বিগত কয়েকদিন ধরে অবহেলায় পড়ে থাকা এক মায়ের মৃত্যুর খবর সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তেই যেন ঘরে ঘরে আলোচনার ঝড় উঠেছে। অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, অনেকেই কেঁদেছেন, আবার কেউ কেউ নিজের বাবা–মায়ের কথা ভেবে নীরবে আত্মসমালোচনা করেছেন। সমাজে এখন যেন দুই ধরনের মানুষ বাস করে। একদল মানুষ আছেন, যারা মা যেমনই হোন সুস্থ বা অসুস্থ, ক্ষমতাবান বা অসহায় সব অবস্থায় তাঁকে আগলে রাখেন। মায়ের অভিযোগ, অনুযোগ, অভিমান সবকিছুই ধৈর্য ধরে মেনে নেন। কারণ তাঁদের কাছে মা শুধুই মা। আবার কিছু মা আছেন, যারা যথেষ্ট যত্ন পেলেও তৃপ্ত হন না। তাঁদের কাছে দূরের মানুষই বেশি ভালো মনে হয়। অনেক সময় দেখা যায়, যাঁরা সবচেয়ে বেশি সেবা করেন, তাঁদেরই মূল্যায়ন হয় না। কেউ কেউ তো বাবা–মায়ের খোঁজ নেওয়ারও সময় পান না। অন্যদিকে কিছু পরিবারে ছেলে এমন অবস্থায় পড়ে যে মা ও স্ত্রীর টানাপোড়েনের মাঝে নিজের অবস্থান হারিয়ে ফেলে। শেষ পর্যন্ত কোথাও তার দৃঢ় ভূমিকা থাকে না। সংসারে অশান্তি বাড়তে থাকে, অথচ সমস্যার সমাধান আর হয় না।
বিদেশে থাকা অনেক সন্তান জীবিকার প্রয়োজনে বাবা–মা থেকে দূরে চলে যায়। বাবা–মায়েরাই তাঁদের সারা জীবনের সঞ্চয় ব্যয় করে সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে দেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, বৃদ্ধ বয়সে অনেকেই সেই বাবা–মায়ের পাশে দাঁড়াতে পারেন না। আর্থিকভাবে সচ্ছল ও প্রতিষ্ঠিত সন্তানের মধ্যেও এমন উদাহরণ দেখা যায়। আবার সীমিত সামর্থ্যের সন্তানই কখনো কখনো সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব পালন করে।
কর্মফল বলে একটি কথা আছে। যারা আজ বাবা–মায়ের প্রতি দায়িত্ব পালন করেন না, তাঁদের মনে রাখা উচিত জীবনের চাকা ঘুরে আবার ফিরে আসে। আজ যে অবহেলা করা হচ্ছে, কাল সেই একই অভিজ্ঞতা নিজের জীবনেও ফিরে আসতে পারে।
আমাদের চারপাশেই এমন অনেক ঘটনা দেখা যায়। কোনো মা হয়তো ছেলেকে মানুষ করতে নিজের গয়না বিক্রি করেছেন, নিজের ইচ্ছা–অনিচ্ছা বিসর্জন দিয়েছেন, রাত জেগে সন্তানের সেবা করেছেন। সেই সন্তানই একদিন প্রতিষ্ঠিত হয়ে ব্যস্ত জীবনের অজুহাতে মায়ের খোঁজ নেওয়ার সময় পান না। আবার এমনও দেখা যায়, সীমিত আয়ের একটি পরিবারে থাকা ছেলে বা মেয়ে নিজের সামর্থ্যের মধ্যেই বৃদ্ধ মা–বাবার যত্ন নিচ্ছে। কারণ ভালোবাসা সব সময় অর্থের ওপর নির্ভর করে না। একজন বৃদ্ধ মা–বাবার কাছে দামি উপহারের চেয়ে সন্তানের পাশে বসে কয়েক মিনিট কথা বলা, খোঁজ নেওয়া এবং একটু আন্তরিকতা অনেক বেশি মূল্যবান। তবে এই সমাজে এখনও অনেক সৌভাগ্যবান মা–বাবা আছেন, যারা সন্তানের ভালোবাসা, সম্মান ও যত্নে জীবন কাটাচ্ছেন। বিশেষ করে যেসব ছেলে ও পুত্রবধূ বার্ধক্যে মা–বাবার পাশে থাকেন, তাঁদের সেবা করেন এবং আপনজনের মর্যাদা দেন, তাঁরা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।
মা–বাবাদের প্রতিও একটি দায়িত্ব রয়েছে। যে সন্তান ও পুত্রবধূ তাঁদের সুখ–দুঃখে পাশে থাকে, তাঁদের যথাযথ সম্মান, ভালোবাসা ও মূল্যায়ন করা উচিত। শুধু অধিকার নয়, সম্পর্ক টিকে থাকে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা এবং ন্যায়বিচারের ওপর।
পরিবার তখনই সুন্দর হয়, যখন প্রত্যেকে নিজের দায়িত্ব পালন করে এবং একে অপরের প্রতি সুবিচার করে। কারণ বার্ধক্য কোনো বোঝা নয়; বার্ধক্যে একজন মা–বাবার সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সন্তানের একটু সময়, যত্ন, সম্মান এবং ভালোবাসা। এই ভালোবাসা তাঁদের অধিকার, দয়া বা অনুগ্রহ নয়। লেখক : শিক্ষক, প্রাবন্ধিক










