শুক্রবার রাতে ও গতকাল শনিবার সকালে ভারী বৃষ্টিতে বান্দরবানে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। জেলার সঙ্গে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ আজও স্বাভাবিক হয়নি। এদিকে তীব্র পানির তোড়ে রাঙ্গুনিয়ার শিলক খালের ওপর নির্মিত ঐতিহ্যবাহী ব্রিজঘাট বেইলি সেতুটির একটি অংশ ভেঙে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এর ফলে রাঙামাটি–বান্দরবান আন্তঃজেলা সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সাতকানিয়ায় বন্যা পরিস্থিতি কোথাও সামান্য উন্নতি আবার কোথাও অবনতি হয়েছে। উঁচু এলাকা থেকে পানি কিছুটা কমলেও বেশ কিছু এলাকায় বন্যার পানি নতুন ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে শঙ্খ নদী ও হাঙর খাল তীরবর্তী এলাকাগুলোতে পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। কেরানীহাট–বান্দরবান সড়ক ও কেরানীহাট–গুনগরি সড়ক থেকে বন্যার পানি নেমে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে। অপরদিকে বাঁশখালীর পশ্চিমাংশের অধিকাংশ এলাকার জনগণ এক চরম বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে সময় পার করছে। এখানে অনেক জায়গা থেকে এখনো পানি নামেনি। অধিকাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ নেই। পানীয় জলের সংকট তীব্র আকার ধারন করেছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এমপি গতকাল বিকালে উপজেলার বন্যাকবলিত বাহারছড়া ইউনিয়ন পরিদর্শন করেন। তিনি বন্যা দুর্গত মানুষের খোঁজখবর নেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত কিছু পরিবারের মাঝে ত্রাণ ও খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করেন। এ সময় তিনি বলেন, সরকারের তরফ থেকে যা যা সহায়তা প্রয়োজন অর্থাৎ বাড়ি ঘর পুনর্বাসন ও নতুন করে মেরামত করা প্রয়োজন সেখানে সরকার সহায়তা দেবে। যেখানে ক্ষেতের ফসলের ক্ষতি হয়েছে, গবাদি পশুর, মাছের ঘের ভেসে গেছে ক্ষতি হয়েছে সে ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার জন্য সরকার তাদের পাশে থাকবে।
এদিকে কক্সবাজারেও এখনো দুর্ভোগে রয়েছেন জেলার পাঁচ থেকে ছয় লাখ বাসিন্দা। টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে গত পাঁচদিন ধরে জেলার সব উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। এর মধ্যে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার বৃষ্টি কম হলেও শনিবার আবার বাড়লে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সব উপজেলা প্লাবিত হলেও চকরিয়া, পেকুয়া, রামু ও ঈদগাওয়ের পরিস্থিতি বেশ ভয়াবহ। এই তিন উপজেলায় মানবিক বিপর্যয়ের মতো পরিস্থিতি হয়েছে। বাড়িঘর ছাড়াও বিভিন্ন সড়ক–মহাসড়কের নিচু এলাকায় কোমরসমান পানি দেখা দিয়েছে। সব মিলে জেলার ৫–৬ লাখ মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন জনপ্রতিনিধিরা। সব মিলিয়ে দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ এলাকায় কোথাও কোথাও বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। আবার কোথাও অবনতি হয়েছে। কোথাও মানুষ টানা কয়েকদিন ধরে ঘরবন্দি। কোথাও সড়ক পানির নিচে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। স্বাভাবিক জীবনে ফেরার অপেক্ষা যেন দীর্ঘই হচ্ছে।
রাঙ্গুনিয়া প্রতিনিধি জানান, গতকাল শনিবার ভোর ৪টার দিকে শুরু হওয়া ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে ব্রিজঘাট বেইলি সেতুটির একটি অংশ ভেঙে যায়। সেতু ভেঙে যাওয়ায় শনিবার সকাল থেকে এই সড়কে সব ধরনের যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। সড়কের দুপাশে আটকা থাকতে দেখা গেছে বহু দূরপাল্লার যানবাহন ও সাধারণ যাত্রী।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পানির অস্বাভাবিক চাপের কারণে দুধপুকুরিয়া এলাকার রাবার ড্যামের বেড়িবাঁধটিও ভেঙে যায়। মুহূর্তের মধ্যে ঢলের পানি পদুয়া ইউনিয়নের দুধপুকুরিয়া, নাপিতপুকুরিয়া, ফলাহারিয়া, পূর্ব কুরুশিয়া ফকিরটিলা, সাড়াশিয়া, সাপলেজা, নারিশ্চা এবং জমাদার টিলা হিন্দুপাড়াসহ পার্শ্ববর্তী বেশ কয়েকটি গ্রামে প্রবেশ করে। আকস্মিক বন্যায় তলিয়ে যায় শত শত ঘরবাড়ি। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিকাল নাগাদ প্লাবিত এলাকাগুলো থেকে বন্যা ও ঢলের পানি নামতে শুরু করলেও রেখে গেছে ধ্বংসযজ্ঞ। হঠাৎ আসা এই পাহাড়ি ঢলে স্থানীয়দের ঘরবাড়ি, ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া ভেসে গেছে বহু চাষীর পুকুরের মাছ, এতে চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
বান্দরবান প্রতিনিধি জানান, গত রোববার থেকে টানা বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় জেলার সাতটি উপজলায় বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এলাকাগুলোতে লক্ষাধিক মানুষ পানি বন্দি হয়ে পড়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সাইক্লোন সেন্টারে ২২০টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হলেও দুর্গতরা আশপাশের বিভিন্ন ভবন ও স্থাপনায় আশ্রয় নিয়েছে। এদিকে অব্যাহত বর্ষণে বান্দরবানে সাঙ্গু ও মাতামুহুরি দুটি নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদী তীরবর্তী কয়েক শতাধিক ঘরবাড়ি পানিতে ডুবে গেছে।
বাঁশখালী প্রতিনিধি জানান, উপজেলার কয়েক হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত বা ধসে গেছে। প্রায় লক্ষাধিক পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছে। কৃষির সবজি ও ফসলী জমি, মাছের প্রজেক্ট ও পোলট্রি খামার ধ্বংস হয়েছে। সাতকানিয়া প্রতিনিধি জানান, সাতকানিয়ায় বন্যা পরিস্থিতি কোথাও সামান্য উন্নতি আবার কোথাও অবনতি হয়েছে। উঁচু এলাকা থেকে পানি কিছুটা কমলেও বেশ কিছু এলাকায় বন্যার পানি নতুন ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে সাঙ্গুনদী ও হাঙরখাল তীরবর্তী এলাকাগুলোতে পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। কেরানীহাট–বান্দরবান সড়ক ও কেরানীহাট–গুনগরি সড়ক থেকে বন্যার পানি নেমে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে সাঙ্গুনদীতে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। কোনো কোনো এলাকায় সাঙ্গুনদীর পাড় উপড়ে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করেছে।
কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, টেকনাফ–কক্সবাজার মহাসড়কে কোমরসমান পানি প্রবাহিত হচ্ছে। বাস ও উচু গাড়িগুলো চলাচল করতে পারলেও ছোট যানবাহন চলাচল এক প্রকার বন্ধ রয়েছে। এতে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন স্থানীয়রা।
জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান বলেন, ‘জেলার ৬৪০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা রয়েছে। শনিবার পেকুয়া ও চকরিয়ায় আমি সশরীরে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ত্রাণসহ নানা সহায়তা দিয়েছি। সব এলাকায় আজকালের মধ্যে পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেয়া হবে।‘












