বৃটিশ আমলের একটা গল্প দিয়ে শুরু করছি। গল্পটা ছিল এমন। এক খেয়াঘাটের মাঝি তার নৌকা দিয়ে খেয়া পারাপার করতো। তার কিছু টাকা সঞ্চয় হলে সে ভাবলো, নদীর এপারে তো কোন মক্তব নেই আমিতো মক্তবে পড়তে পারিনি। আমার এই সঞ্চয় দিয়ে আমি একটা হুজুর রেখে মক্তবে শিশুদের আরবী শিক্ষা দিব। পাড়ার সবাই খুশি হয়ে সন্তানদের মক্তবে পাঠানো শুরু করলো। দেখা যায় হজুর নিয়মিত মক্তবে পড়াতে আসেনা। মাঝি নিয়মিত হুজুরের বেতন পরিশোধ করছে, দিনপ্রতি এক টাকা করে। পাড়া– প্রতিবেশিরা হুজুরের কার্যকলাপ মাঝিকে অবহিত করে। মাঝি খুব মর্মাহত হয় এবং বুদ্ধি আঁটে কিভাবে হুজুরকে সচেতন করা যায়। সে হুজুরকে পাহারা দেয় এবং দেখে সত্যিইতো হুজুর সঠিক ভাবে মক্তবে আসেনা। মাঝি হুজুরকে প্রস্তাব দেয়, হুজুর আমি যখন নিজেই খেয়া পারাপার করি, তাহলে আপনি কেন অন্য নৌকায় আসবেন, কাল থেকে আপনি আমার নৌকায় যাতায়াত করবেন। আমাকে কোন ভাড়া দিতে হবেনা। অগত্যা হুজুর মাঝির নৌকায় আসা–যাওয়া করতে থাকে এবং মাঝি প্রতিদিনের টাকা প্রতিদিন হুজুরকে দিয়ে দেয়। সপ্তাহে একদিন হুজুর ছুটি কাটায় বলে সেটা মাঝির কাছে জমা হতে থাকে। সেই টাকা বছরের শেষে মাঝি হুজুরকে বকশিস হিসেবে দান করে। খুব সুন্দর কৌশলে মাঝি হুজুরের সচেতনতা বৃদ্ধি করে। হ্যাঁ গল্পের প্রেক্ষিতে যে বিষয়টা নিয়ে আলোকপাত করা। অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা যদি বলি, তাহলে বলতে হয় দেশের পণ্যকে পরিত্যাগ করে বিদেশী পণ্যকে গুরুত্ব দেয়া? এই যেমন সেদিন কাপড়ের দোকানে নতুন প্রজন্মের একটি মেয়ে বিক্রেতাকে বলছে, ভাই আমাকে কয়েকটা পাকিস্তানী থ্রীপিস দেখান। দোকানী উল্টে–পাল্টে কাপড়ের টোকেন দেখে চড়াদামে কয়েকটি থ্রী পিস বিক্রি করে দিল। মেয়েটা বের হয়ে গেলে দোকানি কে বললাম, ভাই আপনি মেয়েটাকে ঠকালেন কেন, এটাতো আমাদের দেশী কাপড়, পাকিস্তানী কাপড় বললেন যে ? বিক্রেতা উওর দিল, আপা আমি সত্যি কথা বললে আমার কাপড় বিক্রি হতো না। পাকিস্তানী কাপড়ের প্রতি নেশা হয়ে গেছে উনাদের। মনে মনে ভাবলাম, হায় কপাল, দীর্ঘ ৯ মাস মুক্তিযুদ্ধ করে পাকিস্তান থেকে দেশকে স্বাধীন, সার্বভৌম করা হলো আর প্রজন্মরা খুঁজে বেড়াচ্ছে সেই পাকিস্তানের কাপড়। এবার একটা হোঁচট খেলাম, স্কুলে দুই মহিলা একে অপরকে বলছেন। আমি আমার ছোট ছেলেকে মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে দিলাম আপা। অপরজনা, কেন আপা? একজন এখানে আরেকজন মাদ্রাসায়! আরে আপা জানেন না! আজকালকার মাদ্রাসা অনেক স্ট্যান্ডার্ড। ইংরেজি, বাংলা আরবী সব আছে। স্পোকেন ইংরেজিও আছে।’ যদিও বেতন একটু বেশি। তবে স্পেশাল কোচিং থাকায়, ছেলের পড়া–লেখা নিয়ে চিন্তা নেই। ছেলেবেলা থেকে জানি মাদ্রাসায় যারা পড়ে, তারা আরবীতে দক্ষ হয়। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ বারো বছর বয়স থেকে নিয়মিত ভাবে পড়তে শেখে। সাধারণত তাদের হোস্টেলে রেখে অভিজ্ঞ হুজুর দিয়ে এলেম দান করা হতো। সরকারী ছুটিগুলোতে পরিবারের সাথে দেখা করার সুযোগ পেতো। মাদ্রাসার নিয়মে পড়ে তারা আরবীতে উচ্চশিক্ষায় ও দক্ষ হতো। আর এখন? আধুনিকতার ছোঁয়ায় সত্যিকার ধর্মীয় অনুভূতি বিলীন হয়ে যাচ্ছে। কোএডুকেশন হওয়ায় বিষয়টা ভিন্ন আঙ্গিকে রূপ নিচ্ছে। ১লা বৈশাখ নববর্ষে, সন্ধ্যায় বইমেলায় বইস্টল দেখতে যাওয়ার প্রবেশ মুখে দেখলাম, সাদা কাপড়ে আচ্ছাদিত একটা গেইট। কড়া নিরাপত্তার জন্য এই ব্যবস্থা। লাইন ধরে সবাই ভেতরে ঢুকছে। দুই পাশে পুরুষ, মহিলা গার্ড (পুলিশ)। সবাই বসে আছে। দুইজন মেয়ে গার্ড (পুলিশ) দিকবিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে মোবাইলে চেটিং এ ভীষণ ব্যস্ত। এবার হোঁচট খেলাম চক্ষু হাসপাতালে আত্মীয়ের চোখ দেখাতে গিয়ে। ডাক্তার চোখ দেখলেন। চোখে ছানি থাকার কারণে রোগীর অপারেশন লাগবে। সেই কারণে একটা ইসিজি দরকার হয়। রুগীকে ইসিজি টেবিলে শুইয়ে দিয়ে নার্স একহাতে মোবাইলে গল্প জুড়ে দেয়। পাশে একটা নার্স বসা ছিল তার হাতের মোবাইলে গান বাজছিল। নার্স কি দেখলো না দেখলো রোগীর হাতে কাগজ ধরিয়ে দিয়ে কাজ শেষ করে। এই হলো কাজের তার প্রতি অসচেতনতা। আমরা সবাই ভালো–মন্দ কাজ নিয়ে ব্যস্ত। একে অপর কে শুধু ভুল–ত্রুটি নিয়ে দোষারোপ করি। এটা পরিত্যাগ করে একে অপরকে সহযোগিতা সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসতে হবে। দেশকে সমৃদ্ধ করতে হলে সচেতন হতে হবে। কেননা সচেতনতাই সমৃদ্ধির চাবি কাঠি।













