হামে মৃত্যুর মিছিল ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত ৪ মাসে সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত হামে ৭৯৭ শিশু মারা গেছে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে ৯৫ শিশু এবং উপসর্গ নিয়ে ৭০২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর আগে ২৬ জুন সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত হামে শিশুমৃত্যু ৭০০ ছাড়ায়। অর্থাৎ ২৬ দিনের মাথায় এসে মৃত্যু ৮০০ ছুঁইছুঁই হলো। মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত হাম পরিস্থিতি বিষয়ক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
হাম প্রাদুর্ভাব ও সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশেষজ্ঞরা ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সি শিশুদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা দেওয়ার সুপারিশ করেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ও ইউনিসেফ বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি হাতে নেয়। চলতি বছরের ৫ এপ্রিল ঢাকার বাইরে বিশেষ গণটিকা কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর ১২ এপ্রিল ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এবং ২০ এপ্রিল দেশব্যাপী জাতীয়ভাবে গণটিকা কার্যক্রম পরিচালনা করে সরকার। ২০ মে এই ক্যাম্পেইন শেষ হয়। দুই মাস আগে শেষ হওয়া ক্যাম্পেইন বিষয়ে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের দাবি ১০৩ শতাংশ শিশু হামের টিকা পেয়েছে। বর্তমানে হামের নিয়মিত কার্যক্রম চলছে।
তবে সামপ্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৮০ শতাংশ শিশু টিকা পায়নি। অন্য অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হামে মারা যাওয়া শিশুদের ৫২ শতাংশের বয়স ছিল ৯ মাসের কম। এপ্রিল থেকে মে মাসের মধ্যে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নিতে আসা ৩৪১ শিশুকে নিয়ে গবেষণাটি করা হয়েছে। এসব শিশুর বয়স ছিল ১৪ বছরের মধ্যে। গবেষণাটি করেছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর.বি) ও শিশু হাসপাতালের ১৯ জন গবেষকের একটি দল।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা হামের পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন সময় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং হামে মৃত্যুর পেছনে কারণ খতিয়ে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে হাম প্রতিরোধে সরকার কী করছে, কী উদ্যোগ নিয়েছে– এ নিয়েও জনমনে প্রশ্ন আছে।
সরকারের পরিকল্পনা ইমিউনিটি বাড়ানোর দিকে এবং সব শিশুকে টিকার আওতায় নিয়ে আসার। সরকার মনে করে, ইমিউনিটি বাড়িয়ে টিকার মাধ্যমে হাম নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। সেদিকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। হামে এত শিশুর মৃত্যুতে পুষ্টিহীনতা একটা কারণ বলে ধারণা করা হচ্ছে। এজন্য ভিটামিন ‘এ’ খাওয়ানোর দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। হামে আক্রান্ত শিশুদের মায়েরা বেশিরভাগ পুষ্টিহীনতায় ভুগছেন এবং পুষ্টির ঘাটতি হামে মৃত্যুর অন্যতম কারণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে হামের সামপ্রতিক প্রাদুর্ভাব এখন আর কেবল একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নীতিনির্ধারণ ও জবাবদিহির একটি কঠিন পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। আট শত শিশুর মৃত্যু এবং প্রতিদিন মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকা আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা ও নীতিগত ব্যর্থতার এক উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরছে। সামপ্রতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, এই সংকট আকস্মিক নয়–বরং এটি ধারাবাহিক অব্যবস্থাপনা, ভুল সিদ্ধান্ত এবং বিলম্বিত পদক্ষেপের ফল। তাঁরা বলেন, রোগ নজরদারি ও তথ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা এই সংকটকে তীব্রতর করেছে। বছরের শুরুতে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে হাম শনাক্ত হলেও তা জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্ব পায়নি। সংক্রমণ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়লেও মার্চের আগে কার্যকর কোনো জাতীয় সতর্কতা বা জরুরি প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, দেশের ৯১ শতাংশ জেলায় হাম ছড়িয়ে পড়া একটি ভয়াবহ বাস্তবতা–যা প্রমাণ করে, রোগ নজরদারি ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
তাঁরা জোর দিয়ে বলেন, প্রতিরোধমূলক কর্মসূচির ব্যর্থতা প্রশ্নবিদ্ধ। টিকাদান কর্মসূচি দেরিতে শুরু হওয়া, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনের ঘাটতি এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সময়মতো হস্তক্ষেপ না করা–এসব মিলিয়ে সংক্রমণের বিস্তার অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের হার বেশি হওয়া দেখায় যে, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীকেই সঠিকভাবে সুরক্ষিত করা যায়নি। এখন মূল প্রশ্ন–এই মৃত্যু কি এড়ানো সম্ভব ছিল? বিশ্লেষণ বলছে, বড় অংশই প্রতিরোধযোগ্য ছিল। টিকা সরবরাহে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা গেলে, আগাম সতর্কবার্তা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হলে এবং দ্রুত গণটিকাদান শুরু করা গেলে এই মৃত্যুহার অনেক কম হতে পারত। অর্থাৎ এটি কেবল প্রাকৃতিক প্রাদুর্ভাব নয়; বরং নীতিগত ব্যর্থতার ফল। তাই দেরিতে হলেও পদক্ষেপ নিতে হবে। ঠেকাতে হবে হামে মৃত্যুর মিছিল।







