উপসাগরীয় রাজতান্ত্রিক আরব রাষ্ট্রসমূহের ভুল পররাষ্ট্রনীতির কারণেই আজ মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থা বলে আমার বিশ্বাস। মধ্যপ্রাচ্যের আরব রাষ্ট্রসমূহে–বিশেষ করে মিশর, সিরিয়া, জর্ডান, লেবানন ও ওদিকে ইসরায়েলসহ মার্কিন যুদ্ধ তৎপরতা থাকলেও, এই রাজতান্ত্রিক ৬টি আরব রাষ্ট্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হাজার হাজার সৈন্য নিয়ে এসব দেশের নিরাপত্তার অজুহাতে জেঁকে বসে ১৯৯০ সালে। মূলত ইরাক কর্তৃক কুয়েত দখলকে কেন্দ্র করে তাদের এই জেঁকে বসা।
শুধু ১৯৯০–এর দশকই নয়, ১৯৭৯ সাল থেকে এই উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রসমূহ ইরানকে শত্রু মনে করে আমেরিকার আশ্রয়ে থাকাকে গুরুত্ব দেওয়াটা মনে হয় বড় ধরনের ভুল পররাষ্ট্রনীতি।
আরও আগে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, ইরানের রাজতান্ত্রিক শাহের সাথে উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রসমূহের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। ইরানের ইমাম আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনীর নেতৃত্বে ইরানি গণজাগরণে রাজতন্ত্র উৎখাত হয়। পাহলভি শাহ ১৯৭৯ সালে ইরান ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। পাহলভির সাথে পশ্চিমা বিশ্বের বন্ধুত্ব থাকায় আমেরিকাসহ ওইসব দেশে শত হাজার বিলিয়ন–ট্রিলিয়ন ডলার মজুত থাকে। পরবর্তীতে ওইসব দেশে ইরানের যাবতীয় সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়। আমেরিকা মরিয়া হয়ে চেষ্টা করেছিল ইরানে পাহলভি শাহের রাজতান্ত্রিক শাসন ধরে রাখতে। এতে রাজতান্ত্রিক সরকারের অপারেশনে শত হাজার ইরানি মারা যায়।
শাহ উৎখাতের পর ফ্রান্সে নির্বাসনে থাকা ইমাম রুহুল্লাহ খোমেনী ইরানে ফিরে আসেন। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা তাঁর আঙুলের ইশারায় চললেও তিনি প্রত্যক্ষ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা থেকে দূরে ছিলেন।
ইমাম রুহুল্লাহ খোমেনী ঘোষণা দেন যে, “আমরা শিয়াও নই, সুন্নিও নই; আমরা মুসলমান’’। তিনি দেশের নাম রাখেন ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান‘। ওই সময় পারস্য উপসাগরের পশ্চিম পাশের ৬টি রাজতান্ত্রিক আরব রাষ্ট্রের উচিত ছিল ইরানের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা।
ইরানে পাহলভি শাহের বিদায়ের পর বিধ্বস্ত সেনাবাহিনী এবং দেশ সম্পূর্ণ এলোমেলো অবস্থায় ছিল, ঠিক এমনি সময় ১৯৮০ সালে ইরাকের লৌহমানব সাদ্দাম হোসেন ইরান আক্রমণ করে বসেন। আমেরিকার গোপন ইন্ধনে সাদ্দাম হোসেন ইরান আক্রমণ করেছিলেন বলে অনেক বিজ্ঞজনের মুখে মুখে প্রচারিত। দীর্ঘ ৮ বছর এই দুই মুসলিম দেশের মধ্যে ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ চলে। উভয় দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যায়। এই দীর্ঘ ৮ বছরব্যাপী ইরাক–ইরান যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে উপসাগরীয় রাজতান্ত্রিক আরব রাষ্ট্রসমূহ ইরাককে সমর্থন তো করেই যাচ্ছিল, সাথে সাথে সহযোগিতাও দিয়ে যাচ্ছিল।
১৯৮৮ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় দীর্ঘ ৮ বছরব্যাপী এই যুদ্ধের বিরতি ঘটে। এর ২ বছরের ব্যবধানে ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন ১৯৯০ সালে ২ আগস্ট কুয়েত দখল করে বসে। এতেও আমেরিকার ইন্ধন রয়েছে বলে প্রচার আছে। এমন পরিস্থিতিতে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বার বার বাদশাহ ফাহাদকে ফোন করে সৌদি আরবে সৈন্য মোতায়েন করার জন্য, যাতে কুয়েত দখলমুক্ত করতে ইরাক আক্রমণ করতে সুবিধা হয়। সেই থেকে পর্যায়ক্রমে আমেরিকা–সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কাতার, বাহরাইন ও কুয়েতে সৈন্য মোতায়েন করে। মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার ১৯টি ঘাঁটি রয়েছে বলে জানা যায়, যেখানে ৪০–৫০ হাজার সৈন্য মোতায়েন আছে। এর সাথে বিমান ঘাঁটি, অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান এবং নৌবাহিনীর অত্যাধুনিক বিশাল বিশাল জাহাজ ইরানের বগলের ভেতর পারস্য উপসাগরের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থান নেয়।
এসব নিরাপত্তা ও আমেরিকাকে আশ্রয়–প্রশ্রয় দিয়ে বিলিয়ন–ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করে এই আমেরিকান ঘাঁটিগুলো রাখার কারণ কী? উত্তর একটাই–বিশাল শত্রুদেশ ইরান থেকে রক্ষা পাওয়া। ব্রিটিশরা ফ্রান্সকে সাথে নিয়ে ওসমানীয় (অটোমান) সাম্রাজ্যকে ধ্বংস করে ১০–১২টি আরব রাষ্ট্রের উৎপত্তি ঘটায়, যা মাত্র সর্বোচ্চ ১১০/১২০ বছরের ঘটনা।
যে শত্রুদেশ ইরান থেকে রক্ষা পেতে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল বিশাল ঘাঁটি ও হাজার হাজার সৈন্য মোতায়েন করা হয়েছে, সেই ঘাঁটি ব্যবহার করে ইসরায়েলকে বগলে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বার বার ইরানকে আঘাত করছে। ইরানের অপরাধ হলো–তারা যাতে আমেরিকার তাবেদারিতে থাকে এবং মাথা উঁচু করে না দাঁড়ায়। আমেরিকা আরব রাষ্ট্রগুলোর ঘাঁটি ব্যবহার করে ইরানকে হয়রানি করছে; আঘাত করছে।
আমেরিকার ইন্ধনে ইসরায়েল ইরানের বহু ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে হত্যা করেছে; যেমন হামাসের নেতা ইসমাইল হানিয়া, লেবাননের হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরুল্লাহ, ইরাক–সিরিয়ায় জেনারেল কাসেম সুলেইমানি । আরব রাষ্ট্রসমূহের অভিভাবক আমেরিকার ইন্ধনে ইসরায়েল এসব কাজ করে যাচ্ছে। সর্বশেষ ইরানের ইমাম আয়াতুল্লাহ আলী খামেইনীসহ তাঁর পরিবার, দেহরক্ষী ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের একসাথে হত্যা করে আমেরিকা।
মানুষের পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে যায়, তখন তার হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। আজ ইরানকে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য বলা যায়–হয়তো শহীদ হব, নয়তো গাজী হব। ১৬ লাখ ৪৮ হাজার ১৯৫ বর্গকিলোমিটারের বিশাল দেশ ইরানে বর্তমানে প্রায় ৮ কোটি নর–নারী রয়েছে।
আমেরিকাকে অভিভাবক মেনে নিরাপত্তার জন্য ঘাঁটি করার সুযোগ দিয়ে হাজার হাজার বিলিয়ন–ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করছে রাজতন্ত্রীয় আরব রাষ্ট্রসমূহ আমেরিকান ঘাঁটিসমূহ রক্ষা করা হচ্ছে নিজের দেশের নিরাপত্তা ও স্বার্থ চিন্তা করে। অর্থাৎ, ঘরের পাশে বিশাল শত্রুদেশ ইরান থেকে রক্ষা পেতে।
১৯৭৯ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৪৭ বছর উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রসমূহ বার বার ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে গায়ে পড়ে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে। অথচ ইরান উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রসমূহের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়েছে, এমন কোনো দৃষ্টান্ত আমার নজরে আসছে না। আমেরিকাকে মাথায় না নিয়ে, ইরানের বিরুদ্ধে সাদ্দাম হোসেনের পক্ষ অবলম্বন না করে, পার্শ্ববর্তী বিশাল দেশ ইরানের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সহাবস্থানে থাকলে অসুবিধা কী ছিল।
গাজাবাসী হলো সুন্নি, হামাসও সুন্নি। তাদের পাশে তো শিয়া দেশ ইরানই দাঁড়িয়েছিল, আর কেউ তো ছিল না। গাজার পার্শ্ববর্তী শক্তিশালী আরব দেশগুলো উদারভাবে দরদ দেখাতে পারল না। রাফা ক্রসিং তো মিসর নিজের দখলে রাখতে পারত আরব মুসলমানদের কল্যাণে, কিন্তু মিসর তা করল না। একমাত্র শিয়া দেশ ইরান ছাড়া আমেরিকার ভয়ে অন্য কোনো আরব দেশ গাজার পাশে দাঁড়াতে সাহস করল না।
স্বভাবতই কৌশলগত কারণে ইরান লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুথিদের নানাভাবে সহযোগিতা দিয়ে যাবে–এটাই স্বাভাবিক। এখন হুথিদের কারণে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী যেমন দিশেহারা, তেমনি সৌদি আরবের প্রায় ১০০ বছরের ইতিহাসে এটি খুবই প্রতিকূল অবস্থা।
আফসোসের বিষয়, উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রসমূহ যেভাবে পেট্রোডলারে শত হাজার বিলিয়ন–ট্রিলিয়ন খরচ করে রাজপরিবারগুলো বিলাসী জীবনে গা ভাসিয়ে দিয়েছে, তা মনে হয় না মুসলিম বিশ্ব ভালো চোখে দেখবে। অপরদিকে ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং পরবর্তীতে আমেরিকা যে মুসলিম রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর নয়–এই সহজ সত্যটি রাজতান্ত্রিক আরব শেখদের কেন বুঝে আসছে না, তা নিয়ে নিজে নিজে ভাবি। উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রসমূহসহ সমগ্র মুসলিম বিশ্ব একসময় বাদশাহ ফয়সালকে অঘোষিতভাবে নেতা মেনেছিল। রাজতান্ত্রিক আরব রাষ্ট্রসমূহের বাদশাহ ফয়সালের সেই আদর্শ ও চরিত্র ভুলে যাওয়ার কথা নয়।
যে যেভাবে বলুক না কেন, আমার মতে উপসাগরীয় রাজতান্ত্রিক আরব রাষ্ট্রসমূহ পার্শ্ববর্তী বিশাল ইরানের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক না রেখে উল্টো চরম শত্রুভাবাপন্ন থাকাটা তাদের জন্য একটি বড় ভুল। বর্তমান বিশ্বে কোনো স্বাধীন দেশকে অপর কোনো শক্তিশালী দেশ চাইলেই দখল করে নিতে পারে না। তেমনি ইরানের পক্ষেও উপসাগরীয় রাজতান্ত্রিক দেশসমূহ দখলের কোনো প্রশ্নই আসে না।
বস্তুত উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রসমূহ মুসলিম দেশ সমূহের আধিপাত্যবাদী দেশ আমেরিকার আশ্রয়ে না থেকে, ইরানের সাথে সহাবস্থানে থাকাটা কল্যাণকর ছিল।
লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক, কলামিস্ট।










