বৃষ্টি নেই, ফেটে চৌচির জমি

মীরসরাইয়ে আমন নিয়ে শঙ্কা

মাহবুব পলাশ, মীরসরাই | শনিবার , ৭ নভেম্বর, ২০২৬ at ৫:৪০ পূর্বাহ্ণ

মীরসরাই উপজেলার কিছু এলাকায় অপ্রত্যাশিত খরা ও প্রাকৃতিক বিরূপতায় এবার আমন ধানের ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে পাহাড়ি অঞ্চলের কাছাকাছি গ্রামগুলোর ফসলি জমিতে এ সংকট বেশ স্পষ্ট। ধানের গোড়ার মাটি শুকিয়ে জমি ফেটে চৌচির হয়ে যাওয়ায় অনেক জমির ধান অপরিপক্ব অবস্থায় চিটা হয়ে যাচ্ছে। কৃষি বিভাগ বলছে, চলমান সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে স্থায়ী উদ্যোগ নেওয়া হবে। মীরসরাই উপজেলার ১৬টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভার বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠে চলতি আমন মৌসুমে এখন সোনালি ও সবুজাভ আভায় দুলছে ধান। উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এবার উপজেলায় আমন চাষ হয়েছে ১৯ হাজার ৮৭০ হেক্টর জমিতে, যা গত বছরের তুলনায় ৫০ হেক্টর বেশি। ফলে এবার আমনে ভালো ফলনের প্রত্যাশা ছিল কৃষকদের। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে সেই প্রত্যাশায় দেখা দিয়েছে শঙ্কা।

মাঠের বর্তমান অবস্থা ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ জমির ধান এখন পরিণত হওয়ার পর্যায়ে রয়েছে। শিগগিরই ধানের গোছায় শীষ বের হওয়ার কথা। কিন্তু এ সময় কিছু এলাকায় ধানের গোড়ার মাটি শুকিয়ে জমি ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। পানির অভাবে ধানের গোছাগুলো স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে পারছে না। অনেক জমিতে ধান পরিপক্ব হওয়ার আগেই চিটা হয়ে যাচ্ছে। এতে ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গতকাল শুক্রবার সরেজমিনে উপজেলার তালবাড়িয়া গ্রামে এমন চিত্র দেখা গেছে। এ সময় গ্রামের প্রান্তিক কৃষক নিজাম উদ্দিন বলেন, তার ১৬ গণ্ডা জমিতে গত বছর আমনের ফলন ঘরে তুলে প্রায় ৩০ হাজার টাকার ধান বিক্রি করেছিলেন। বাকি ধান দিয়ে সারা বছর পরিবারের চালের চাহিদাও মিটেছিল। কিন্তু এবার জমির প্রায় সব ধানই চিটা হয়ে যাচ্ছে। অর্ধেক ফলনও ঘরে তোলা যাবে না বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।

নিজাম উদ্দিন বলেন, আশপাশের কয়েকজন কৃষক কয়েকটি জমিতে পার্শ্ববর্তী পুকুর থেকে সামান্য পানি দিতে পেরেছিলেন। কিন্তু এরপর আর বৃষ্টি না হওয়ায় ফসলের এমন বিপর্যয় হয়েছে। ধানের শীষ বের হওয়ার আগেই জমির মাটি ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। সবুজ ধান লালচে রং ধারণ করার আগেই শুকিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা প্রফেসর সালাউদ্দিন বলেন, এখানকার মাঠের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া ছড়াটি সংকুচিত হয়ে গেছে এবং সংস্কারের অভাবে শুকিয়ে পড়েছে। এটি সচল থাকলে মহামায়া ছড়া থেকে অবাধে সেচের পানি আনা যেত।

গড়িয়াইশ গ্রামের কৃষক তোফাজ্জল হোসেন বলেন, তার দুই কানি জমির ধানের মধ্যে এক কানির ধানই চিটা হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কী করবেন বুঝতে পারছেন না। আগে থেকে সেচের ব্যবস্থা করেননি। আগে থেকে পরিস্থিতি বুঝতে পারলে মহামায়া লেক থেকে সেচের জন্য ড্রেন বা নালা তৈরি করে রাখতেন।

উপজেলার তালবাড়িয়া, আমবাড়িয়া, পূর্ব খৈয়াছরা, পূর্ব ওয়াহেদপুর, পূর্ব দুর্গাপুর ও হিঙ্গুলী ইউনিয়নের বিভিন্ন অংশে এ সংকট দেখা দিয়েছে। এতে এবার উপজেলার কয়েক শ একর জমিতে আমনের ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

উপজেলা কৃষি সুপারভাইজার কাজী নুরুল আলম বলেন, এবার উপজেলার বেশ কিছু এলাকায় এমন সমস্যা দেখা দিয়েছে। এতে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কয়েক শ কেজি পর্যন্ত ধানের চিটা বাড়তে পারে। এখন থেকে কৃষকেরা সামান্য হলেও সেচের ব্যবস্থা করতে পারলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করছেন তিনি। এছাড়া প্রতিকূলতা মোকাবিলায় কৃষকদের বিভিন্ন সহায়ক পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি সমপ্রসারণ কর্মকর্তা প্রতাপ চন্দ্র রায় বলেন, মূলত প্রাকৃতিক কিছু প্রতিকূলতার কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আমন মৌসুমের শেষ দিকে বৃষ্টিপাত খুব কম হয়েছে, কোনো কোনো স্থানে একেবারেই বৃষ্টি হয়নি। ফলে এ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখে ইতোমধ্যে কিছু এলাকায় মহামায়া লেক ও ছড়াগুলো থেকে সেচের উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আগামী মৌসুমে কৃষকদের সময়মতো, অর্থাৎ মৌসুমের শুরুতেই চারা রোপণের পরামর্শ দেওয়া হবে। কেউ দেরিতে চারা রোপণ করলেও যাতে এমন খরার মুখে না পড়েন, সে জন্য আগেভাগেই সেচের ব্যবস্থা রাখার পরামর্শ দেওয়া হবে। তবে সব প্রতিকূলতা কাটিয়ে মীরসরাইয়ের কৃষকেরা ভালো ফলন ঘরে তুলতে পারবেন বলে আশা করছেন কৃষি বিভাগের এ কর্মকর্তা।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপাহাড়ে জুম উৎসব
পরবর্তী নিবন্ধমহেশখালীতে ডাম্প ট্রাক চাপায় যুবক নিহত