দেশের জ্বালানি তেল আমদানি ও পরিবহনে দীর্ঘদিনের ব্যয়বহুল লাইটারেজনির্ভর ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার উদ্যোগ অবশেষে আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে। কঙবাজারের মহেশখালীতে নির্মিত দেশের প্রথম সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) স্থাপনার পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পিটি পার্টামিনা ট্রান্স কন্টিনেন্টালকে। এ জন্য প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে পাঁচ বছর মেয়াদি চুক্তি করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকায় বিপিসির লিয়াজোঁ অফিসে এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছর সমুদ্রের মুরিং ব্যবস্থা থেকে শুরু করে উপকূলীয় স্থাপনা, পাইপলাইন–সংশ্লিষ্ট সরঞ্জামসহ পুরো ব্যবস্থার পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করবে পার্টামিনা।
বিপিসির পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন পরিচালক (পরিকল্পনা) মুহাম্মদ আসাদুল হক। পার্টামিনার পক্ষে স্বাক্ষর করেন প্রতিষ্ঠানটির প্রেসিডেন্ট ডিরেক্টর হ্যারিস আবদি সেম্বিরিং মেলিয়ালা। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিপিসির চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলাম।
এর আগে গত ২৩ সেপ্টেম্বর সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি পার্টামিনাকে এসপিএম পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করে। পাঁচ বছরের জন্য চুক্তির আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকা।
এসপিএম প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত বড় তেলবাহী জাহাজ (মাদার ট্যাংকার) থেকে সরাসরি পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানি তেল খালাস করা। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে ছোট লাইটারেজ জাহাজে তেল স্থানান্তর করে তা উপকূলে আনতে হয়। এ প্রক্রিয়ায় সময় যেমন বেশি লাগে, তেমনি জাহাজ ভাড়া, পরিবহন ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়ের কারণে খরচও বাড়ে।
নতুন ব্যবস্থায় মহেশখালীর পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরে স্থাপিত বিশেষ ভাসমান বয়া বা মুরিং পয়েন্টে বড় জাহাজ নোঙর করবে। সেখান থেকে সমুদ্রের তলদেশ ও স্থলভাগের পাইপলাইনের মাধ্যমে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল (ক্রুড অয়েল) এবং পরিশোধিত ডিজেল সরাসরি মহেশখালীর কালারমারছড়ায় নির্মিত ট্যাংক ফার্মে নেওয়া হবে। পরে সেখান থেকে অপরিশোধিত তেল চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে এবং ডিজেল পেট্রোলিয়াম ডিপোতে সরবরাহ করা হবে।
প্রকল্পটির আওতায় সমুদ্র ও স্থলভাগ মিলিয়ে প্রায় ২২০ কিলোমিটার ডাবল পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে অপরিশোধিত তেল ও ডিজেল পরিবহনের জন্য পৃথক পাইপলাইন রয়েছে। মহেশখালীতে নির্মাণ করা হয়েছে ছয়টি বিশাল ধারণক্ষমতার স্টোরেজ ট্যাংক। এর মধ্যে তিনটি অপরিশোধিত তেলের জন্য, প্রতিটির ধারণক্ষমতা ৫০ হাজার ঘনমিটার। বাকি তিনটি ডিজেলের জন্য, প্রতিটির ধারণক্ষমতা ৩০ হাজার ঘনমিটার। এ ছাড়া পাম্পিং স্টেশন, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং আধুনিক নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি (এসসিএডিএ) স্থাপন করা হয়েছে।
এসপিএম চালু হলে জ্বালানি তেল খালাসের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। বিপিসির প্রাক্কলন অনুযায়ী, প্রচলিত ব্যবস্থায় এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল খালাস করতে যেখানে আট থেকে ১০ দিন সময় লাগে, সেখানে এসপিএমের মাধ্যমে তা প্রায় ৪৮ ঘণ্টায় সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। ৬০ থেকে ৭০ হাজার টন ডিজেল খালাসে সময় লাগবে আনুমানিক ২৮ ঘণ্টা।
বর্তমানে বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে তেল স্থানান্তরের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। এতে জাহাজের অবস্থানকাল বেড়ে যায় এবং আমদানি ব্যয়ও বাড়ে। এসপিএম চালু হলে লাইটারেজ জাহাজের ওপর নির্ভরতা কমবে, জাহাজের অপেক্ষমাণ সময় কমবে এবং দ্রুত তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা সহজ হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সময় বিপিসি বছরে প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিল। তবে বর্তমান আমদানি ও ব্যবহারের পরিমাণ বিবেচনায় সামপ্রতিক হিসাবে বছরে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিপিসির এসপিএম প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালের আগস্টে। চীন সরকারের ঋণসহায়তায় বাস্তবায়িত এ প্রকল্পের নির্মাণকাজ করে চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড (সিপিপিইসি)।
শুরুতে প্রকল্পটির ব্যয় প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হলেও বিভিন্ন পর্যায়ে তা বেড়ে প্রায় ৮ হাজার ২৯৮ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। কয়েক দফা সময় বাড়ানোর পর ২০২৪ সালের মার্চে নির্মাণ ও পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শেষ হয়। পরীক্ষামূলকভাবে গভীর সমুদ্রের জাহাজ থেকে অপরিশোধিত তেল ও ডিজেল খালাস করে পাইপলাইনের মাধ্যমে উপকূলে পাঠানোর কার্যক্রমও সম্পন্ন হয়েছিল।
কিন্তু নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরও নিয়মিত পরিচালনার জন্য অপারেটর নিয়োগ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। ফলে অবকাঠামো প্রস্তুত থাকলেও দীর্ঘ সময় বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। এদিকে প্রকল্পের জন্য নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হয়েছে। বিপিসি ইতিমধ্যে ৩ হাজার ৭৭ কোটি টাকা ঋণ পরিশোধ করেছে এবং ডিসেম্বরের মধ্যে আরও ৬৯০ কোটি টাকা পরিশোধ করবে বলে সূত্র জানিয়েছে। অপারেটর নিয়োগে বিলম্বের কারণে নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের ১৮ মাসের ডিফেক্ট লায়াবিলিটি মেয়াদও ২০২৬ সালের আগস্টে শেষ হয়েছে। এখন থেকে স্থাপনায় কোনো ত্রুটি দেখা দিলে তার মেরামতের ব্যয় বিপিসিকে বহন করতে হতে পারে।
এসপিএম পরিচালনার দায়িত্ব দিতে বিপিসি আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করলে প্রথম দফার দরপত্রে উপযুক্ত দরদাতার আর্থিক প্রস্তাব বিপিসির প্রাক্কলনের চেয়ে অনেক বেশি হওয়ায় টেন্ডার বাতিল করা হয়। পরে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দ্বিতীয় দফায় দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে তিনটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দেয়। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো ইন্দোনেশিয়ার পিটি পার্টামিনা ট্রান্স কন্টিনেন্টাল, চীনের সিপিপিইসি এবং হংকংভিত্তিক হিলং মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং। মূল্যায়ন শেষে পার্টামিনাকে কারিগরিভাবে যোগ্য এবং সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির মূল প্রস্তাব ছিল ১২ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার। কর ও ভ্যাটসহ পাঁচ বছরের চুক্তিমূল্য দাঁড়ায় ১৫ কোটি ৯১ লাখ ৩৫ হাজার ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকা।
সূত্র বলেছে, এসপিএম চালু হওয়ার পরও এর সম্পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করা নিয়ে কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশেষ করে অপরিশোধিত তেল পরিবহনের জন্য নির্মিত পাইপলাইনের বার্ষিক সক্ষমতা প্রায় ৪৫ লাখ টন। অন্যদিকে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের বর্তমান বার্ষিক পরিশোধন সক্ষমতা প্রায় ১৫ লাখ টন। ফলে বর্তমান সক্ষমতায় এসপিএমের মাধ্যমে আনা সব অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করা সম্ভব হবে না। এ ক্ষেত্রে ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট (ইআরএল–২) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পরিশোধন সক্ষমতা আরও ৩০ লাখ টন বাড়বে। এতে এসপিএমের অপরিশোধিত তেল পরিবহন অবকাঠামোর ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।












