আমাদের চন্দনদা

শৈবাল চৌধূরী | সোমবার , ৮ জুন, ২০২৬ at ১০:৩৪ পূর্বাহ্ণ

৪৩ বছরের সম্পর্ক চন্দনদার সঙ্গে। ১৯৮৩ সাল থেকে। চলচ্চিত্র সংসদের কার্যক্রমের সূত্রে। তিনি চট্টগ্রাম চলচ্চিত্র সংসদের সদস্য ছিলেন। আমন্ত্রণপত্র দিতে যেতাম তাঁর সদরঘাটের চেম্বারে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি তখন। দাদার চেম্বারে গেলে কথা বলতেন অনেকক্ষণ। সিনেমা নিয়ে, সংগীত নিয়ে, গল্পচ্ছলে রাজনীতির প্রসঙ্গও আসতো। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতি নিয়েও আলাপ করতেন। এখন বুঝি, তিনি রাজনীতির পাঠ দিতেন, যা অক্ষুণ্ন ছিল সবসময়। ক্রমশ তাঁর বাসায় যাওয়াআসা শুরু হয়। চন্দনদার মেজভাই গোপাল ও ছোটভাই জয়ের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তারাও যুক্ত হয় চলচ্চিত্র সংসদ চর্চায়। আর আমিও উদীচীর সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়ি। তাদের বাসায় আসা যাওয়াটা অনেকটা নৈমিত্তিক হয়ে ওঠে।

উনার কাছে যখন আমার যাওয়া শুরু তারও আগে থেকে তিনি চট্টগ্রাম উদীচীর সাধারণ সম্পাদক। উদীচীরও তখন বেশ রমরমা অবস্থা। মৃদুল সেন, মিহির নন্দী, রবীন দে, চন্দন দাশ, প্রবাল দে প্রমুখের নেতৃত্বে চট্টগ্রামের সংস্কৃতি অঙ্গনের বিশিষ্ট জনদের প্রায় সকলেই উদীচীতে সমবেত। ছিল নবীন তরুণ এক বিশাল কর্মীবাহিনী। সব মিলে প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর এক সংগঠন, যেটি ছিল বৃহত্তর চট্টগ্রামের একটি সমুজ্জ্বল প্ল্যাটফর্ম।

বড়দের সাহচর্য সবসময় পাওয়া সম্ভব না হলেও শ্রদ্ধাভাজন মৃদুল সেন, মিহির নন্দী, রবীন দে, এঁদেরকে প্রায়শই পেতাম। তবে তাঁদের সঙ্গে একটা সমীহের সম্পর্ক ছিল। কিন্তু আমাদের নেতা ছিলেন চন্দন দা। অগ্রজ হলেও তাঁর সঙ্গেই চলতো মানঅভিমান, অনুরোধআবদার, রাগ অনুরাগ সবকিছু। ভুলত্রুটি হলে শান্তভাবে বুঝিয়ে ভুল ধরিয়ে দিয়ে সঠিক পথটি বাতলে দিতেন।

তাঁদের মোমিন রোডের বাসাটি ছিল আমাদের, বিশেষ করে আমার আরেকটি আবাস। গোপালের কাছেই যাওয়া হতো বেশি। প্রয়োজনেঅপ্রয়োজনে সে বাসায় যাওয়া হতো যে কোনো সময়। জবা বৌদি, জয় ও গৌরীর সঙ্গেও ছিল অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক। মিশু তখন নিতান্তই শিশু। বিনির জন্ম আরও পরে। আর ছিল মাসী ও মেশোর স্নেহার্দ্র আচরণ। সবকিছু মিলে যথেষ্ট সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ পাওয়া যেত সে বাসায়।

১৯৯৬ সালে কবিয়াল ফনী বড়ুয়াকে নিয়ে ‘দীপ্ত পদাবলী’ নামে আমি একটা প্রামাণ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করি। এ ছবির নির্মাণের সঙ্গে গোপালও শুরু থেকে যুক্ত ছিল। সে ছিল এ ছবির সংগীত পরিচালক। ছবিতে ফনী বড়ুয়া রচিত অনেকগুলি গান ছিল। তখন চট্টগ্রামে সাউন্ড রেকর্ডিং স্টুডিও ছিল না। চন্দনদার বাসার ড্রইংরুমকে গোপাল স্টুডিওর মতো তৈরি করে দুইদিন ধরে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত গানের রিহার্সাল, রেকর্ডিং ও আবহ সংগীত নির্মাণ করেছিল। স্বভাবতই বাসায় অনেক অসুবিধা তৈরি হয়েছিল যা বাসার সবাই মেনে নিয়েছিলেন সাদরে। আর পুরো টিমের আপ্যায়নের সুব্যবস্থা তো ছিলই। রেকর্ডিং হয়েছিল ৯৪ সালে।

চট্টগ্রামের সকল সামাজিক, রাজনৈতিক এবং মুখ্যত সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও কর্মকান্ডের অগ্রভাগে সাহসী ও অগ্রণী ভূমিকায় অবধারিত থাকতেন ডা. চন্দন দাশ। নিজের সততা, নিষ্ঠা ও দায়বদ্ধতার গুণে তিনি এই অপরিহার্যতা অর্জন করে নিয়েছিলেন। এসব কর্মকাণ্ডে ব্যস্ততার কারণে তিনি তাঁর নিজের ক্যারিয়ারকে গুরুত্ব দেননি। সংসারের নৈমিত্তিক ব্যয় নির্বাহের প্রয়োজনে প্রাইভেট প্র্যাকটিস ও চাকুরি (বিমান) করলেও সেদিকে বেশি সময় দেননি। অথচ তাঁর মতো একজন জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক ইচ্ছে করলেই রমরমা পসার জমাতে পারতেন।

উদীচী ছাড়াও খেলাঘর, রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ, বিজয় মেলা (প্রথম দিকে), নববর্ষ উদযাপন পরিষদ, রবীন্দ্র জয়ন্তী পরিষদসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে প্রত্যক্ষে পরোক্ষেযুক্ত ছিলেন প্রথম থেকে। বিশেষ করে পহেলা বৈশাখ উদযাপন, এরশাদের শাসনামলে স্বৈরাচার বিরোধী কবিতা উৎসব, বিজয় মেলাএসবের আয়োজনে তাঁর ছিল অগ্রণী ভূমিকা। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ সব সামাজিক আন্দোলন যেমন, মে দিবস উদযাপন, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন, সিআরবিতে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা বিরোধী আন্দোলনে তিনি ছিলেন অন্যতম পুরোধা।

১৯৭০, ৮০ ও ৯০ এর দশকে উদীচীর দ্বিবার্ষিক সম্মেলনগুলি ছিল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের একেকটি স্মরণীয় অধ্যায়। এসব সম্মেলনের অগ্রভাগের কান্ডারী থাকতেন চন্দন দা। ১৯৮৮ সালের দ্বিবার্ষিক সম্মেলনটি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ আয়োজন। সে সময় এরশাদের দোর্দন্ড প্রতাপ এবং এরশাদ বিরোধী আন্দোলনও তুমুল তুঙ্গে। সেই চরম বিপদসংকুল পরিবেশে উদীচীর এই আয়োজন ছিল দুঃসাহসিক। দুদিনব্যাপী সেই সম্মেলন চট্টগ্রাম শহরে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে যেন ঘৃতাহুতি দিয়েছিল। ড. মাহবুবুল হক রচিত গীতি আলেখ্য ‘জ্বলছে বুকে ক্রোধের আগুন’ ছিল সে সম্মেলনের এক বড় আকর্ষণ। সমসাময়িক কিছু রাজনৈতিক প্রহসন গীতি এবং তৎসম্পর্কিত অভিনয়ের সমন্বয়ে আলেখ্যটি বিপুল সমাদৃত হয়েছিল। আমরা সে সময়ে উদীচীর নবীন প্রবীণ সকল কর্মীরা এই আলেখ্যানুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলাম। আলেখ্যটি চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলাতেও মঞ্চস্থ হয়েছিল। বলা বাহুল্য, এই বিশাল কর্মযজ্ঞের নেতৃত্বের পুরোধাদের মুখ্যতম ছিল চন্দন দা।

১৯৯৬ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে ৫টি সংগঠন মিলে চট্টগ্রাম শহর ও শহরতলীর ২৫ টি স্থানে গণসংগীত, নাটক, নৃত্য, আবৃত্তি ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর সমন্বয়ে চমৎকার ২৫টি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। স্মরণীয় সেই অনুষ্ঠানমালারও নেতৃত্ব ও পরিচালনায় অগ্রভাগে ছিলেন ডা. চন্দন দাশ, আমাদের সকলের চন্দনদা। সংঘবদ্ধ আন্দোলনে বিশ্বাসী মানুষটি চাইতেন সবাইকে নিয়ে কাজ করতে। সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণকে সবসময় গুরুত্ব দিতেন সে কারণে উন্মুক্ত স্থানে অনুষ্ঠানের পক্ষপাতী ছিলেন বেশি। এটি তাঁর প্রগতিশীল ও পরিশীলিত রাজনীতির চর্চা থেকে জাত ছিল। ফলে জীবনের শেষ বছরগুলিতে রাজনীতি, সংস্কৃতি ও সামাজিকতার নানা বিভেদএ বিচ্ছিন্নতা তাঁকে পীড়িত ও ব্যথিত করে তুলেছিল। জীবনের শেষ দিনগুলিতে এসব কারণে অনেক অভিমানও জমেছিল আজীবন খেটে চলা সৎ, নির্লোভ, নিষ্ঠাবান মানুষটির মনে। জীবনের শেষ মাসগুলি অসুস্থতায় কাটিয়েছেন দীর্ঘসময় ধরে অজস্র মানুষকে চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাওয়া মানুষটি।

১৯৫২ সালের ১০ অক্টোবর জন্ম নেয়া এই কর্মবীর ৭৪ বছর বয়সে বিদায় নিলেন ২০২৬ এর ২৯ মে সকালে। চন্দনদা জীবনকে সব সময় ইতিবাচকভাবে দেখতেন। হতাশাবোধ দেখিনি কখনও তাঁর মধ্যে। ২০২৩ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম ফিল্ম ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার সময়ে তিনি আমাকে সাহস ও উৎসাহ যুগিয়ে গেছেন প্রত্যক্ষভাবে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে আমাদের উদ্যমী করে তুলেছিলেন। জীবনে এ পর্যন্ত চলার পথে নানা বিষয়ে তাঁর পরামর্শ নিয়ে চলাচলকে সুগম করতে সমর্থ হয়েছি অনেকবার। প্রিয় অভিভাবক চলে গেলেন। জীবনের পৃথিবীটা আরও ছোট হয়ে এলো।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবায়োস্কোপ: হারিয়ে যাওয়া এক শৈশব
পরবর্তী নিবন্ধসন্দ্বীপে শিশু শিক্ষার্থীকে বলাৎকারের অভিযোগে মাদ্রাসা পরিচালক গ্রেপ্তার