চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন বলেছেন, একটি নগরীর উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সমন্বিত কাঠামো না থাকায় অনেক সম্ভাবনাময় প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টি হচ্ছে। নগরীর পরিকল্পনা, অবকাঠামো উন্নয়ন, ভূমি ব্যবস্থাপনা, পরিবহন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও নাগরিক সেবাকে একই পরিকল্পনার অধীনে পরিচালনা করতে হলে নগর সরকার প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি। গতকাল নগরীর আগ্রাবাদ ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার হলে কমনওয়েলথ জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন (সিজেএ), বাংলাদেশ চ্যাপ্টার আয়োজিত ‘চট্টগ্রাম : ইকোনমিক গেটওয়ে অ্যান্ড লাইফলাইন অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শাহাদাত বলেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম ওয়াসা, পানি উন্নয়ন বোর্ড, জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসনসহ নগরের উন্নয়ন ও নাগরিক সেবার সঙ্গে সম্পৃক্ত সব প্রতিষ্ঠানকে একটি সমন্বিত প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসতে হবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আইনগত দায়িত্ব বজায় রেখেই সমন্বিত পরিকল্পনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব। এ জন্য নগর সরকারের মতো কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, শিল্পকারখানা, ব্যবসা–বাণিজ্য, পর্যটন এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের বিপুল সম্ভাবনা এই নগরকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। অথচ সেই সম্ভাবনাকে আমরা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছি না। একটি নগরীর উন্নয়নে বিভিন্ন সংস্থা পৃথকভাবে সিদ্ধান্ত নিলে পরিকল্পিত উন্নয়ন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রশাসক বলেন, চট্টগ্রামের অন্যতম প্রধান সমস্যা জলাবদ্ধতা। এ সমস্যা নিরসনে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। খাল খনন, নালা সংস্কার, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। পাশাপাশি আরও খালকে উন্নয়ন পরিকল্পনার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কর্ণফুলী নদীর অপর পাড়ে পরিবেশবান্ধব নগর ও সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন ডা. শাহাদাত হোসেন। নগর সরকার থাকলে এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া অনেক বেশি সমন্বিত ও কার্যকর হতে পারে। তিনি আরো বলেন, নগরীর উন্নয়নের জন্য শুধু অর্থ বরাদ্দই যথেষ্ট নয়। সময়মতো প্রকল্প অনুমোদন এবং কার্যকর প্রশাসনিক সিদ্ধান্তও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এপি বাংলাদেশের ব্যুরো প্রধান ব্যুরোপ্রধান জুলহাস আলমের সঞ্চালনায় সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন সিজেএ–বি সভাপতি পারভীন এফ. চৌধুরী। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সেমিনারের বিশেষ অতিথি ও চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিসিআই) সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক। তিনি বলেন, মাতারবাড়ী বন্দর ও বে টার্মিনালসহ বিদ্যমান চট্টগ্রাম বন্দরের সমন্বিত ব্যবহার বিভিন্ন ধরনের জাহাজ ও পণ্য পরিবহনের সুযোগ বাড়াবে। চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে নেপালের মতো স্থলবেষ্টিত দেশগুলোর পণ্য পরিবহনে দূরত্ব প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার থেকে কমে এক হাজার ২০০ কিলোমিটারে নামতে পারে। ভারতের উত্তর–পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্য, নেপাল ও মিয়ানমারের কিছু অঞ্চলে বন্দর ও লজিস্টিকস সেবা সমপ্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে মাতারবাড়ী থেকে পণ্য পরিবহনে নৌপথের ব্যবহার, পাঁচটি মোটরওয়ে নির্মাণ, রেল ও নৌ যোগাযোগ উন্নয়ন এবং বিনিয়োগ আকর্ষণে নিরবচ্ছিন্ন ইউটিলিটি সেবা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
একুশে পদকপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব ও দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম এ মালেক বলেছেন, ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর চট্টগ্রামের গুরুত্ব অনেক বেড়ে যায়। এই সময়ের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা বলি : ইস্পাহানি পরিবার তাদের কর্পোরেট সদর দপ্তর কলকাতা থেকে চট্টগ্রামে স্থানান্তর করে। এই ঘটনাটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ একটি প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী পরিবার তখন চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ওপর আস্থা রেখেছিল। বিশ্বের অন্যান্য বাণিজ্যিক শহরের ইতিহাস থেকে আমরা জানি, বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করতে হয় শিল্প, বিনিয়োগ, আর্থিক সেবা, প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা। আমার প্রশ্ন, দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর যে শহরে, সেই শহরে কি এইসব সুবিধা যথাযথভাবে রয়েছে? হ্যাঁ, এটা ঠিক, চট্টগ্রামে আজও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন, ইস্টার্ন রিফাইনারি এবং বাংলাদেশ চা বোর্ড। কিন্তু আমরা প্রায়ই শুনি কিংবা পত্রিকায় পড়ি, চট্টগ্রাম থেকে বিপিসির সদর দপ্তর সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা চলছে। বিপিসির চেয়ারম্যানসহ পরিচালকেরা মাসে একদিন চট্টগ্রামে আসেন। বাকি দিনগুলোতে অফিস করেন ঢাকায়। টি–বোর্ডের চট্টগ্রামের গুরুত্ব কমাতে শ্রীমঙ্গলে আলাদা অকশন চলছে। আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের সদরদপ্তর ছিল চট্টগ্রামে। অথচ এখন চট্টগ্রামে রেলের গুরুত্ব বহুলাংশে কমে গেছে। একজন জেনারেল ম্যানেজার থাকলেও সিদ্ধান্ত আসে রাজধানী থেকে। চট্টগ্রামে বহু বহুজাতিক কোম্পানি ছিল, অধিকাংশই চলে গেছে। চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী করার কথা বহু বছর ধরে শুনছি। কিন্তু এত বছরেও বাণিজ্যিক রাজধানীর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো চট্টগ্রামে কি গড়ে তোলা হয়েছে? কোনো ব্যাংক বীমার সদরদপ্তর চট্টগ্রামে নেই। চট্টগ্রাম থেকে গত বছর সরিয়ে নেয়া হয়েছে বিনিয়োগ বোর্ডের কার্যালয়ও।
দৈনিক আজাদী সম্পাদক বলেন, আমরা প্রায়ই শুনি, চট্টগ্রাম হবে সিঙ্গাপুর। চট্টগ্রাম হবে সাংহাই। চট্টগ্রাম হবে বিশ্বমানের শহর। এই চাওয়ার মধ্যে কোনো দোষ নেই। কিন্তু আমার প্রশ্ন– চট্টগ্রামকে সিঙ্গাপুর হতে হবে কেন? সাংহাইও বা হতে হবে কেন? আমি মনে করি, চট্টগ্রামকে চট্টগ্রামই হতে হবে। কারণ একটি শহরের আন্তর্জাতিক পরিচিতি অন্যকে অনুকরণ করে হয় না। এই পরিচিতি আসে তখনই, যখন আমরা নিজের সংস্কৃতি, প্রকৃতি, অর্থনৈতিক শক্তিকে বিকশিত করতে পারি। উন্নত করতে পারি। বিশ্বমানের শহর মানে শুধু উঁচু উঁচু ভবন নয়। নাগরিকের স্বস্তিদায়ক জীবন যখন আপনি নিশ্চিত করবেন তখনই তা বিশ্বের নজর কাড়ে। তখনই তা হয় বিশ্বমানের। আমরা সিঙ্গাপুরের কাছ থেকে পরিকল্পনা শিখব। সাংহাইয়ের কাছ থেকে অর্থনৈতিক উন্নতির শিক্ষা নেব। আর চট্টগ্রামকে চট্টগ্রামের মতো করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এই শিক্ষা কাজে লাগাব। ১৯২৬ সালে চট্টগ্রাম বন্দরকে মেজর পোর্ট ঘোষণা করা হয়। তখন আধুনিক সিঙ্গাপুরের জন্ম হয়নি। সাংহাই তখনও আজকের সাংহাই হয়ে ওঠেনি। ১৯৬৫ সালে মালয়েশিয়া থেকে পৃথক হয়ে সিঙ্গাপুর স্বাধীন হয়। তখন সেখানে ছিল দারিদ্র্য, বেকারত্ব। চারদিকে বস্তি। কিন্তু তারা তাদের ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়েছে। লি কুয়ান ইউ–এর নেতৃত্বে প্রথম ১৫–২০ বছর সংস্কার চলল। এয়ারপোর্ট ও বন্দর উন্নয়ন হলো। পরের ২০ বছরে এটি শীর্ষস্থানীয় উন্নত রাষ্ট্র হয়ে গেল। মানে সব মিলে ৩৫ বছর। আর সাংহাই ১৯৮০–এর দশক পর্যন্ত একটি পুরনো শিল্পকেন্দ্রিক শহর ছিল। কিন্তু ১৯৯০–এর দশকে এর দ্রুত আধুনিকায়ন শুরু হয়। মাত্র ২০ বছরের মধ্যে সাংহাইয়ের স্কাইলাইন বদলে যায়। এটি এশিয়ার অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক হাবে পরিণত হয়। কথা হচ্ছে, তারা পারল, আমরা সেভাবে পারলাম না কেন? সেই প্রশ্নেরই উত্তর আমাদের খুঁজতে হবে। সময়ের সাথে দরকার নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
সেমিনারে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি ও পোর্ট ইউজার্স ফোরামের চেয়ারম্যান আমীর হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী, সিজেএ মহাসচিব ওসমান গনি মনসুর, ঢাকা ফ্ল্যাশের সম্পাদক ফরিদ হোসেন, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন, ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম চট্টগ্রামের সভাপতি এস এম আবু তৈয়ব, প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক মোহিত উল আলম এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও ক্লিনিক্যাল এপিডেমিওলজিস্ট অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বড়ুয়া ও চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক ডা. মইনুল ইসলাম মাহমুদ। এছাড়া চার জেলার সাংবাদিক, গবেষক, পরিকল্পনাবিদ, শিক্ষাবিদ ও বিভিন্ন পেশার প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
সেমিনারে অন্যান্যা বক্তারা চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে দেশের প্রধান শহরগুলোর মধ্যে উন্নত ও দ্রুত যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁরা ঢাকা–চট্টগ্রামের যাতায়াত সময় প্রায় দুই ঘণ্টায় নামিয়ে আনার লক্ষ্যে আধুনিক পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়ন, গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ও সেবাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম রাজধানীর বাইরে সমপ্রসারণ এবং শিল্প ও বাণিজ্যবান্ধব পরিকল্পিত নগরায়ণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। বক্তারা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে চট্টগ্রামের ভূমিকা আরও শক্তিশালী করতে চট্টগ্রাম বন্দরের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে আঞ্চলিক যোগাযোগ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।








