নগরের বিভিন্ন খালে পানি নিষ্কাশনে যে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে তা চিহ্নিত করতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ও জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা সেনাবাহিনীর প্রতিনিধিরা যৌথভাবে পরিদর্শন করবেন। এক্ষেত্রে মেগা প্রকল্পের কাজের সুবিধার্থে খালে দেয়া অস্থায়ী বাঁধ, নির্মাণ সামগ্রী বা অন্যান্য ময়লা–আর্বজনা রয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখবেন তারা। এরপর বর্ষার আগেই প্রতিবন্ধকতাগুলো অপসারণ করা হবে। মেগা প্রকল্পের বাইরে ৩৫ টি খাল এবং ড্রেন পরিষ্কার করবে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। বিশেষ করে খালের সঙ্গে সংযুক্ত ড্রেন পরিষ্কার করে বৃষ্টির পানি নালা হয়ে খালে পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করবে চসিক। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ কর্ণফুলীর সঙ্গে সংযুক্ত খালগুলোর মুখ পরিষ্কার রাখবে।
‘নগরের সকল খাল ও পানি নিষ্কাশন নালাসমূহ সারা বছর সচল রাখাসহ বিভিন্ন উন্নয়ন ও সেবামূলক কাজের সমন্বয়ের জন্য স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের গঠিত কমিটির প্রথম সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়েছে। গতকাল বুধবার বিকেলে টাইগারপাসস্থ নগর ভবনের অস্থায়ী কার্যালয়ে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন কমিটির প্রধান সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। এ সভা অনুষ্ঠিত হয় ক্লোজ ডোর। সভায় সিটি মেয়র ও সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার ব্রিগেডের ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শামসুল আলম আগামী বর্ষায় নগরের জলাবদ্ধতা পূর্বের তুলনায় ৮০ শতাংশ কমানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। এ লক্ষ্যে কাজ করছেন বলেও জানান।
সভায় উপস্থিত একাধিক সদস্যের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানায়, গত ৫ মে নগরের ৭টি খালে চলমান কার্যক্রম বিষয়ে পৃথক সাতটি কমিটি গঠন করে চসিক। কমিটি সরেজমিন পরিদর্শন করে পৃথক রির্পোট জমা দেয়। যেখানে নগরের বিভিন্ন খালে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কথা বলা হয়। গতকালকের মিটিংয়ে সে রিপোর্ট উপস্থাপন করেন চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন। এসময় কমিটির সদস্য এক প্রকৌশলী বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন। এসময় বেশিরভাগ প্রতিবন্ধকতা নিয়ে আপত্তি জানায় মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা, বলা হয় সেগুলো অপসারণ করা হয়েছে। এরপর মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন যৌথভাবে পরিদর্শন করার সিদ্ধান্ত দেন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আজ বৃহস্পতিবার পরিদর্শন করার কথা রয়েছে।
এ বিষয়ে চসিকের সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন আজাদীকে বলেন, প্রতিবন্ধকতা বলতে যেখানে পানি প্রবাহ একটু স্লো। বালি, অস্থায়ী বাঁধ বা আড়াআড়ি পাইপ আছে এরকম। এ ধরনের কিছু স্পট চিহ্নিত হয়। সেনাবাহিনী ইতোমধ্যে অনেকগুলো ক্লিয়ার করে ফেলেছেন। কালকে (আজ) আবার যৌথভাবে ভিজিট করা হবে।
এ দিকে গতকালকের সভায় বক্তব্য রাখেন সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার ব্রিগেডের ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শামসুল আলম, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. নুরুল করিম ও চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী।
যা বললেন মেয়র : সভা শেষে সাংবাদিকদের সভার বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসন। এ সময় তিনি খাল–নালা পরিষ্কারের পর তা ভরাট রোধে ডোর টু ডোর প্রকল্পের বিকল্প নেই বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, সাংবাদিক ভাইদের সহযোগিতা কামনা করছি। আমাদের হয়তো আবারও ডোর টু ডোর প্রকল্প শুরু করতে হতে পারে।
তিনি বলেন, সিটি কর্পোরেশন এলাকায় প্রতিদিন ৩ হাজার ২০০ মেট্রিক টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এরমধ্যে আমরা সংগ্রহ করতে পারি ২ হাজার ২০০ টন। বাকি এক হাজার মেট্রিক টন কোনো কারণে মিসিং। যখন ডোর টু ডোর প্রকল্প চালু করি তখন ওই ১ হাজার মেট্রিক টনের মধ্যে ৫০০ থেকে ৬০০ মেট্রিক টন সংগ্রহ করতে পারি। কিন্তু কিছু মিডিয়া এমনভাবে উপস্থাপন করেছে, ‘আরে মেয়র সাহেব, যেভাবে ডোর টু ডোরের জন্য ৭০–১০০ টাকবা নিচ্ছে, এই টাকা দিয়ে ওনি বোধহয় রাতারাতি কয়েকশ কোটি টাকার মালিক হয়ে গেছে’। যখন মিডিয়াতে এই কথা আসে, তখন সাধারণ মানুষ এবং যারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে রাজনীতিটাকে ব্যবহার করে তারাও একটা খোরাক পায়, এমনভাবে বলে আমাকে ভিলেন বানিয়ে দেয়।
তিনি বলেন, এক গ্রুপ বলছে ৬০ টাকা তো ট্যাক্সের সাথে নিচ্ছে। কিন্তু ট্যাক্সের সাথে তো নিচ্ছি না। ট্যাক্সের সাথে নিচ্ছি বাইরে যে ময়লাটা ফেলছেন, যেটা আমরা ক্লিন করছি সেটার জন্য। কিন্তু ডোর টু ডোর ময়লার জন্য তো আমরা ট্যাক্সের সাথে নিচ্ছি না।
তিনি বলেন, আমাদের গণসচেতনতা বৃদ্ধি করতে করতে হবে, জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে। এই বোধ আসতে হবে– এই শহরটা আমাদের সবার শহর।
মেয়র বলেন, দায়িত্বগ্রহণের আগে বর্ষায় বহদ্দাররহাট, মুরাদপুর, চকবাজার, মির্জাপুল, বাকলিয়া, আগ্রাবাদ, হালিশহর এলাকা পানিতে সয়লাব হত। তৎকালীন মেয়রের বাড়ি বহদ্দারহাট, ২২, ২৩ এমনকি ২৪ সালেও মেয়র ঘর থেকে বের হতে পারেন নাই। পরে পানি একটু সরে যাওয়ার পরে রিকশায় করে উনি বের হয়েছেন। কিন্তু ২০২৫ সালে আপনারা সেই পিকচার দেখেননি। ২০২৫ সালে সালে বহদ্দারহাট, মির্জাপুল, চকবাজার, বাকলিয়া ও আগ্রাবাদে পানি উঠেনি। আগে পানি নিচু এলাকাগুলোতে যেভাবে উঠতো ২০২৫ সালে সেভাবে পানি উঠেনি। সমন্বিত প্রচেষ্টার কারণে সেটা সম্ভব হয়েছে এবং সেটার মুখ্য ভূমিকায় ছিল আর্মি ইঞ্জিনিয়ারিং। আমি তাদেরকে ধন্যবাদ জানাই।
ডা. শাহাদাত বলেন, গত বর্ষার চেয়ে যাতে আগামী বর্ষায় ভালোভাবে থাকতে পারেন সে চেষ্টা করছি। গত বছর ৫০–৬০ ভাগ জলাবদ্ধতা আমরা কমাতে সক্ষম হয়েছি। এবার ইনশাল্লাহ আমাদের কমিটমেন্ট ৭০–৮০ ভাগ জলাবদ্ধতামুক্ত চট্টগ্রাম। আমরা এই ব্যাপারে বদ্ধপরিকর।
এ সময় মেয়র গত মাসের শেষ দিকে নগরের প্রবর্ত্তক মোড়ের জলাবদ্ধতার বিষয়ে বলেন, এটা একটা দুর্ঘটনা বলব আমি। কারণ যে ভারী বৃষ্টি হয়েছে সেটা আসলে বৈশাখের জন্য বেমানান। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হঠাৎ করে এ ধরনের ঘটনা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে সেটা হতে পারে।
মেয়র বলেন, ইদানিং আমরা লক্ষ্য করছি রাস্তায় ব্যবসায়ী বেড়ে গেছে। এরা কতক্ষণ রাস্তা দখল করে ফেলে, কতক্ষণ ফুটপাত দখল করে ফেলছে, যত্রতত্র তারা বসে যাচ্ছে। তারা যে পরিমাণ ময়লা ফেলছে তা ক্লিন করার জন্য আমাদের পরিচ্ছন্ন কর্মীদের রাতদিন কাজ করতে হচ্ছে। এই জায়গায় কিছু আইন আমাদের বাস্তবায়ন করতে হবে।
তিনি বলেন, আমাদের ম্যাজিস্ট্রেট আছে, জেলা প্রশাসনেরও ম্যাজিস্ট্রেট আছে। বর্ষাকালকে টার্গেট করে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করতে হবে। যারা সড়ক দখল করে ব্যবসা করছে এবং অপরিকল্পিতভাবে ময়লা ফেলছে, তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। যাতে তারা শহরটাকে নষ্ট করতে না পারে।
মেয়র বলেন, প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্তমানে আমাদের ড্রেনেজ ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় শত্রু। এসব বর্জ্য পানিতে মিশে না গিয়ে নালা–খালে জমে পানি চলাচল বন্ধ করে দিচ্ছে। এর ফলে একদিকে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে কর্ণফুলী নদী ভয়াবহ দূষণের শিকার হচ্ছে। নগরবাসীকে এ বিষয়ে আরও সচেতন হতে হবে।
মেয়র বন্দর প্রতিনিধির উদ্দেশে বলেন, আপনারা ড্রেজিং ঠিকভাবে করছেন? বিশেষ করে খালের মুখ পরিষ্কার করা, এটা আপনাদের দায়িত্ব, আপনাদের করতে হবে।
কি আলোচনা হয়েছে সভায় : সভায় সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার ব্রিগেডের ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শামসুল আলম বলেন, গত বছর ৬০ শতাংশ সমস্যার সমাধান করেছি। এই বছর টার্গেট নিয়েছি ৮০ শতাংশ এবং যে টার্গেট নিয়েছি সেটা এ বছর করব। এটার জন্য যদি সিটি কর্পোরেশনের জায়গাও পরিষ্কার করতে হয়, করব। তিনি বলেন, এই জানুয়ারিতে চেষ্টা করব ৩৬ খাল সম্পূর্ণ করে মেয়রকে বুঝিয়ে দেয়ার জন্য।
তিনি বলেন, জলাবদ্ধতাকে ৮০ শতাংশ কমাতে যা যা করার আমরা করাবো। ৩৬টা খাল মিলে ১১০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য পুরোটাকে আমরা গতিশীল করে দেব। এ বিষয়ে যে কোনো সহযোগিতার জন্য আমাদের জানালে আমরা পদক্ষেপ নিব। আপনারা এতটুকু আশ্বস্ত থাকেন যেখানে দেশের প্রধানমন্ত্রী সরাসরি এটাকে মনিটর করছেন, এখানে রাষ্ট্রযন্ত্র সেটা পারবে না, এটা আমি বিশ্বাস করি না। আমরা সবাই মিলে এ লক্ষ্য অর্জন করব ইনশাল্লাহ।
প্রবর্ত্তক মোড়ের প্রিমিয়ার ভার্সিটি ভাঙার পরামর্শ সিডিএ চেয়ারম্যানের : সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. নুরুল করিম বলেন, প্রবর্ত্তক এলাকায় দুটি ভবন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। একটি প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির ভবন এবং আরেকটি ইউএস কর্নার সংলগ্ন স্ট্রাকচার। ভবনগুলোর অবস্থা দেখে মনে হয়েছে, যেকোনো সময় ধসে পড়ে মানুষের প্রাণহানির কারণ হতে পারে। বিশেষ করে সামান্য ভূমিকম্প হলেও বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। ভেঙে ফেলা ভবনটির অবশিষ্ট অংশ এখনও দাঁড়িয়ে আছে, সেটি দ্রুত অপসারণ করা প্রয়োজন।
এসময় মেয়র চসিকের প্রধান প্রকৌশলীকে আগামী এক সপ্তাহ থেকে ১০ দিনের মধ্যেই ভবনটি ভেঙে ফেলার উদ্যোগ গ্রহণের নির্দেশনা দেন। সভায় উপস্থিত চসিকের কর্মকর্তারা জানান, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় কারিগরি মূল্যায়ন শেষে দ্রুত উচ্ছেদ ও অপসারণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে, যাতে নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।
মনিটরিং টিম গঠনের প্রস্তাব জেলা প্রশাসকের : চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা খাল পরিষ্কারের পর নিয়মিত পর্যবেক্ষণের জন্য একটি বিশেষ মনিটরিং টিম গঠনের প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, যেসব খালে কাজ হচ্ছে, কাজ শেষ হওয়ার পর কয়েকদিন ধরে সেগুলো পর্যবেক্ষণে রাখা প্রয়োজন। একটি টিম গঠন করে প্রতিদিনের সচিত্র প্রতিবেদন এই কমিটি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সামনে উপস্থাপন করা হলে বাস্তব পরিস্থিতি বোঝা সহজ হবে এবং টেকসই সমাধান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে শুধু খাল পরিষ্কার করাই যথেষ্ট নয়, বরং পরিষ্কারের পর সেগুলোর নিয়মিত তদারকি ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। নাগরিক সচেতনতার অভাব এবং খাল–নালায় পুনরায় ময়লা ফেলার প্রবণতা জলাবদ্ধতা সমস্যাকে জটিল করে তুলছে।
নাগরিক অসচেতনতার বিষয়টি তুলে ধরে জেলা প্রশাসক বলেন, নিয়মিত ময়লা অপসারণের ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও অনেকে সরাসরি খালে ময়লা ফেলে দেয়। এটিই বাস্তবতা। এভাবে চলতে থাকলে শুধু প্রকল্প বাস্তবায়ন করে কাক্সিক্ষত সুফল পাওয়া সম্ভব হবে না। বিপুল পরিমাণ পানি যে খাল দিয়ে প্রবাহিত হয় সেখানে যদি আবার ময়লা–আবর্জনা জমে, তাহলে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা কার্যকর থাকবে না।












