অতি বর্ষণে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় চট্টগ্রামের মৎস্য খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে। জেলার ১৫ উপজেলায় বন্যায় তলিয়ে গেছে পুকুর ও দিঘিসহ ১২ হাজার ৫৭১টি জলাশয়, যার আয়তন ৫ হাজার ৪৪২ দশমিক ২২ হেক্টর। জলাশয়গুলো ডুবে যাওয়ার পাশাপাশি পানির তীব্র স্রোতে অসংখ্য পুকুরের পাড় ভেঙে গেছে। ফলে ভেসে গেছে চাষকৃত মাছ। সব মিলিয়ে অন্তত ১০৯ কোটি ২৩ লাখ টাকার মৎস্যসম্পদের ক্ষতি হয়েছে। এ তথ্য জেলা মৎস্য অফিসের।
মাছচাষিরা জানিয়েছেন, আকস্মিক বন্যা হওয়ায় তারা প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পাননি। পাহাড়ি ঢলের পানি দ্রুত ঢুকে পড়েছে এবং বন্যার পানির উচ্চতা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে পুকুর সুরক্ষায় নেট বা বাঁশের বেড়া দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় ছিল না। দ্রুত সময়ে পুকুর প্লাবিত হওয়ায় মাছ ধরে বাজারজাত করারও সুযোগ ছিল না। প্রবল স্রোতে মুহূর্তের মধ্যে পুকুর ডুবে ও পাড় ভেঙে চাষকৃত মাছ বিল, খাল, নদীতে ভেসে যায়।
জানা গেছে, ডুবে যাওয়া জলাশয়গুলোর মধ্যে বাণিজ্যিক পুকুর–দিঘি ও ঘেরের পাশাপাশি ব্যক্তি মালিকানাধীন পুকুরও রয়েছে। জেলা মৎস্য অফিসের প্রাথমিক তালিকা অনুযায়ী, সব মিলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ঘেরের সংখ্যা ৩২০টি, যার আয়তন ১ হাজার ৩৩৫ দশমিক ৭৩ হেক্টর। পুকুর ও দিঘি আছে ১২ হাজার ২৫১টি, যার আয়তন ৪ হাজার ১০৬ দশমিক ৪৯ হেক্টর।
জানা গেছে, বন্যায় ভেসে গেছে ৩ হাজার ৭৯৭ দশমিক ৫৬ মেট্রিক টন ফিন ফিশ (রুই, কাতলা, পাঙ্গাস, তেলাপিয়া বা পাখনা, মেরুদণ্ড ও কাঁটা আছে এমন প্রজাতির মাছ) ভেসে গেছে। এছাড়া ৫৭০ দশমিক ৫০ মেট্রিক টন চিংড়ি ও ২৬৩ দশমিক ৮৩ মেট্রিক টন পোনা ভেসে গেছে। এর মধ্যে ভেসে যাওয়া মাছের মূল্য ৮৩ কোটি ৪৬ লাখ টাকা, চিংড়ির মূল্য ২০ কোটি টাকা। এছাড়া পাড় ভেঙে যাওয়াসহ অন্যান্য অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম আজাদীকে বলেন, প্রতিদিন আমরা ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করছি। আজকের (শনিবার) দিন পর্যন্ত প্রাথমিক যে রিপোর্ট তাতে ১৫ উপজেলায় মৎস্যসম্পদের ক্ষতি ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়তে পারে। উপজেলা পর্যায়ে মৎস্য কর্মকর্তারা ক্ষয়–ক্ষতির চূড়ান্ত তালিকা নিরুপণে কাজ করছে।
তিনি বলেন, বন্যা পরবর্তী সময়ে মৎস্যচাষিদের ক্ষতিপূরণে তাদের পরামর্শ ও সহযোগিতা করা হবে। সরকারি সহযোগিতা পেলে তাদের আমরা তা দিতে পারব। বন্যায় পুকুর, দিঘি ও ঘের ডুবে যাওয়া মাছ ভেসে গেছে। আবার অনেকগুলো পুকুরের পাড় ভেঙে অবকাঠামোগত ক্ষতিও হয়েছে।
ক্ষতি বেশি বাঁশখালীতে : জেলা মৎস্য অফিসের প্রাথমিক তালিকা অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বাঁশখালী উপজেলায়। এখানে ৪ হাজার ২০০টি দিঘি ও ৩১০টি ঘের ডুবে গিয়ে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫১ কোটি ৬৩ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। ক্ষতির দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চন্দনাইশ। উপজেলাটিতে ৮৩৫টি পুকুর–দিঘি বন্যার পানিতে ডুবে ক্ষতি হয়েছে ১৩ কোটি ১১ লাখ টাকা। তৃতীয় সর্বোচ্চ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা সাতকানিয়া। এই উপজেলায় ৪৬৬ হেক্টর জলাশয় প্লাবিত হয়ে ক্ষতি হয়েছে ১০ কোটি ৭৬ লাখ টাকা।
এছাড়া লোহাগাড়ায় ১,৬২০টি পুকুর–দিঘি ডুবে গেছে। এতে ক্ষয়ক্ষতির মোট পরিমাণ ৮ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। কর্ণফুলী উপজেলায় ৫৫৭টি পুকুর–দিঘি ডুবে গিয়ে ৬ কোটি ৮ লাখ টাকার মৎস্যসম্পদের ক্ষতি হয়েছে। বোয়ালখালীতে ৯২২টি পুকুর–দিঘি ডুবে গিয়ে ৫ কোটি ২ লাখ ২২ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। পটিয়ায় ১ হাজার ৪৩৫টি পুকুর–দিঘি ডুবে গেছে। এতে মোট ক্ষতির পরিমাণ ৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। হাটহাজারীতে ১৭০টি পুকুর–দিঘি প্লাবিত হয়ে ১ কোটি ৯৮ লাখ ২৭ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। রাউজান উপজেলায় ৯০টি পুকুর–দিঘি ডুবে গিয়ে মৎস্য খাতে ক্ষতি হয়েছে ৯৩ লাখ টাকা। ফটিকছড়িতে ডুবেছে ৫৩৩টি পুকুর–দিঘি, ক্ষতি হয়েছে ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা। আনোয়ারায় ১ হাজার ১০০টি পুকুর–দিঘি ও ১০টি ঘের ডুবে গিয়ে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকার মৎস্য সম্পদ নষ্ট হয়েছে।
সন্দ্বীপে ৪১২টি পুকুর–দিঘি ডুবে গিয়ে ক্ষতি হয়েছে ১ কোটি ২৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। রাঙ্গুনিয়ায় ২৭০ পুকুর–দিঘি দিঘি প্লাবিত হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ৯৮ লাখ ৭ হাজার টাকা। মীরসরাইয়ে ৯৭টি পুকুর–দিঘি ডুবে ৯৮ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া সীতাকুণ্ডে ১০টি পুকুর–দিঘি ডুবে ক্ষতি হয় ১৫ লাখ ১৪ হাজার টাকা।











