পাহাড় আর সমুদ্রের এক নৈসর্গিক মিতালী বাংলাদেশের দক্ষিণের উপকূলীয় দ্বীপ মহেশখালী। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি। যেখানে হিন্দু, মুসলমান আর বৌদ্ধ সমপ্রদায়ের মানুষ মিলে মিশে বসবাস করেন একই ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে। ১৯৯১ সালের ২৯ শে এপ্রিল দিনটি ছিল দ্বীপের শান্তিপ্রিয় মানুষের জীবনের এক ভয়াবহ দিন। সেদিনটি ছিল সোমবার। সকাল থেকেই গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। বেলা বাড়ার সাথে সাথেই বাতাসের তীব্রতা বাড়তে থাকে। মাইকে ঘোষণা করতে শোনা যায়, ১০ নং মহাবিপদ সংকেত! সবাইকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে বলা হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাসের রূপ নিতে পারে। ২০ ফুটের অধিক উচ্চতায় জলোচ্ছ্বাস হতে পারে। মাইকের ঘোষণা শুনেই মানুষের মনে ভয় আর উদ্বেগের সৃষ্টি করে। বিকাল গড়াতেই বাতাসের দাপট আরো বাড়তে থাকে। বাতাসের বেগ ছিল ঘণ্টায় ২৪০ কিলোমিটার। ছিল না বিদ্যুৎ, এর একদিন পরই স্কুলের মাধ্যমিক পরীক্ষা। বাবা ব্যস্ত তাঁর অর্পিত দায়িত্ব, কেন্দ্রের আসন বিন্যাসের কাজ নিয়ে। সন্ধ্যা পার হতেই খাবার খেতে মায়ের ডাক। আজ আর পড়তে হবে না, ‘খাবার খেতে আস সবাই’। এদিকে বাইরে বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ আর বাতাসের বিকট ঘূর্ণীর শব্দ ক্রমশ বাড়ছে। এর একটু পর প্রচণ্ড ঝড় শুরু হয়ে যায়, চারদিক থেকে বড় বড় গাছপালা আর বাড়ি ঘরের টিন খুলে আছড়ে পড়ছে মাটিতে। ঘরের দরজা খুলে বাবা বাইরে টর্চের আলো ফেলে দেখেন একটু দূরে মাঠে পানি চলে আসছে। আমরা তিনবোনকে নিয়ে বাবা অতিকষ্টে পাশের আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছান। এর পরই দ্রুত ঝড়ের তাণ্ডব বাড়তে থাকে, বাড়তে থাকে জলোচ্ছ্বাসের পানির উচ্চতা। সারারাত ধরে চলা এই ঝড় আর জলোচ্ছ্বাসের তাণ্ডবে ভেসে যায় ঘরবাড়ি, টিনের চাল,গবাদি পশু, শষ্যক্ষেত, লবণের মাঠ, মাছের ঘের। এই ঝড়ে বাংলাদেশের উনিশটি জেলার একশ দুইটি উপজেলা মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রাণ হারায় এক লাখ আটত্রিশ হাজার মানুষ। বিধাতার অশেষ কৃপায় আমরা প্রাণে বেঁচে যাই। পরদিন ঘরে ফিরে দেখি ঘরের ভিতর নানা রকম মাছ খেলা করছে। ঘরের পানি কমে এসেছে। আসবাবপত্র ভাসছে তখনও পানিতে। আর চারদিকে মানুষ, গবাদি পশুর সারি সারি মৃতদেহ আসছে ভেসে। এ যেন এক মৃত্যুপুরী! নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে সমস্ত ঘর বাড়ি স্কুল কলেজসহ সমস্ত স্থাপনা। সে এক বিভীষিকাময় রাত ছিল মহেশখালী, কুতুবদিয়া, সেন্টমার্টিনসহ উপকূলবাসীর জীবনে। এভাবে সে রাতে মুছে গেছে কত জীবনের রং চিরতরে হাতের মেহেদীর রং মুছার আগেই। কত মা হয়েছেন সন্তানহারা, আপনজন হারিয়ে শোকে স্তব্ধ। শোনা গেল পাশের পাড়ার আমার স্কুলে যাওয়ার সাথী দিদিটি তার ছোট ভাইটিকে কোলে নিয়ে আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়ার সময় পানিতে পড়ে গেলে দুজনেই মারা যায়। এভাবে কোন কোন পরিবারের একজন বা দুইজন সদস্য প্রাণে বেঁচে ছিল, বাকীরা সবাই মারা যায়। এভাবে ঘরবাড়ির ধ্বংসস্তূপ আর স্বজন হারানো মানুষের আত্ম চিৎকারে ভারী হয়ে উঠেছিল উপকূলবাসী মানুষের জনজীবন। তখন আমি সবে প্রাথমিকের গণ্ডি পার হয়েছি, এসব স্মৃতি আজ ও তাড়া করে। আজও স্বজনহারা মানুষ তাদের আপনজন হারানোর বেদনায় হয়তো নীরবে কাঁদে। ২৯ শে এপ্রিলের প্রাকৃতিক দুর্যোগের সেই ভয়াবহ রাতের স্মৃতি মনে জেগে থাকবে চিরকাল।













