জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এমপি বলেছেন, বাজেট বক্তব্যে ঋণ খেলাপিদের টাকা ফেরত নেওয়া, আওয়ামী আমলের লুটেরা ও পাচারকৃত টাকা আদায় এবং বিচারের বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট দিক–নির্দেশনা নেই। এস আলমসহ বড় বড় মাফিয়ারা জনগণের টাকা লুট করে বিদেশে থাকলেও তাদের বিচারের আওতায় আনার কোনো বক্তব্য বাজেটে পাওয়া যায়নি; উল্টো ইসলামী ব্যাংককে আবার এস আলমের হাতে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
আদ্–দীন হাসপাতালকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জায়গা থেকে বন্ধ করা হয়েছে। যদি সেই হাসপাতালের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকে সেটার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত। বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জায়গা থেকে, জামায়াত বা ১১ দলকে এক ধরনের কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে।
গতকাল শুক্রবার জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া মাদরাসা সংলগ্ন দায়েম নাজির জামে মসজিদে জুমার নামাজ আদায় শেষে তিনি চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন। এদিকে শুক্রবার চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রস্তাবিত বিশাল বাজেটে বড় ধরনের দুর্নীতির সুযোগ রয়েছে এবং এটি সামগ্রিকভাবে বাস্তবতা বিবর্জিত ও উচ্চাভিলাষী বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এমপি।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, বড় বাজেট মানেই বড় দুর্নীতি করার সুযোগ তৈরি হওয়া। বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচিতে দলীয় এমপিরা বরাদ্দ পেলেও সেখানে কোনো স্বচ্ছতা বা জবাবদিহিতা নেই। ব্যাংক খাতের ‘নাজুক পরিস্থিতি’, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের সংকট এবং কর্মসংস্থান–এই তিন সমস্যা থেকে উত্তরণের কোনো নির্দেশনা নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে নেই বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
তিনি আরও বলেন, সরকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উপরে আঘাত আনছে। যেখানে আমাদের প্রতিষ্ঠান তৈরি করার কথা, বাংলাদেশে এমনিতে প্রতিষ্ঠান নাই, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এখন নাজুক খাতে পরিণত হয়েছে; যদি তিন কোটি আমানতকারী ইসলামী ব্যাংক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে তখন অন্য ব্যাংকগুলোর উপর প্রভাব পড়বে।
ফলে এই সামগ্রিক ভঙ্গুর অর্থনীতিকে দিশা দেখানোর মতো কোনো বাজেট এটা হয়নি। ফলে আমাদের জায়গা থেকে সমালোচনাগুলো থাকবে। একই সাথে আমরা প্রস্তাবনাও দিচ্ছি। সংসদে এবং সংসদের বাইরে আমরা সেই কথাগুলো অব্যাহতভাবে বলে যাব। আমরা আশা করব, সরকার আমাদের কথাগুলো শুনবে। দ্রুত জুলাই সনদ এবং গণভোটের রায় অনুযায়ী অবিলম্বে সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে।
তিনি দেশের অর্থনীতির তিনটি মৌলিক সমস্যা– ব্যাংকিং খাতের নাজুক অবস্থা, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের অসম চুক্তি এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের সংকট উল্লেখ করে বলেন, বাজেটের ঘাটতি মেটাতে সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সংকুচিত হবে, যা থেকে উত্তরণের কোনো উপায় বাজেটে অনুপস্থিত। এই সামগ্রিক ভঙ্গুর অর্থনীতিকে দিশা দেখানোর মতো কোনো বাজেট এটি হয়নি।
গতকাল শুক্রবার বিকেলে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে বাজেট নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ বলেন, প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট করেছে। রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা করেছে ৬ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। এটি আসলে বাস্তবতা বিবর্জিত। কারণ এত রাজস্ব বাংলাদেশের ইতিহাসে কখনোই আদায় করা সম্ভব হয়নি।
বর্তমান যে প্রশাসন, যে কর কাঠামো রয়েছে এরমধ্যে এটা সম্ভব না। গত বাজেটে তিন লাখের (কোটি) কিছু বেশি রাজস্ব আদায় হয়েছে। ফলে এক বছরের মাথায় দ্বিগুণ রাজস্ব তারা আদায় করতে পারবে, এটা আসলে সম্ভব নয়।
এ সময় চিফ হুইপ নাহিদের সঙ্গে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীসহ দলটির নেতাকর্মীরা ছিলেন। এর আগে নগরীর ষোলশহরে জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদ্রাসা সংলগ্ন দায়েম নাজির জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া জামে মসজিদে জুমার নামাজ পড়েন এনসিপি নেতারা।
নতুন বাজেটকে ‘উচ্চাভিলাষী’ আখ্যা দিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, এই বাজেটের মাধ্যমে অর্থনৈতিক যে মৌলিক সংস্কার আমরা আশা করেছিলাম সেটা সম্ভব হবে না। বাজেটে কিছু সৃজনশীল জায়গা তারা দেখিয়েছে। কিছু পণ্যের কর কমিয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তায় বরাদ্দ বৃদ্ধি করেছে। এগুলো ইতিবাচক হলেও এই বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য হবে না বলে আমরা মনে করছি।
সারাদেশে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বিদ্যুতের দাম যেভাবে বেড়েছে একে ‘নজিরবিহীন’ বর্ণনা করে এনসিপি নেতা বলছেন, এত কম সময়ে একসঙ্গে বিদ্যুতের দাম এতো বৃদ্ধি পায়নি এর আগে।
তিনি বলেন, বিভিন্ন কার্ড বলেন, খাল খনন কর্মসূচি বলেন, সরকার দলীয় এমপিরা যে বরাদ্দ পাচ্ছে, সেটা বিরোধী দলীয় এমপিরা পাচ্ছে না। তারা সেটা কিভাবে করছে?
আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, আওয়ামী লীগ সন্ত্রাসবাদী সংগঠন, তারা নিষিদ্ধ রয়েছে। ট্রাইব্যুনালের বিচারের মাধ্যমে দলগতভাবে তাদের বিচার করা হবে। সংসদে এটা আইনগতভাবে নিষিদ্ধ। প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এবং মিডিয়াতে তাদের উসকানিমূলক প্রচারণা চালানো হলে তা আইন লঙ্ঘন হবে এবং সরকার ও প্রশাসন তা দেখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
চট্টগ্রামে স্থানীয় সমস্যা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা এবং বৃষ্টি হলেই নগরবাসী ভোগান্তিতে পড়ে। এই সংকট নিরসনে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তিনি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ও প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান। জুমার নামাজ শেষে জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া মাদরাসা মাঠে ছাত্রদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে জামেয়া মাদ্রাসার ছাত্রদের যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল, তা সমগ্র জাতি চিরকাল কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করবে। অতীতে ও বর্তমানে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি এই প্রতিষ্ঠান ও সুন্নীয়তকে রাজনৈতিক প্রভাববলয়ের মধ্যে আবদ্ধ করার চেষ্টা করেছে এবং এখনও সেই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
তাই তিনি আহ্বান জানান যেন জামেয়া মাদরাসা কোনো বিশেষ রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, তার নিজস্ব ঐতিহ্য, আদর্শ ও স্বকীয়তা বজায় রেখে একটি স্বাধীন দ্বীনি প্রতিষ্ঠান হিসেবে সুন্নীয়তের আদর্শ ও আউলিয়ায়ে কেরামের উত্তরাধিকার ধারণ করে সমগ্র জাতির কল্যাণে পথনির্দেশনা দেয়।
সীমান্ত পরিস্থিতি বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী অভিযোগ করেন, পুরো দক্ষিণ এশিয়াতে একটা অশান্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে ভারত। আমরা সীমান্তের মানুষকে আহ্বান জানাই, মানব প্রাচীর তৈরি করুন। ঐক্যবদ্ধভাবে বিজিবির সঙ্গে থাকুন। পুরো বাংলাদেশ আপনাদের সঙ্গে আছে।
সমপ্রতি আওয়ামী লীগের মিছিলসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের বিষয়ে জানতে চাইলে পাটওয়ারী এর জন্য সরকারকে দায়ী করেন। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে ‘সরকার নমনীয়’ দাবি করে তিনি বলেন, আশা করি সরকার সুষ্ঠু পদক্ষেপ নেবে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি তাদের যাতে বাংলাদেশে হয়। এনসিপি সর্বদা আওয়ামী লীগের বিচার চায়। এই বাংলার মাটিতে আমরা তাদের বিচার করিয়ে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ।








