু আধুনিক যুগে রক্তমাংসের মানুষকে কেন্দ্র করে এমন এক ভালোবাসার দৃষ্টান্ত আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রত্যক্ষ করলাম যা সত্যিই হৃদয়কে নাড়া দিয়েছে।
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘নারী’ কবিতায় লিখেছিলেন -‘দিবসে দিয়াছে শক্তি–সাহস, নিশীথে হয়েছে বধূ,/ পুরুষ এসেছে মরুতৃষা লয়ে, নারী যোগায়েছে মধু।’ এই মধুময় নারীত্বের এক জীবন্ত উদাহরণ আজ উর্মি হীরা। এক তরুণ কর্মকর্তার অকাল বিদায়– কুমিল্লা কাস্টমসের বিবিরবাজার স্থলবন্দরের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী চট্টগ্রামে বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ শেষে ২৪ এপ্রিল ২০২৬ শুক্রবার রাতে বাসায় ফেরার পথে কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকায় দুর্বৃত্তদের কবলে পড়ে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। চারজন দুর্বৃত্ত সিএনজি থেকে সবকিছু লুট করার পর তাকে হত্যা করে যা আমাদের সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের এক ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি।
গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া গ্রামের দীনমজুর সুশীল বৈরাগী ও নীলিমা বৈরাগীর একমাত্র সন্তান ছিলেন বুলেট বৈরাগী। নামের মতোই তিনি ছিলেন স্বপ্নবাজ, সংগ্রামী ও মেধাবী। কঠোর পরিশ্রম আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে দারিদ্র্যকে জয় করে ৪১তম বিসিএসে নন–ক্যাডার পদে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন।
স্বপ্নপুরুষ এ পি জে আবদুল কালাম বলেছিলেন, ‘দারিদ্র্যে জন্ম নেওয়া পাপ নয়, কিন্তু দারিদ্র্যে মৃত্যু বরণ করাই পাপ।’
বুলেট বৈরাগী সেই দারিদ্র্যকে জয় করে জীবনযুদ্ধে বিজয়ী হয়েছিলেন। ২০২২ সালের ২৩ এপ্রিল তিনি বাগেরহাটের চিতলমারীর প্রাণীবিদ্যায় অনার্স সম্পন্ন করা উর্মি হীরার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের এক বছর বয়সী পুত্র সন্তান অব্যয় বৈরাগী এই দম্পতির ভালোবাসার স্মারক।
উর্মি হীরা: ত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত– বিয়ের মাত্র তিন বছরের মাথায় স্বামীর আকস্মিক মৃত্যু যে আঘাত যেকোনো মানুষের জীবন ভেঙে দিতে পারে। কিন্তু উর্মি হীরা দৃঢ়তা, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের এক অনন্য উদাহরণ স্থাপন করেছেন। তিনি শ্বশুর–শাশুড়ির পাশে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়ে বলেছেন, ‘আমি হয়তো তোমাদের ছেলের জায়গা পূরণ করতে পারব না, কিন্তু চেষ্টা করব তোমাদের নিজের বাবা–মায়ের মতো আগলে রাখতে।’
আজকের ভোগবাদী সমাজে এই সিদ্ধান্ত শুধু বিরল নয় এটি মানবতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, নারী শুধু ভোগ বা স্বার্থের প্রতীক নয় নারী ত্যাগ জানে, দায়িত্ব নিতে জানে, দুর্দিনে মানুষের পাশে দাঁড়াতে জানে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার এই মানবিক সিদ্ধান্ত লাখো মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছে। তিনি আজ অনেকের কাছে একজন আদর্শ নারী। অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব: সরকারি চাকরির নীতিমালা অনুযায়ী পাঁচ বছর পূর্ণ না হওয়ায় বুলেট বৈরাগীর পরিবার পেনশন বা গ্র্যাচুইটি সুবিধা নাও পেতে পারে যা পরিবারটিকে চরম আর্থিক অনিশ্চয়তায় ফেলেছে। একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তানের মৃত্যুতে পরিবারটি আজ অসহায়। তাই দেশবাসীর একটাই প্রত্যাশা: মানবিক বিবেচনায় সরকার যেন উর্মি হীরার যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে এবং পরিবারটিকে এককালীন আর্থিক সহায়তা প্রদান করে। একজন মেধাবী তরুণ কর্মকর্তার অকাল মৃত্যু যেন তার পরিবারকে সম্পূর্ণ নিঃস্ব না করে এটাই আমাদের সম্মিলিত প্রত্যাশা।










