মানুষ হওয়া শুধু উচ্চতর ডিগ্রি বা শিক্ষার ওপর নির্ভর করে না

সুব্রত কুমার নাথ | শনিবার , ৬ জুন, ২০২৬ at ১০:০৯ পূর্বাহ্ণ

মানুষের মধ্যে প্রেম বা মানবতা না থাকলে, সে আবার মানুষ কী? সুখে দুঃখে আপদে বিপদে মানুষ মানুষের পাশে থাকবে এটাইতো মানবতা। কিন্তু সব মানুষ কী মানুষ? যাদের মধ্যে আদর্শ, সততা, ভালোবাসা, উদারতা, নৈতিকতা, ধার্মিকতা ও প্রকৃত শিক্ষা রয়েছে তাদেরকেই কেবল মানুষ বলা যায়। ব্যক্তিমাত্রই জন্মের পর জ্ঞান অর্জন করে আচরণিক পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে মানুষ হিসেবে নিজেকে তৈরি করতে পারে। আবার উচ্চ শিক্ষা অর্জন না করেও যথার্থ মানুষে পরিণত হওয়া যায়, যদি তার মধ্যে মানবীয় সব গুণাবলি উপস্থিত থাকে। অর্থাৎ মানুষ হওয়া শুধু উচ্চতর ডিগ্রি বা শিক্ষার উপর নির্ভর করে না। নির্ভর করে তার ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণিক পরিবর্তনের ওপর। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন – ‘বিদ্যা সহজ, শিক্ষা কঠিন। বিদ্যা আবরণে, শিক্ষা আচরণে।’ অর্থাৎ, বিদ্যা কেবল বই বা সার্টিফিকেটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, যা মূলত বাহ্যিক জ্ঞান। অন্যদিকে, প্রকৃত শিক্ষা হলো, সেই অর্জিত বিদ্যাকে তার কাজে, আচরণে ও মানবিকতায় ফুটিয়ে তোলা। আজকাল অনেক শিক্ষিতজনকে বিদ্যার সীমাবদ্ধ গণ্ডীর মধ্যেই পড়ে থাকতে দেখা যায়। শিক্ষা তার অন্তরকে ছুঁইতে পারে না। তাই, এসব শিক্ষিত লোকদের লক্ষ্য থাকে অর্থ ও ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে এগিয়ে যাওয়ার। বৈধ না অবৈধ এটাকে গুরুত্ব না দিয়ে যে কোনোভাবে অর্থ কিংবা ক্ষমতা অর্জনই বর্তমান সমাজে সফলতার মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আমরা এখন ধর্ম ও বিভিন্ন পেশার মধ্যেও অতি মাত্রায় লোভ ও অনৈতিকতা খুঁজে পাই। কোনো পেশার ভালো মন্দ দিক বিবেচনা না করে, কত বেশি টাকা উপার্জন করা যায় এবং কত বেশি ক্ষমতার চর্চা করা যায়, তাই এখন সমাজের আলোচিত বিষয়। ফলে, যাঁরা প্রকৃত শিক্ষা অর্জন করেন এবং সৎ ও নৈতিকতার সাথে জীবন যাপন করেন তাঁরা এক ধরনের মানসিক চাপে থাকেন। এক ধরনের হতাশা সারাক্ষণ তাদেরকে আচ্ছন্ন করে রাখে। সমাজের মানুষও তাদেরকে ব্যর্থ বলে ভর্ৎসনা করেন। যারা অর্থ ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে যাচ্ছেন, তাঁরা নিরন্তর প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত। আমাদের সমাজ যেন এক ধরনের মানসিক অসুস্থতায় আক্রান্ত। আমাদের জীবনাচরণ থেকে সেবা শব্দটি যেন ওঠে গেছে। সেবার বদলে ঘুষের সংস্কৃতি প্রচলিত হয়ে ওঠেছে। অর্থ ও সম্পদের নেশায় ঘুষ প্রথা দিনদিন বেড়েই চলেছে। এ অবৈধ অর্থ সম্পদ ও ক্ষমতার অপব্যবহার মানুষ দিনদিন অমানুষে পরিণত হচ্ছে। অর্থ ও ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তারা মানুষের সাথে হীন আচরণ করছে, এমনকি তারা অসামাজিক ও বেপরোয়া হয়ে ওঠছে। তারা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। কিন্তু তারা জানে না, অর্থ ও ক্ষমতা দীর্ঘদিন থাকে না। এক সময় যখন এসব হারিয়ে যায়, তখন কেউ আর তাদের পাশে না। প্রতিটি ধর্মেই ভালোবাসার কথা আছে। ত্যাগ ও সৎ উপার্জনের কথা আছে। আছে লোভ ও অহংকার পরিত্যাগের কথা। শুধু ধর্ম ধর্ম বলে চিৎকার করলে হবে না। ধর্মচর্চা করার চেয়ে ধর্মান্ধতা ও অজ্ঞতা দূর করা খুব বেশি প্রয়োজন। আর শিক্ষা যদি মানবিকতা, সেবা ও কল্যাণের পথে পরিচালিত না হয়ে মানুষকে হয়রানি ও জিম্মি করার কাজে লাগায় তবে সে শিক্ষা অর্জনের কোনো মূল্য নেই। প্রকৃত শিক্ষা অর্থাৎ জ্ঞান ও প্রজ্ঞাকে কাজে লাগিয়ে সামাজিক এ অবক্ষয় রোধে সবাইকে সবার আগে মানবিক মানুষে পরিণত হতে হবে। প্রত্যেককে নৈতিকতাবোধ সম্পন্ন হতে হবে এবং প্রত্যেকের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। তবেই আগামী প্রজন্ম একটি কলুষমুক্ত সুন্দর আদর্শ সমাজ খুঁজে পাবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধমায়ের ভালোবাসা
পরবর্তী নিবন্ধদেশের উন্নয়নে জরুরি ‘দেশপ্রেম ও সচেতনতা’