আমেরিকার ইরান যুদ্ধে অপমানজনক পরাজয়কে মূলত নৈতিক, অর্থনৈতিক, ভূ–রাজনৈতিক এবং সামরিক এই চারটি পর্যায়ে ভাগ করে আলোচনার কথা আমি গত সংখ্যার লেখায় উল্লেখ করেছিলাম। সেই সূত্রে আজকের এই আলোচনা।
নৈতিক পরাজয়। আর্ন্তজাতিক সমস্ত আইন কানুন রীতিনীতির তোয়াক্কা না করে আমেরিকা ইরান আক্রমন করে। প্রায় ১৪ (চৌদ্দ) হাজার সামরিক বেসামরিক স্থাপনায় আক্রমণ পরিচালনা যার মধ্যে স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পানি শোধানাগারও রয়েছে। যুদ্ধের শুরুতে আমেরিকান টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ১৬৫ জন স্কুল ছাত্রীর মৃত্যু আমেরিকার জন্য পৃথিবীর সচেতন মানুষের পক্ষ থেকে এক চরম নৈতিক পরাজয় বয়ে আনে। যুদ্ধের প্রথম প্রহরে আমেরিকা–ইসরাইলের আক্রমণে ইরানের র্স্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লা খামেনী নিহত হন। যুদ্ধ বিরতি এবং যুদ্ধ বন্ধের সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর খামেনির জানাযা এবং দাফনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কর্মসূচী অনুযায়ী ৩ জুলাই শক্রবার ২০২৬ থেকে ৭ দিনের শোক প্রকাশ, জানাজা এবং দাফনের কর্মসূচি শুরু হয়। ইতিমধ্যে পৃথিবীর শতাধিক দেশ থেকে রাষ্ট্র, সরকার প্রধান এবং বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধিরা শোক প্রকাশ এবং জানাজায় অংশ নিতে তেহরানে হাজির হয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে খামেনির জানাজায় প্রায় ৩ কোটি শোর্কাত মানুষ সমবেত হবেন। শোক প্রকাশ শেষে আয়াতুল্লা খামেনীকে তার জন্ম স্থান মাশহাদে দাফন করা হবে। এ যদি হয় তবে এটি হবে মানব ইতিহাসে বৃহত্তম শোক সমাবেশ। এ সমাবেশ আমেরিকার জন্য এক লজ্জাজনক মাইল ফলক হয়ে থাকবে। এ বিষয়টি আরো পরিষ্কার হয় যখন জর্জিয়ার সিনেটর জন ওসফ উচ্চারণ করেন, ইরান যুদ্ধে জড়িয়ে আমাদের প্রেসিডেন্ট আমাদের জন্য ‘গ্লোবাল হিউমিলিয়েশান’ তথা পৃথিবীর যাবতীয় অপমান বয়ে এনেছেন। এখানেই আমেরিকার সত্যিকারের নৈতিক পরাজয়। নৈতিকতার এমন ধূসর এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে ২৫০ বছর বয়সী আমেরিকার সামনে এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, আমেরিকা কি শ্বেতাঙ্গ নির্ভর বিভক্ত, বিশ্বব্যাপী আগ্রাসী অভিধায় অভিষিক্ত হতে থাকবে? নাকি একটি উন্মুক্ত, বহুজাতিক বিশ্বব্যাপী কল্যাণমুখী রাষ্ট্র হিসাবে নিজেকে তুলে ধরবে। এখন এটি নির্ভর করবে আমেরিকার ভবিষ্যৎ মননশীল মানুষদের উপর।
ভূ–রাজনৈতিক। বাধ্য হয়ে রাশিয়ায় জ্বালানী রপ্তানীর উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধে স্বক্ষমতা বাড়িয়েছে বহুগুণ। এটি ভূ–রাজনীতিতে আমেরিকার কৌশল প্রণেতাদের মারাত্মক এক ভুল হিসাবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। চাইনীজ প্রেসিডেন্ট দূর থেকে বসে নেপোলিয়নের একটি উচ্চারিত বক্তব্যের পুনাবৃত্তি করেছেন ‘Never interrupt your eneymy when he is making a mistake’ তোমার শক্র যখন ভুল করতে থাকবে তখন সেখানে তুমি নাক গলাবে না। এই একই কথা বিশ্বখ্যাত চাইনীজ সমরবিদ শান ঝু তার বিখ্যাত বই ‘The Art of War’–এও উল্লেখ করেছেন। চীন ইরান যুদ্ধে আমেরিকার ভুল পদক্ষেপে নাক না গলালেও ওয়াকিফহালদের মতে নিজের নব আবিষ্কৃত যুদ্ধাস্ত্রের পরীক্ষা এই সুযোগে ইরান যুদ্ধে সফলভাবে সম্পন্ন করে নিয়েছে। এটিও আমেরিকার জন্য ভূ–রাজনীতিতে পরাজয়ের গ্লানি হয়ে থাকবে।
মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার অযাচিত সামরিক হস্তক্ষেপ এবং ধ্বংসযজ্ঞ চীনের বিরুদ্ধে উইগুর মুসলমানদের উপর নিপীড়নমূলক আচরণ এবং চীনাদের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ ইত্যাদি প্রচারে আমেরিকানদের এ যাবতের অবস্থানকে একেবারে ধূলায় মিশিয়েছে। সিঙ্গাপুরিয়ান বিশিষ্ট কূটনীতিক কিশোর মাহবুবানীর ভাষায় ‘West do not like Muslim but they like Chinese Muslims due to the political reasons’ ‘পশ্চিমারা মুসলমানদের ভালোবাসে না তবে রাজনৈতিক কারণে চীনের মুসলমানদের ভালোবাসে’। মাহবুবানী আরো উল্লেখ করেছেন ‘Every war USA fight in Middle East is a gift to China’ ‘আমেরিকার মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি যুদ্ধই চীনের জন্য একেকটি উপহার’। কারণ প্রতি যুদ্ধই সাধারণ মানুষের কাছে আমেরিকাকে একটি আধিপত্যবাদী শক্তি হিসাবে উপস্থাপন করে যাচ্ছে, এটি আমেরিকার জন্য ভূ–রাজনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব বয়ে আনছে ক্রমাগত।
অন্যদিকে চীনাদের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ এটিও এখন ধোপে টিকছে না কারণ এক হিসাবে দেখা গেছে প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি ৩০ লক্ষ চাইনীজ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ সফর করে নিজ দেশে ফিরে আসে। এখন কথা হল তারা যদি স্বদেশে কোন প্রতিকূলতায় বাস করত তা হলে তাদের ত আর ফিরে আসার কথা নয়।
এমন একটি দুর্বল প্রেক্ষাপটকে ধারণ করে সম্প্রতি আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্প চীন সফর করেছেন। বলাবাহুল্য এতে আমেরিকানরা কোন ‘আপার হ্যান্ড’ নিয়ে আলোচনায় বসতে পারেননি। এটাও আমেরিকার জন্য ভূ–রাজনীতিতে এক ধরনের পরাজয়। সবচেয়ে বড় এবং উল্লেখযোগ্য বিষয় হল আমেরিকা এ যাবত বিশ্বে যে একক প্রতাপের সাথে ইউনিপোলার ওয়ার্ল্ডের পরাশক্তি হিসাবে বিরাজিত ছিল তার অবসান ঘটেছে। এখন ভূ–রাজনীতিতে আমেরিকা নতুন এক মাল্টি পোলার তথা বহুমুখী বিশ্বের মুখামুখি। বাস্তবতা হল আমেরিকা তার বিশ্বে একচ্ছত্র আধিপত্যের যে অবস্থান ছিল তা নিশ্চিতভাবে হারিয়েছে।
সামরিক। যুদ্ধের শুরুতে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্প ইরানের সমস্ত বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পানি শোধনাগার, যোগাযোগের সেতু সমূহ ধ্বংস করার হুমকি দেয় এমনকি ইরানী সভ্যতাকে দুনিয়া থেকে বিনাশ করার হুমকিও দেওয়া হয়। এই লক্ষ্যে আমেরিকা–ইসরাইল ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় ব্যাপক হামলা চালিয়ে রাজনৈতিক এবং সামরিক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের হত্যা করলেও ইরান তড়িৎ তাদেও শূন্যস্থান পূরণ করে পাল্টা আঘাত হানতে সক্ষমতার পরিচয় দেয়।
ইরান তাদের উপর চাপানো যুদ্ধকে ক্রমান্বয়ে নিজেদের সীমানা থেকে আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ দেয়। ইরানী হাইপার আর সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র সমূহ নিখুঁতভাবে নিঁখুত নিশানা আমেরিকার মধ্যপ্রাচ্যের নানা দেশে স্থাপিত ঘাঁটি সমূহে আঘাত হেনে প্রায় সবগুলিকে ধ্বংস করতে সক্ষম হয়। এর মাঝে উল্লেখযোগ্য কুয়েতের ক্যাম্প বুয়েরিং, ক্যাম্প আরিফজান, সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটি, কাতারের আল উবেয়েদ বিমান ঘাঁটি, জর্দানের মোয়াদেক সল্ট লেক বিমান ঘাঁটি, বাহরাইন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ঘাঁটি সমূহ ইরানী আক্রমণের হাত থেকে রেহাই পায়নি।
ইরান বিশ্বকে হতবাক করে দুর্ভেদ্য বলে কথিত আয়রন ডোম, ডেভিড স্লিং, এ্যারো ১ এবং এ্যারো ২ এর নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় থাকা ইসরাইল ইরানী ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত থেকে নিস্তার পায়নি। বিশেষজ্ঞদের অভিমত ইরানী ব্যালেস্টিক মিসাইল এবং ড্রোন সমূহের এই অভাবনীয় সাফল্যের পিছনে রয়েছে ২০২৪ সালে এক অভাবনীয় গোপনীয়তায় ইরানের চীন থেকে টি ই ই ০১ বি স্যাটেলাইট সিস্টেম সংগ্রহ এবং এর সাফল্যজনক ব্যবহার। যুদ্ধের শুরুতে ইরান কার্যকরভাবে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়। যুদ্ধ বিরতির পরও ইরান এ অবরোধ বজায় রাখতে সামরিকভাবে সক্ষমতার পরিচয় দেয়। এর মধ্যে অপ্রতিরোধ্য হিসাবে বিবেচিত আমেরিকান যুদ্ধ বিমান এফ ১৫, এফ ৩৫ এবং এ্যাপাচে হেলিকপ্টার ইরানের হাতে ভূ–পাতিত হয়। এ যুদ্ধে মনস্ত্তাত্ত্বিক জয় ইরানেরই কারণ ইরানীরা জেনেছে তারা তাদের অস্তিত্বের জন্য লড়ে যাচ্ছে, কিন্ত্তু আমেরিকানরা দিন যেতে জেনে গেছে তারা তাদের দেশের স্বার্থে লড়ছে না বরং ইসরাইলের জন্য যুদ্ধ করছে। ইরান যুদ্ধে আমেরিকার নেতৃত্বে গঠিত সামরিক বলয় ন্যাটোকে তার পাশে না পাওয়াও সামরিক বিবেচনায় আমেরিকার জন্য এক চরম নেতিবাচক বার্তা। এসব কোনটিই আমেরিকার জন্য জয়ের ইতিবাচক কোন বার্তা যেমন বয়ে নেয়নি বরং পরাজয়ের গ্লানিই নিঃশ্চতভাবে ললাটে লেপন করেছে।
আমেরিকার জন্য ইরান যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন সমীকরণ উপস্থিত করেছে। এ যাবত মধ্যপ্রাচ্যের আমেরিকার তাবেদার রাষ্ট্রগুলি তাদের নিরাপত্তার জন্য সম্পূর্ণভাবে আমেরিকামুখী ছিল এবং তাদের আস্থা ছিল আমেরিকা তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সম্পূর্নভাবে সক্ষম। কিন্ত্তু ইরান যুদ্ধ আমেরিকার প্রতি তাদের সে আস্থাকে আমূল পরিবর্তন করে দিয়েছে। এখন আমেরিকার উপর তাদের আগের সে আস্থা নেই।
অর্থনৈতিক। ইরান যুদ্ধ আমেরিকার অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। জ্বালানী তেলের দাম, পুঁজি বাজারে অস্থিতিশীলত সৃষ্টি, ভোগ্য পণ্যের বাজারে মূল্যের ঊর্ধ্বগতি, মূল্যস্ফীতির উল্লস্কন ইত্যাদি যেমন আমেরিকান সাধারণ জনগণকে যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে উৎসাতি করেছে তেমনি পৃথিবীর নানা প্রান্তের নানা দেশের মানুষকে যুদ্ধ বিরোধী প্রবল মনেভাব প্রকাশে অসংকোচ করে।
যুদ্ধে আমেরিকার লাগামহীন অর্থনৈতিক অবরোধ বুমেরাং হয়ে দেখা দেয়। রাশিয়া, চীন, ভারত এবং ইরান পেট্রোডলার বাদ দিয়ে চাইনীজ ইউয়ান এবং রাশিয়ান রুবলের মাধ্যমে তাদের অর্থনৈতিক লেনদেন শুরু করে। এটি আমেরিকার জন্য এক মহা বিপদ সংকেত। এ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে আমেরিকার ডলারের বিশ্ব–ব্যাপী প্রতিপত্তিকে কোণঠাসা করবে নিশ্চিতভাবে, যা আমেরিকার অর্থনীতিকে দুর্বল করবে পরিনামে তা আমেরিকার সামরিক সক্ষমতাকেও দুর্বল করবে।
হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হয়ে পড়ার কারণে বিশ্বের জ্বালানী সরবরাহে ব্যাপক প্রভাব পড়ে। জ্বালানী সংকটের কারণে সার উৎপাদনে দেশে দেশে ঘাটতি দেখা দেয় ফলে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হয়, পরিনামে খাদ্যাভাবের মুখে পড়ে পৃথিবীর অনেক দেশ। এসব কিছু আমেরিকান যুদ্ধ নীতির পরাজয়ের স্বাক্ষরই বহন করে। (চলবে)
লেখক: প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব,
সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক।












