মাটিতে মায়ের ঘ্রাণ

বিপ্রতীপ অপু | সোমবার , ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬ at ১০:৫৯ পূর্বাহ্ণ

বাড়ির নিকোনো উঠোনটা আজ স্থবির। যেন নিত্য দিনকার চেয়ে একটু বেশিই আর্দ্র। তবে কি আম্মার শোকে আজ মাটিও কাঁদছে? এই মাটির পরেই তো সেই কিশোরী বেলায় আলতা রাঙা চরণ রেখেছিলেন আম্মা। পাঁচ যুগেরও বেশি সময় ভালোবাসার আঁচলে জড়িয়ে রেখেছিল এই মাটি। প্রতিদিন ভোরে মায়ের সুললিত কণ্ঠের তিলাওয়াতে মুখরিত হতো চারদিক। এক ঝাঁক কিশোরকিশোরীর পদচারণায় ভরে উঠতো এই আঙিনা। আম্মার মুখে মুখে সুর মিলিয়ে আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হতো ‘ইন্না আতোয়াইনা ক্বাল কাওছার, ফাসোয়াল্লি লিরাব্বিকা ওয়ানহার’। দাদুর পদাঙ্ক অনুসরণ করেই সমাজে আরবী শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতেন আম্মা।

সংসারের এক কঠিন সময়ে হাল ধরেছিলেন আম্মা। লাউয়ের ডগার মতো নেতিয়ে পড়েও শক্ত হাতে পাঁচ সন্তানকে তুলে এনেছেন আপন হাতে। বার বার ভেঙে যেতে যেতেও দৃঢ় মনোবলে আগলে রেখেছিলেন উচ্চাভিলাষী আর সৌখিন আব্বার সংসার। আমাদের পরিবারে শিক্ষা সংস্কৃতি চর্চার যে আবহ ছিল। আম্মার কৃতিত্ব ছিল উল্লেখ করার মতো। আদর আর শাসনের এক স্বর্গীয় সুখে ভরিয়ে রেখেছিলেন পরিবারকে।

আম্মার জীবনের শেষ দিন গুলো সুখের ছিল না। দেশবিদেশে ঘুরে বেড়ানো মানুষটি এক দণ্ডও শুয়ে বসে থাকতে পারতেন না। দুর্বল পায়ে এ ঘরে ও ঘরে চলে যেতেন। আর এতেই ঘটেছিল আম্মার শরীরের অবনতি। হাঁটতে গিয়ে অবচেতনে পড়ে গিয়ে মস্তিষ্কে রক্ত ক্ষরিত হয়ে কিছুটা মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে ছিলেন। আর সবশেষে ফিরে গেলেন কৈশোরে যাঁর হাত ধরে জীবন সমূদ্রে নৌকো ভাসিয়ে ছিলেন। তাঁরই কাছাকাছি মাটির বুকে। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের পর আম্মাকে আমি তিনবার কোলে নিয়েছি। একবার খাট থেকে নামিয়ে শেষ গোসল দিতে। দ্বিতীয় বার গোসল শেষে খাটে তুলতে। এবং শেষ বার কবরের বুকে শায়িত করতে। তারপর নিজ হাতে আম্মার সকল অপূরণীয় সাধ, আহ্লাদ আর ইচ্ছে গুলোকে নিষ্প্রাণ দেহের সাথে মাটি চাপা দিয়ে চিরদিনের মতো রেখে এলাম মাটির ঘরে।

ভাবতেই বুকটা ভেঙে যায় যে এই জীবনে আর কখনোই ‘আম্মা’ ডাকা হবে না। শাসন, বারণ, আদেশ, উপদেশ আর অনুরোধের সকল দুয়ার বন্ধ হয়ে গেল চিরতরে। পাশের ঘর থেকে আর ভেসে আসবে না আম্মার কণ্ঠে– ‘গুজরা হুয়া জামানা / আতা নেহি দোবারা / হাফিজ খুদা তুমহারা’ কিংবা, ‘আর রাহমানু আল্লামাল কুরআন/ খালাক্বাল ইনসানা আল্লামাহুল বায়ান’।

পূর্ববর্তী নিবন্ধএলপি গ্যাস সংকটে সাধারণ মানুষের চরম দুর্ভোগ
পরবর্তী নিবন্ধবাংলাদেশকে ঘিরে সবার দৃষ্টি