আসুন মানবিক হই

শাহীন চৌধুরী ডলি

রবিবার , ১৪ এপ্রিল, ২০১৯ at ৭:২৪ পূর্বাহ্ণ
88

অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর বলে একটা কথা আছে। মারাত্মক কিছু সমস্যা যেভাবে আমাদের মনে ছাপ ফেলার কথা, সেভাবে কি এখন আর ছাপ ফেলে? বিপদে আমরা মানুষের সাহায্যে এগিয়ে না গিয়ে মোবাইলে ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পরি। আমরা প্রযুক্তিকে অপব্যবহার করে উন্নত হতে পারবো না। আমাদের মনে রাখতে হবে যেকোনো সময় আপনি আমিও ভয়াবহ বিপদের সম্মুখীন হতে পারি। আমরা সবাই হয়তো নিদারুণ কষ্টকর ঘটনাগুলো দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি অথবা অতি শোকে পাথর হয়ে গেছি। অথবা আমরা ভয়ংকর বিপদে মানুষকে পতিত হওয়া দেখলেও তা আমাদের কাছে সাধারণ চলমান ঘটনা বলেই প্রতীয়মান হয়।
প্রতিদিন কোথাও না কোথাও থেকে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংবাদ এখন ডাল ভাত,যদিও সব মানুষের জীবন অমূল্য। দেহ থেকে একবার প্রাণ হারিয়ে গেলে আর ফিরে আসে না। প্রতিটি দুর্ঘটনার খবর খুব গুরুত্ব নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে আসে না। এটা সম্ভবও না। কিছু কিছু সড়ক দুর্ঘটনার পর এক দুইদিন তীব্র আন্দোলন চলে। তারপর আবার কোন নতুন দুর্ঘটনার খবরে সেটা চাপা পড়ে যায়। কোন কোন মৃত্যুর খবর বিচ্ছিন্নভাবে পত্রিকার এক কোণে পরে থাকে। একটি মৃত্যু মানেই একটি পরিবারের চরম বিপর্যয়। যারা প্রিয়জন হারায় কেবল তারাই সেই কঠিন মর্মবেদনা উললব্ধি করতে পারে। ইদানিং স্কুল, কলেজ আর ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রীদের যেন ড্রাইভাররা টার্গেট করে করে মারছে।সন্তান হারিয়ে বাবা মা পাগলপ্রায় কিন্তু প্রশাসনের টনক নড়ছে না। বর্তমান সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল দেখে অন্তত তাই মনে হয়। অপরিণত বয়সের মেধাবী নাগরিক হারিয়ে পরিবারের পাশাপাশি দেশও কি পিছিয়ে যাচ্ছে না?বাবার কাঁধে সন্তানের লাশ কতটা ভারী তা বুঝতে সমর্থ হওয়া অবশ্যই উচিৎ।
যেখানে সেখানে আগুনে গোগ্রাসে গিলে খাচ্ছে নিম্নবিত্তের আবাস বস্তি থেকে শুরু করে হাইরাইজ বিল্ডিং। মার্কেট, দোকান, গ্রামগঞ্জের বাজারের দোকানপাট, বাসাবাড়ি কিছুই বাদ যাচ্ছে না। এক একটা বড় বড় অগ্নিকাণ্ড ঘটে। মানুষ পুড়ে কয়লা হয়, জীবন জীবিকা পুড়ে ছাই হয়। আমরা এতো দুর্ঘটনা দেখি, তবুও সচেতন হই না। মনে করি, আমাদের নিজেদের জীবনে এমন ঘটনা কোনদিন ঘটবেনা। নিমতলী ট্রাজেডি,গুলশান ১ নাম্বার ডিএনসিসি মার্কেট অগ্নিকাণ্ড, চকবাজার ট্র্যাজেডি,করাইল বস্তিতে অগ্নিকাণ্ড, বনানী এফআর টাওয়ার, আজকে পুনরায় পুড়লো গুলশান ডিএনসিসি মার্কেট, মার্কেটের তিনশত কাঁচাবাজারের দোকান পুড়ে সর্বশান্ত হলো শত শত ব্যবসায়ী। প্রায় প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আমাদের স্বজনেরা নিহত আহত হয়। যারা আহত হয়ে বিছানায় কাতরায় তাদের কষ্ট মৃত্যুযন্ত্রণা থেকে কোন অংশে কম নয়। অনেকে দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে বেঁচে থেকে অবর্ণনীয় কষ্ট ভোগ করছে। পরিবারের বোঝা হয়ে যাচ্ছে। চিকিৎসা আর ওষুধের খরচ টানতে টানতে পরিবার তাদের সর্বস্ব হারাচ্ছে। তবু কি আমরা সচেতন হচ্ছি? অন্যের জায়গায় একবার নিজেকে দাঁড় করিয়ে ভাবুন না।
আরেক সামাজিক ব্যাধি ধর্ষণ। রেহাই পাচ্ছে না ছোট্ট অবুঝ শিশু থেকে সত্তর বছরের বৃদ্ধা নারী। ধর্ষণের পর বহু ধর্ষিতাকে মেরে ফেলা হচ্ছে। স্কুল, কলেজ,মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী কেউ বাদ যাচ্ছে না। সব ধর্ষণের খবর আমাদের জানা হয়না। যারা অপকর্ম করছে তাদের কোন লজ্জা নেই, লজ্জা যেন ভুক্তভোগীর। পরিবার অনেক সময় সমাজে হেয় প্রতিপন্ন হবে ভয়ে মামলা করা থেকে বিরত থাকে। আবার ধর্ষকের পরিবার যদি প্রভাবশালী হয় তবে তো তাদের ধমক ধামকের ভয়ে তটস্থ থাকতে হয়।নির্যাতিতা মেয়েরা উপায়ন্তর না দেখে আত্মহননের পথ বেছে নিয়ে যেন মরে বেঁচে যায়। আমাদের ধর্ষিতা নারীরা কি মায়ের জাতি নয়? মায়ের জাতির অবমাননা যে দেশে অহরহ ঘটতে থাকে সে দেশে কি করে পরবর্তী প্রজন্ম সুস্থভাবে বেড়ে উঠবে? পরকীয়ার মতন সামাজিক ব্যাধির কারণে কত নারী খুন হচ্ছে,শিশু খুন হচ্ছে। যৌতুক লোভীরা যৌতুক না পেয়ে নারীদের খুন করছে কিন্তু খুনির প্রকৃত বিচার হচ্ছে না।
প্রতিটি ঘটনায় প্রথম দিকে খুব লেখালেখি হয়, টিভিতে টক শো, মানববন্ধন সহ বিভিন্ন কর্মসূচি চলে। তারপর আবার আরেক ইস্যুতে আমরা ব্যস্ত হয়ে ভুলে যাই পূর্বের ঘটনার কথা। আমাদের দেশে নিত্যনতুন ইস্যুর কোন অভাব নেই। মানুষ কি করে এতো দ্রুত ভুলে যেতে পারে? মানুষ অত্যাচারের কথাও ভুলে যায়। অন্যায় ঘটতে দেখলে উটপাখির মতন বালিতে মুখ গুঁজে থাকে। নিজেকে ঝামেলামুক্ত রাখার প্রয়াসে প্রতিবাদের ভাষা ভুলে যায়। হত্যা, গুম, খুন এগুলো আমাদের সমাজের নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে একজনের সাথে অন্যজনের রেষারেষির ফলাফলে হত্যাকাণ্ডও মামুলি ব্যাপার মাত্র।
আমাদের প্রত্যককে মানবিক হতে হবে। একের বিপদে অন্যকে দ্রুত এগিয়ে আসতে হবে। প্রতিটি ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয়ভাবে আইনের কঠোর প্রয়োগ থাকতে হবে। আইন ঠিকভাবে মানা হচ্ছে কিনা সে ব্যাপারে নজরদারি থাকতে হবে। পথচারীদের সড়ক পারাবার আইন মেনে চলতে হবে।টাকা বাঁচানোর লোভে অদক্ষ ড্রাইভার হেল্পারের হাতে যেন কোন গাড়ির মালিক গাড়ির স্টেয়ারিং ছেড়ে না দেন। কোন অসাধু কর্মকর্তা যেন টাকার লোভে ভুল ব্যক্তিকে ড্রাইভিং লাইসেন্স না দেন। চালকরা যেন ট্রাফিক আইন মেনে চলে। মদ্যপ অবস্থায় কোন চালক যেন গাড়ি না চালায়। সড়ক মহাসড়কে যেন গাড়ি ওভারটেক করতে পাল্লা না দেয়। গাড়ির ফিটনেস অনেক বড় একটা ব্যাপার। ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় চলাফেরা করা মানেই এঙিডেন্টের সমূহ সম্ভাবনা থাকে। যেকোন এঙিডেন্টের সাথে সাথে নিকটস্থ হাসপাতাল যেন দ্রুত চিকিৎসা ব্যবস্থা দিয়ে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করে সেটা নিশ্চিত করতে হবে। ট্রাফিক পুলিশদের দায়িত্ব পালনে সচেতন হতে হবে।
অগ্নি দুর্ঘটনা থেকে বাঁচতে হলে প্রথমে বিল্ডিং কোড মেনে ভবন তৈরি করা অত্যাবশ্যক। অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা অবশ্যই যথাযথভাবে রাখতে হবে। ভবনগুলোতে ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক কেবল উন্নতমানের হতে হবে। রান্নার চুলা, সিগারেটের শেষাংশ,সিলিন্ডারের নিরাপদ ব্যবহারে গুরুত্ব দিতে হবে। মাঝে মাঝে দক্ষ ইলেক্ট্রিশিয়ান দ্বারা ইলেক্ট্রিক লাইনগুলো ঠিক আছে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখতে হবে। আগুন লাগলে ভবনে যেন পাগলা ঘন্টা বেজে উঠে যাতে ভবনে থাকা সবাই সচেতন হতে পারে। প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম।
প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম। বিপদ বলে কয়ে আসেনা। আর তাই সবসময় যে কোন বিপদ মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত থাকতেই হবে। বিশ্বজুড়ে অগ্নি নির্বাপণের নানাবিধ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, যেখানে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি।যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের অগ্নি নির্বাপণ ক্ষেত্রে এমন ব্যবস্থা রাখতে হবে যেন যেকোন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মানুষের জীবন এবং সম্পদ বাঁচানো সম্ভব হয়।অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থার পাশাপাশি দুর্ঘটনাকবলিত লোকজন যেন দ্রুত স্থান ত্যাগ করতে পারে সেকরম আধুনিক সুব্যবস্থা রাখতে হবে।
আমাদের দেশ ডিজিটাল হচ্ছে, দেশে বড় বড় স্থাপনা তৈরি হচ্ছে, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। নিজেদের অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। মেট্রোরেল প্রকল্প নির্মাণাধীন অবস্থায় আছে। এলিভেটেড এঙপ্রেসওয়ে প্রজেক্ট বাস্তবায়নে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। ফসল উৎপাদনে আমরা বিশ্বের সাথে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে নেই। আমাদের দেশের বিজ্ঞানীরা নিত্যনতুন আবিষ্কারে তাক লাগিয়ে দিচ্ছে।দেশের জিডিপির অনুপাত পূর্বের তুলনায় অনেকগুণ বেশি। আমাদের গার্মেন্টস এবং ওষুধ কোম্পানিগুলো বিদেশে কোটি কোটি ডলারের ব্যবসা করছে। আমাদের সন্তানরা শুধু দেশে নয়, বিদেশেও নিজেদের মেধা উপস্থাপনের মাধ্যমে দেশের সুনাম ছড়িয়ে দিচ্ছে। আমাদের প্রবাসী শ্রমিকেরা তাদের পাঠানো অর্থে রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে নিরলস কাজ করে দেশের উন্নয়নে সাহায্য করছে।এতো এতো অর্জন বিফলে যাবে যদি আমরা আমাদের দেশের অপঘাতে মৃত্যু, খুন, ধর্ষণ, রাহাজানি, সড়ক দুর্ঘটনা এমন আরো কিছু কঠিন সমস্যা থেকে বের হয়ে আসতে না পারি।এইসব মৃত্যুর প্রকৃত পরিসংখ্যান দেখলে মাথা নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়। প্রতিটি মেয়েকে পরিবার,সমাজ এবং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা দিতে হবে। আমাদের সমাজে নারীদের অবদান অনেক। একজন মেয়ে শিশু, কিশোরীকে নারী হিসেবে গড়ে উঠতে সুযোগ দিতে হবে। নারীর সবচেয়ে বড় সমস্যা নিজের ঘরের নিকট আত্মীয়।ঘরে, রাস্তাঘাটে, স্কুল, কলেজে, পথে প্রান্তরে,বাসে,ট্রেনে সর্বক্ষেত্রে বিপরীত লিঙ্গের মানুষ দ্বারা যৌনহয়রানির শিকার হওয়া, নির্যাতিতা হওয়া এবং পাশবিকতার কারণে আক্রান্ত হওয়া যেন নারীর নিয়তি।
প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের দেশে আইন আছে। কিন্তু কাজীর গরু কেতাবে থাকলেও গোয়ালে নেই। মানে সবক্ষেত্রে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নেই, বিচার নেই। অপরাধী কঠিন সাজা পাচ্ছে না। আইনের ফাঁক-ফোকরে অথবা রাজনৈতিক দল ও নেতাদের ছত্রছায়ায় থাকায় আসামি ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। আসামি জামিন নিয়ে বুক ফুলিয়ে সমাজে ঘুরে বেড়ায় এবং উল্টো ভুক্তভোগীকে শাসাতে পিছু হটেনা। অন্যায়ের জন্য সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি যদি কঠোর সাজা পেতো তাহলে নতুন করে কেউ অন্যায় করার দুঃসাহস করতে সাহস পেতো না। দেশকে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় এগিয়ে নিতে হলে সঠিক বিচারের বিকল্প কিছুই নেই। আমরা আর কোন স্বজনকে সড়ক দুর্ঘটনায়,অগ্নিকাণ্ডে, খুন, রাহাজানি,ধর্ষণ, বিনা দোষে মৃত্যুদণ্ড এভাবে হারাতে চাই না। অগ্রগামী হতে গিয়ে পিছু হটতে না চাইলে আমাদের উচিৎ হবে সবার আগে মানবিক হওয়া। মুখে নয় অন্তর দিয়ে আসুন মানবিক হই।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক

x