দূরের টানে বাহির পানে

হাসান আকবর | বুধবার , ৭ অক্টোবর, ২০২৬ at ১০:৩৩ পূর্বাহ্ণ

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

আমাদের ফেরি চলছিলো। ভিক্টোরিয়া হারবারের বুক চিরে সবুজ–সাদা স্টার ফেরিতে এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে যাচ্ছিলাম আমরা। ওপারে সিম শা সুই–কাউলুন। মাঝখানে জলরাশি। দুই পাড়ের আকাশচুম্বী সব ভবন, হারবারের নীল জলরাশিতেও ভবনগুলোর প্রতিচ্ছবি, যেনো উপরে নিচে দুই দুইটি শহর!

ফেরির বাতাস মুখে এসে লাগছিল। শহরের কোলাহল তখন অনেকটাই পেছনে। চারদিকে শুধু জল, আকাশ আর শহরের অসাধারণ স্থাপত্য। কাছ থেকে দেখে আসা ভবনগুলোকে দূর থেকে একেবারে অন্যরকম লাগছিলো। সড়কপথে গেলে যে হংকংকে দেখি, পানি থেকে সেই হংকংকে মনে হচ্ছিলো নতুন কোন অচিন শহর।

সেন্ট্রালের সুউচ্চ ভবনগুলো পেছনে পড়ে যেতে শুরু করল। একটু একটু করে শহরটা যেন দূরে সরে যাচ্ছে। অথচ একই সঙ্গে পুরো হংকং যেন আমার চোখের সামনে আরও বড় হয়ে বেড়ে উঠছে, বড় করে দেখা যাচ্ছে। বিপুল বিস্ময় নিয়ে আমি চারদিকে তাকাচ্ছিলাম। ফেরি যখন মাঝখানে, তখন দুই পাড়ের দৃশ্য একসঙ্গে দেখা যায়। পেছনে সেন্ট্রালের সুউচ্চ সব ভবন, সামনে কাউলুনের দীর্ঘ জলতীর। মনে হচ্ছিলো, ডানে বামে দুইটি আস্ত শহর নিয়ে আমি রাজার মতো সাগরের বুকে বসে আছি!

ডানদিকে হংকং দ্বীপের আধুনিক নগরী। কাচ আর ইস্পাতের বিশাল ভবনগুলো যেনো আকাশ ফুটো করতে মরিয়া। ব্যস্ত বন্দর, হারবারের বুকে নানা ধরনের নৌযান। কোথাও ছোট নৌকা, কোথাও বড় জাহাজ। আমাদের স্টার ফেরি নির্দিষ্ট গতিপথ ধরে নির্দিষ্ট গতিতে এগুচ্ছিলো। পেছনে বিপুল পানির ঘূর্ণি আর সাদা ফেনা ছিল অত্যন্ত রোমাঞ্চকর! সত্যিই রোমাঞ্চিত হচ্ছিলাম আমি।

কিছুক্ষণ পর চোখে পড়ল সিম শা সুইয়ের দিকের বিখ্যাত স্থাপনাগুলো। জলরেখার কাছে হংকং কালচারাল সেন্টারের বিশাল স্থাপনা। তার পাশেই ঐতিহাসিক ক্লক টাওয়ার। টিপু ভাই জানালেন, ১৯১৫ সালে নির্মিত এই লাল ইট ও গ্রানাইটের টাওয়ার একসময় কাউলুন–ক্যান্টন রেলওয়ের টার্মিনালের অংশ ছিল। রেলস্টেশনটি আজ নেই, কিন্তু টাওয়ারটি ইতিহাসের স্মৃতি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই স্টার ফেরিও সেই সময়কার, ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আজো টিকে আছে। ফেরি যত সামনে এগুচ্ছিলো, ক্লক টাওয়ার যেনো তত বড় হচ্ছিলো। মনে হচ্ছিলো, পুরানো একটি ইতিহাস আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে।

কাউলুনের তীর যত কাছে আসছিল, তত স্পষ্ট হয়ে উঠছিল ভবনগুলো। সামনে ভেসে উঠল সিম শা সুইয়ের ব্যস্ত এলাকা। সহযাত্রী টিপু ভাই বললেন, হাজারো পর্যটক, অগুনতি দোকান, হোটেল আর রেস্তোরাঁয় ভরা এই এলাকাটি নাকি হংকংয়ের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। ফেরি ধীরে ধীরে ঘাটের দিকে এগিয়ে গেল।

অবশেষে ফেরি এসে ভিড়ল সিম শা সুই পিয়ারে। মনে হলো, মাত্র কয়েক মিনিটে যেন এক শহর থেকে আরেক শহরে পৌঁছে গেলাম।

ফেরি থেকে নেমে প্রথমেই চোখে পড়ল সেই পুরোনো ক্লক টাওয়ার। পাশে হংকং কালচারাল সেন্টার। সামনে বিশাল ভিক্টোরিয়া হারবার।

ফেরি থেকে নামার পর প্রথমেই মনে হলো– আরে ওপাড়ের হংকংতো আরো অনেক বেশি সুন্দর লাগছে। এই পাড় থেকে হংকংকে অনেক বিস্তৃত এবং অনেক গোছানো বলে মনে হচ্ছিলো। ভিক্টোরিয়া হারবারের ওপারে সেন্ট্রালের সুউচ্চ ভবনগুলো যেন হাতছানি দিয়ে বলছিলো, এপাড়ই সুন্দর, এখানেই দুনিয়ার সবকিছু। এপাড় বলছিলো, আরে কাউলুন অনেক সুন্দর, অনেক ব্যস্ত শহর। মাঝখানে বিখ্যাত ভিক্টোরিয়া হারবারের সেই বিস্তৃত জলরাশি।

ঘাট থেকে বেরিয়ে একটু এগোলেই হারবারফ্রন্ট। ভিক্টোরিয়া হারবারের মুখী এই এলাকাটি একেবারে অন্যরকম। পরিবেশটা একেবারে আলাদা, মনে হলো পুরোটাই পর্যটন নির্ভর। প্রশস্ত হাঁটার পথ, সমুদ্রের দিকে খোলা জায়গা, বসার স্থান, রাস্তার পাশেই বার, ডিসকো, পর্যটকদের আনাগোনা এবং সামনে পুরো সেন্ট্রাল স্কাইলাইন। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ পরিবারের সঙ্গে বসে আছেন, কেউবা শুধু নীরবে হারবারের দিকে তাকিয়ে চুক চুক করে বিয়ারের ক্যানে চুমুক দিচ্ছেন, কারো কারো হাতে কফিসহ নানা খাবারও দেখা গেলো। হাত বাড়ালেই এখানে সবকিছু মিলে। সুতরাং দূর থেকে খুঁজে আনার দরকার নেই। পর্যটকদের আকর্ষণে যতটুকু করা দরকার তার সবটুকুই যেনো এখানে করে রাখা হয়েছে।

হারবারফ্রন্টে দাঁড়িয়ে আমি বিভোর হয়ে সৌন্দর্য দেখছিলাম। আমার মনে হচ্ছিলো বড় বড় ভবনের চেয়ে এমন খোলা জলরাশি, এমন উন্মুক্ত নীল আকাশ থাকা একটি শহরের জন্য অনেক বেশি জরুরি।

টিপু ভাই বললেন, হারবার ফ্রন্টের সৌন্দর্য সন্ধ্যায়, রাতে। দিনে এখানের অবস্থা পুরোপুরি অনুভব করা কঠিন। আমি মানসচক্ষে সন্ধ্যা কল্পনা করলাম। ভিক্টোরিয়া হারবারের দুই তীরের ভবনগুলোতে যখন একে একে আলো জ্বলে ওঠে, তখন নিশ্চয় মনে হবে, পুরো শহরটি আলোর মালা পরে আছে। পানিতে সেই আলোর প্রতিফলন পানিতে এবং উপরে দুইটি শহর সৃষ্টি করে! ভাবা যায়!! টিপু ভাইকে রাত না হোক অন্ততঃ সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকার অনুরোধ করলাম। বললাম, সময় তো বেশি বাকি নেই। আমার তো ফেরারও তাড়া নেই। তাই চলেন ঘুরে ফিরে সন্ধ্যাটা কাটিয়ে যাই।

টিপু ভাই ‘কোন সমস্যা নেই’ বলে আমার কথাতেই সায় দিলেন। আমরা সাগরের পাড় ধরে হাঁটতে শুরু করলাম। এক পাশে পানি, অন্য পাশে শহর। কিছুদূর এগোতেই সামনে পড়লো অ্যাভিনিউ অব স্টারস।

অ্যাভিনিউ অব স্টারস হংকংয়ের চলচ্চিত্রজগতের স্মৃতিকে ঘিরে তৈরি একটি এলাকা। এই এলাকাটি পর্যটকদের কাছে অনেক বেশি আকর্ষণীয়। হংকংয়ের চলচ্চিত্র জগতের কিংবদন্তিদের স্মৃতিকে ধারণ করে তৈরি এই ওয়াটারফ্রন্টের এলাকাটিতে হাঁটতে হাঁটতে মনে পড়ে যায় সেইসব সিনেমার কথা, যেগুলো একসময় আমাদের কৈশোর–তারুণ্যের কল্পনার জগৎকে নাড়া দিয়েছিল। যাদের পোস্টার ভিউকার্ড আমাদের ঘরে শোভা পেতো।

ব্রুস লি, জ্যাকি চ্যান, অ্যানিতা মুই–হংকংয়ের চলচ্চিত্রের কত পরিচিত নাম এখানে স্মৃতির অংশ হয়ে আছে। অ্যাভিনিউ অব স্টারসের প্রায় ৪০০ মিটারজুড়ে রয়েছে চলচ্চিত্র তারকাদের স্মারক, হাতের ছাপ ও ভাস্কর্য। আমি যেনো কিংবদন্তীর স্পর্শ পাচ্ছিলাম।

বারবার পেছনে ফিরে তাকাচ্ছিলাম। ওপারে হংকং দ্বীপ।

কিছুক্ষণ আগেও যে শহরটাকে খুব কাছ থেকে দেখছিলাম, এখন সেটিকে মনে হচ্ছে ছবির মতো। সুউচ্চ ভবনগুলো যেনো নীল আকাশের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার। নিচে নীলচে জলরাশি। তার ওপর ছোট–বড় নৌযান। আর সবকিছুর ওপর ছড়িয়ে পড়েছে হংকংয়ের সেই অনন্য নগর–জ্যোতি।

এখান থেকে ভিক্টোরিয়া হারবারের দৃশ্যও অসাধারণ। দূরে সেন্ট্রাল, তার পেছনে পাহাড়, সামনে জলরাশি–সবকিছু মিলিয়ে যেনো কোন শিল্পীর আঁকা চমৎকার একটি ছবি, কিংবা বড়সড় একটি ভিউকার্ড।

আমি মনভরে তাকিয়ে থাকলাম। মনে হচ্ছিলো, এই দৃশ্যটি ক্যামেরায় ধারণের জন্য নয়, বুকের গভীরে রাখার জন্য। ভিক্টোরিয়া হারবার এবং ওপারের সেন্ট্রাল যেনো বুকের গভীরে অনেক যত্নে রাখার মতো একটি ছবি।

ওয়াটারফ্রন্টে বসে আমরা কফি এবং বার্গার টাইপের কিছু খাবার খেলাম। বেলা গড়িয়ে যাচ্ছিলো, চারদিক কেমোন যেনো এক মিষ্টি আলোর আবহ।

সন্ধ্যা নামতে পুরো এলাকাটির দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে গেল। দিনের ব্যস্ত শহর ধীরে ধীরে আলোর শহরে পরিণত হলো। একে একে জ্বলে উঠল ভবনের আলো। ভিক্টোরিয়া হারবারের পানিতে সেই আলো ভেঙে ভেঙে পড়ছে। মনে হলো, শহরটি যেন নিজের আরেকটি প্রতিচ্ছবি পানির নিচে তৈরি করেছে।

সিম শা সুইয়ের এই প্রমেনাড ধরে আরও এগোলে হংকং মিউজিয়াম অব আর্ট, স্পেস মিউজিয়ামসহ নানা বিখ্যাত স্থাপনা একটির পর একটি দেখা যায়। জলতীরের সঙ্গে আধুনিক শিল্প, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ব্যবসাপাতির এমন সুনিপুণ মেলবন্ধন খুব কম শহরেই দেখা যায়।

ঝলমলে সন্ধ্যাটা আমাকে ঘোরের মধ্যে নিয়ে গেলো। এককথায় মুগ্ধ হয়ে গেলাম। এতো আলো, এতো উচ্ছ্বসিত মানুষ অনেক শহরেই দেখা যায় না, আমাদের শহরেতো নয়ই। ফেরার সময় হয়ে গেলো। ফিরতি পথের স্টার ফেরির টিকেট কাটা ছিল। তাই আমরা আবারো স্টার ফেরিতে উঠলাম। এবার পেছনে তাকিয়ে রইলাম সিম শা সুইয়ের দিকে।

ফেরি ধীরে ধীরে পিয়ার ছাড়ল। ক্লক টাওয়ার ছোট হতে লাগল। অ্যাভিনিউ অব স্টারসের আলো দূরে সরে গেল। আর সামনে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিলো সেন্ট্রালের আলোকোজ্জ্বল ঝলমলে স্কাইলাইন। (চলবে)

লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধনির্জনতায় বসবাস আর নিজের সাথে নিজে কথা বলা
পরবর্তী নিবন্ধসৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (ক.) : মানবকল্যাণেরও অনন্য দৃষ্টান্ত