শিশুর মানস গঠন হলো তার চিন্তা, আবেগ, মূল্যবোধ এবং বুদ্ধিমত্তার সুষম বিকাশ। এটি শিশুর পারিপার্শ্বিক জগৎকে অনুধাবন করার ক্ষমতা এবং সুন্দর আচরণের ভিত্তি তৈরি করে। মূলত পরিবেশ ও শিক্ষার মাধ্যমে শৈশব থেকে তার মস্তিষ্কে যে ইতিবাচক ও নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির যে ভিত্তি গড়ে উঠে এটাই শিশুর মানস গঠন। শিশুর মানসিক বিকাশ ও মানস গঠনে সবচেয়ে বড় ভুমিকা পালন করে তার চারপাশের পরিবেশ, পারিবারিক শিক্ষা, ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা সর্বোপরি পরিবারের ইতিবাচক আচরণ। শিশুর সুন্দর ও সুস্থ মানসিক বিকাশের জন্য সবসময় প্রয়োজন ইতিবাচক পারিবারিক পরিবেশ। যেমন–১. কলহমুক্ত পরিবেশ, ২.ভালোবাসার প্রকাশ,৩. নিরাপত্তাবোধ।
মানুষের জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ শিক্ষা। শিশু জন্ম নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এ অনুষঙ্গের অগ্রযাত্রা শুরু হয়। জীবনব্যাপী শিক্ষা,আবার কখনো শিক্ষাকে জীবন থেকে বিছিন্ন করা যায় না। মানুষের সংক্ষিপ্ত পার্থিব জীবনে শিক্ষা বয়ে আনে কল্যাণ। শিশুর শিক্ষার শুরুতেই মূল্যবোধ সম্পন্ন, ধর্ম ও নৈতিক জ্ঞানসম্পন্ন শিক্ষা দিতে পারলে শিশু কল্যাণের পথে এগিয়ে জীবন গড়ার সুযোগ পাবে। একটি দেশের ঐতিহ্যবাহী কোমলমতি শিশুদের ধীরে ধীরে দেশের প্রতি ভালোবাসা ও সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। যে শিশু নিজের দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য ধর্ম সাহিত্য সংস্কৃতি ইত্যাদি সম্পর্কে জানার সুযোগ পায় না,তার মধ্যে কিভাবে দেশের প্রতি মমত্ববোধ সৃষ্টি হবে, দেশপ্রেম সৃষ্টি হবে। শিশুর মানস গঠনে প্রয়োজন শিক্ষা ও পরিচর্যা। শিশুর শিক্ষা গ্রহণের জন্য প্রথম বিদ্যাপীঠ পরিবার। সেই পরিবারের মাতাপিতা হচ্ছে শিশুর প্রথম শিক্ষক। শিশু প্রথমে পারিবারিক পরিসর থেকেই মূল্যবোধের মৌলিক শিক্ষা পেতে শুরু করে। মা–বাবা আত্মীয় স্বজনের কাছ থেকেই প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ নেয়। পরিবার এবং পারিপার্শ্বিকতায় চারপাশে যা দেখে তা শেখে। তার বোধ বুদ্ধি বিশ্বাস অনুযায়ী তার আচরণ বিধি গড়ে উঠে।
বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে ডিজিটাল প্রযুক্তির ক্ষতিকর প্রভাবে শিশুরা ক্রমশ বইয়ের জগৎ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। আমরা যা দেখি বর্তমান সময়ে সামাজিক অস্থিরতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাহীনতা,সম্মানবোধ ও সমপ্রীতির অভাব তরুন সমাজের মাঝে ব্যাপক আকারে বিরাজ করছে। এর কারণ, ভুল বই পড়া, ভুল শিক্ষা, মূল্যবোধহীন পারিবারিক শিক্ষা। এসব অনৈতিক জ্ঞানহীন শিক্ষা মানুষকে অন্তসারশূন্য করে তোলে। শিশুকে জৈবিক শিক্ষার পাশাপাশি আত্মিক শিক্ষা দিতে হবে। এ শিক্ষা সঠিকভাবে পূরণ হলেই মানুষ জীবনে শান্তি, শক্তি ও স্বস্তি পায়।
পরিশেষে বলতে চাই, আজকের তরুনরা পরিবার থেকে সঠিক শিক্ষার অভাবে বিদ্যালয়ে শিক্ষার বদলে অস্ত্রের মহড়া দিতে দেখা যায়। অনৈতিক কাজে নিজেকে জড়ায়। কাঁচা টাকার লোভে কলম ছুঁড়ে ফেলে, হাতে তুলে নেয় অস্ত্র। যুব সমাজের দৃঢতা আর মনোবল তলানিতে ঠেকেছে। অল্প বয়সে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে নানারকম জীবনবিনাশী নেশাদ্রব্য সেবনে। পরিবারে পরিবারে অশান্তির আগুন বাড়ছেই, অনেকেই বেছে নিচ্ছে আত্মহননের পথ। এসব ক্ষতি থেকে বাঁচতে ভারসাম্যময় শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। তাই আসুন, একজন শিশুর মানস গঠনে পারিবারিক, ধর্ম ও নেতিক শিক্ষার ইতিবাচক পরিবেশ সৃষ্টিতে আমরা অভিভাবকগণ আর ও অধিক সচেতন হই।
লেখক : প্রাক্তন অধ্যাপক, কবি, প্রাবন্ধিক ও সংগঠক











