২৪ এর গণ–অভ্যুত্থানের পর কক্সবাজার জেলার শীর্ষ আলোচিত ঘটনা ছিল তরুণ সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট তানজিম ছারোয়ার নির্জন হত্যা। ওই বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর দুর্ধর্ষ ডাকাতদের আস্তানায় অভিযান চালাতে গিয়ে তাদের ছুরিকাঘাতে নির্মমভাবে খুন হন তিনি। ওই ঘটনা তখন দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করে। ঘটনার দু’বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই এই আলোচিত হত্যাকাণ্ডে চারজনকে মৃত্যুদণ্ড ও ৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়ে একটি ঐতিহাসিক রায় দিয়েছে কক্সবাজারের আদালত।
হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত চারজন হলেন, চকরিয়ার ডুলহাজার ইউনিয়নের পূর্ব ডুমখালী এলাকার জাফর আলমের ছেলে মো. হেলাল উদ্দিন, রিংভং এলাকার মৃত কামাল হোসেনের ছেলে নুরুল আমিন, পূর্ব ডুমখালী এলাকার আবদুল মালেকের ছেলে মো. নাছির উদ্দিন, একই এলাকার আবুল কালাম কবিরাজের ছেলে মোর্শেদ আলম। মোর্শেদ আলম পলাতক রয়েছেন।
যাবজ্জীবনসহ কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ৯ জন হলেন, চকরিয়া পৌরসভার কাহারিয়াঘোনার নুরুল কবিরের ছেলে জামাল উদ্দিন বাবুল, পতিয়ারঘোনা এলাকার মৃত শহর মুল্লুকের ছেলে মোহাম্মদ আরিফ উল্লাহ, ভরামুহুরি এলাকার আকতার আহমদের ছেলে মোহাম্মদ আনোয়ার হাকিম, পূর্ব মাইজপাড়ার মোজাফ্ফর আহমদের ছেলে জিয়াবুল করিম, একই এলাকার নুরুল আলমের ছেলে মো. ইমাঈল হোসেন, পূর্ব মাইজপাড়ার মৃত নুরুল আলমের ছেলে এনামুল হক প্রকাশ তোতা এনাম, পূর্ব ডুমখালী এলাকার মৃত নুরুল ইসলাম লালুর ছেলে মোহাম্মদ এনাম, রংমহল এলাকার নুর আলম মিস্ত্রির ছেলে মো. কামাল ও রিংভং এলাকার গোলাম কাদেরের ছেলে আবদুল করিম। গতকাল বুধবার দুপুরে জনাকীর্ণ আদালতে এই চাঞ্চল্যকর মামলার রায় ঘোষণা করেন কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ–৫ম আদালতের বিচারক মোহাম্মদ আবুল মনসুর সিদ্দিকী। রায় ঘোষণাকালে ১২ জন আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন। রায়কে স্বাগত জানিয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ। তবে উচ্চ আদালতে আপিলের ঘোষণা দিয়েছে আসামিপক্ষ।
রাষ্ট্রপক্ষের নিয়োজিত কৌঁসুলি খোরশেদ আলম চৌধুরী জানান, রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষ্যপ্রমাণ, বিভিন্ন আলামত ও উপস্থাপিত কাগজপত্রের মাধ্যমে মামলাটি প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। আদালত সাক্ষীদের জবানবন্দি, রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক, সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং মামলার সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করেই রায় দিয়েছে। বিচারক প্রত্যেক আসামির বিরুদ্ধে যতটুকু অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে, সে অনুযায়ী রায় ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন, আমাদের দৃষ্টিতে রায়টি সন্তোষজনক, সুস্থ ও নিরপেক্ষভাবে দেয়া হয়েছে।
বাদী পক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর জানান, বেলা ১১টায় এই আলোচিত হত্যা মামলার রায়ের প্রকাশে আদালতের কার্যক্রম শুরু হয় যা চলে দুপুর ১২টা পর্যন্ত। এরপর আদালত রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ৪ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। একই সঙ্গে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ৫ জনকে খালাস দেয় আদালত।
মামলার নথিপত্র সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ভোরে চকরিয়ার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের মাইজপাড়া গ্রামে ডাকাতি প্রতিরোধ ও অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান চালায় যৌথবাহিনী। এ সময় ডাকাত দলের সদস্যরা পালাতে চেষ্টা করলে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট মো. তানজিম ছারোয়ার নির্জন (২৩) তাদের ধাওয়া করেন এবং একপর্যায়ে ডাকাতদের ছুরিকাঘাতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে রামু সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
২৫ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে সেনা বাহিনীর ফাঁসিয়াখালী ক্যাম্পের সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার আব্দুল্লাহ আল হারুনুর রশিদ বাদী হয়ে ডাকাতি ও হত্যা এবং পুলিশের উপ–পরিদর্শক (এসআই) আলমগীর হোসেন বাদী হয়ে অস্ত্র আইনে ২টি মামলা দায়ের করেন। যেখানে ১৭ জনের নাম উল্লেখসহ ২৫ জনের নাম ছিল। ২০২৫ সালের ১৯ জানুয়ারি পুলিশ তদন্ত শেষ করে ১৮ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে।
সেনা কর্মকর্তা হত্যায় ১৭ জনের নামে মামলা হলেও সেখান থেকে এই হত্যাকাণ্ডে ৬ জনের সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে অভিযোগপত্র থেকে। ব্যাপক তদন্তে বের হয়ে আসে এজাহারের বাইরে থাকা আরও ৭ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত করে ১৮ জনের বিরুদ্ধে ডাকাতির প্রস্তুতিসহ হত্যা ও অস্ত্র আইনে পৃথক মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। অভিযোগপত্র আদালতে গৃহিত হওয়ার পর বিচারকার্য শুরু হয়।
বাদীপক্ষের প্রধান আইনজীবী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, একজন তরুণ সেনা কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন ও দেশের সেবায় গিয়ে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। তার পরিবার, সেনাবাহিনী, রাষ্ট্র এবং দেশবাসী–সবারই প্রত্যাশা ছিল ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক। তবে শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে বা একতরফা সাক্ষ্য নিয়ে কাউকে দণ্ডিত করা যায় না। আদালত সাক্ষ্যপ্রমাণ, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি ও মামলার সার্বিক দিক বিবেচনা করেই বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। সবকিছু পর্যালোচনার পর চারজনকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হয়েছে।
বাদীপক্ষের আইনজীবী আহসান সেজান তিনি বলেন, লেফটেন্যান্ট তানজিম ছিলেন একজন দেশপ্রেমিক কর্মকর্তা। মানুষের জানমাল রক্ষা ও আইনগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সময় সৃষ্ট পরিস্থিতিতে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তিনি জানান, এ ঘটনায় হত্যা ও অস্ত্র আইনে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। ঘটনার এক বছর আট মাস পর আজ দুই মামলারই রায় ঘোষণা হয়েছে। প্রসিকিউশনের উপস্থাপিত সাক্ষ্যপ্রমাণ ও আসামিপক্ষের জেরা–উভয় দিক বিবেচনা করেই আদালত এ রায় দিয়েছেন। খালাসপ্রাপ্ত পাঁচজনের রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি পর্যালোচনা করা হবে। প্রয়োজন হলে এবং কেউ অন্যায়ভাবে পার পেয়ে গেছে বলে মনে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান এই আইনজীবী।
উল্লেখ্য, মাত্র ২৩ বছর বয়সী এই সেনা কর্মকর্তা টাঙ্গাইলের বাসিন্দা ছিলেন। বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি থেকে ২০২২ সালে কমিশনপ্রাপ্ত হয়ে আর্মি সার্ভিস কোরে দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি।











