‘স্বপ্নবিলাসী’ হলেও বাজেটের সফলতা নির্ভর করবে তার বাস্তবায়নের ওপর

| শুক্রবার , ১২ জুন, ২০২৬ at ৫:৪৫ পূর্বাহ্ণ

জাতীয় সংসদে ২০২৬২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এবার প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জাতীয় বাজেট। এটি বিএনপি সরকারের ১৭তম এবং অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রথম বাজেট। বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে এ বাজেট প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, বাংলাদেশকে ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়ে উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, বিনিয়োগ, জ্বালানি ও তথ্যপ্রযুক্তিসহ ১০টি অগ্রাধিকার খাত ঘোষণা করা হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে।

প্রস্তাবিত বাজেট বক্তৃতায় জানানো হয়, আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফেরানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে সরকার ১০টি প্রধান অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছে।

২০২৬২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রাজনৈতিক নেতারা। কেউ একে উচ্চাভিলাষী, কেউ স্বপ্নবিলাসী, আবার কেউ গতানুগতিক বাজেট বলে মন্তব্য করেছেন। বিশেষ করে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি রেখে বাজেট কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। তবে কয়েকজন নেতার মতে, প্রস্তাবিত বাজেট জনবান্ধব। কারণ এতে সামাজিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তা খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় মেগা প্রকল্পের প্রস্তাবকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন তারা। তবে সঠিক পরিকল্পনা না থাকলে এসব উদ্যোগ ‘স্বপ্নবিলাসী’ হয়ে যেতে পারে বলেও মত দিয়েছেন অনেকে।

প্রস্তাবিত এই বাজেটকে উৎপাদন বিনিয়োগ ব্যবসাবান্ধব একটি ‘ক্রিয়েটিভ’ বাজেট হিসেবে অভিহিত করেছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘সব শ্রেণির মানুষের কল্যাণের কথা চিন্তা করে এই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। এটি একটি ক্রিয়েটিভ বাজেট।’ প্রস্তাবিত বাজেট গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের ভিত্তিতে জনবান্ধব, জনকল্যাণমুখী ও ভিশনারি বাজেটের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত জনগণের সরকার বহু বছর পর আজ একটি বাজেট প্রণয়ন করেছে। এই বাজেটে দেশের প্রায় সব শ্রেণিপেশার, ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে। তবে বাংলাদেশের ইতিহাসে বৃহত্তম বাজেট হলেও এই বাজেটে জনগণের ওপর করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে দাবি করে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

এদিকে, ঋণনির্ভর বাজেট আর্থিক শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বলে জানিয়েছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, এবারের বাজেটে বৈদেশিক ঋণের ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি নির্ভরতা দেখা গেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন খাতে বড় অঙ্কের থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তার মতে, বাজেটের প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে এর কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও বলেন, বাজেটে মানবিক অর্থনীতি গঠনের কথা বলা হয়েছে এবং যুব সমাজ, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন শ্রেণির জন্য বরাদ্দের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে এই নীতিগত কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য যে আর্থিক ভিত্তি প্রয়োজন, তা তুলনামূলকভাবে দুর্বল। বিশেষ করে বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা ও বড় অঙ্কের থোক বরাদ্দ ভবিষ্যতে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি করতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি আরও যোগ করেন, উদারীকরণ, মানবিক অর্থনীতি এবং ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। তার মতে, সংস্কারের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে সরকার কতটা দক্ষতার সঙ্গে বাজেট বাস্তবায়ন করতে পারে, সেটিই আগামী দিনের প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে