গুরু, আজ আপনাকে ‘তুমি’ সম্বোধন করলাম। মনে পড়ে অধ্যাপক নুরুল মোমেনের ‘আপনি ও তুমি’ প্রবন্ধের কথা। এই প্রবন্ধে তিনি এই দুই সম্বোধনের মধ্যবর্তী মানের একটি সম্বোধন এর সন্ধান বা চিন্তা করেছিলেন। আমিও আজ আপনার মতো মানবতাবাদী গুরুকে সম্মানবোধক সম্বোধনের জন্য প্রচলিত তুই, তুমি, আপনি এর চাইতেও উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন একটি সম্বোধন শব্দের সন্ধান করে ব্যর্থ হলাম। তাই সরাসরি মনের টানে ‘তুমি’ সম্বোধনের আশ্রয় নিলাম।
২৮ মে ১৯৯৪ তোমার মৃত্যুর পরপর ১৪ জুন ১৯৯৪ স্মরণ সভায় বাঁশখালী ডিগ্রি কলেজ মাঠে শ্রদ্ধেয় বদরুদ্দীন উমর বলেছিলেন, “দেশে বুদ্ধিজীবী নামক একটি শ্রেণির নাম প্রচলিত আছে। আমাদেরকেও মানুষ বুদ্ধিজীবী বলে। কিন্তু আক্ষরিক অর্থে বুদ্ধিজীবী বলতে যা বুঝানো হয় সেই অর্থে অধ্যাপক আসহাব উদ্দিন আহমদই প্রকৃত বুদ্ধিজীবী।’ বদরুদ্দীন উমরের কথিত সেই বুদ্ধিজীবীর পরিচয় তুলে ধরার জন্য তোমার নিজের ভাষা ও বর্ণনাটিই সংবাদ মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করছি – “১৯৫২ সালের অক্টোবরে তৎকালীন পূর্ববঙ্গ বেসরকারি শিক্ষক সমিতির তরফ থেকে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে একটি শিক্ষক শুভেচ্ছা মিশন পাঠানো হয়। সীমান্ত প্রদেশ সফরের সময় আমরা সোয়াতেও যাই। সোয়াত তখন একটি দেশীয় রাজ্য। আয়ুব খানের বেয়াই জাহাজীব আবদুল হক ছিলেন এর শাসক। সোয়াতের রাজধানী সায়দু শরীফের সরকারি অতিথি ভবনে আমাদের রাখা হয়। যেদিন বিকেলে আমরা ওখানে পৌঁছি তার পরের দিন প্রাতঃরাশের সময় ন্বাগতিক আবদুল হক ছাড়াও দু’সারি অতিথির সমাবেশ হয়েছিল। এক সারি আমরা গুডউইল সাহেবরা (টিচার্স গুডউইল মিশন সদস্যরা), অপর সারিতে বসেছিলেন আয়ুব খান এবং কেন্দ্রিয় সরকারের কয়েকজন সামরিক ও বেসামরিক বড়কর্তা। আয়ুব খান তখন পাকিস্তানের প্রধান সেনাপতি। এক সারিতে শেষ চেয়ারে বসেছিলেন আয়ুব খান আর এক সারিতে সর্বশেষ আমি। আয়ুব খান আর আমি পরস্পর মুখোমুখি। ঘটনাচক্রের অপ্রত্যাশিতভাবে এই মুখোমুখি হওয়াটা আমার কাছে এক ঐতিহাসিক ব্যাপার হয়ে আছে। সত্যই তা ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ কিনা। পাঠক পাঠিকারা বিচার করুন এবং রায় দিন। পাঠকদের রায় এক ধরনের গনআদালতের মতো। আমি অতিরঞ্জন পছন্দ করি না। অতিরঞ্জন আসলে হালকামি ও মানসিক অব্যবস্থারই লক্ষণ। যদি ঘটনাচক্রে আয়ুব খান আর আমি মুখোমুখি না হতাম তাহলে যা আজ লিখছি তা কখনো লেখা হতো না।”
“এই প্রাত:রাশে একরাশ দশ–বারো রকমের খাবার পরিবেশন করা হয়। প্রত্যেকটি আইটেম ছিল সুস্বাদু। সবগুলোর নামও জানি না। আমার বাপ দাদা চৌদ্দ পুরুষ কারো গালে লাগেনি এমন কতক খাবারও সেখানে ছিল। কবি ড্রাইডেনের ভাষায় মনে মনে বললাম, Here is God’s plenty. অবশ্য গুটিকের এই প্রাচুর্য কোটিকের দারিদ্র্য প্রসূত। সোয়াতে জমি উর্বরা হলে কৃষক পায় এক পঞ্চমাংশ, অনুর্বরা হলে প্রায় এক তৃতীয়াংশ। এই শোষণ সোয়াতের শতকরা পাঁচজনকে মোটাতাজা করছে। আর পঁচানব্বইজনকে জোরে দারিদ্র সীমার নীচে নিক্ষেপ করে পচাচ্ছে।
“প্রাতঃরাশ শেষ হলো। আয়ুব খান টেবিল কারচিফ দিয়ে তাঁর প্রজাপতি মার্কা মোছ মুছে নিলেন। চেয়ারে একটু খানি চেপে বসলেন। হায়রে হায় ! এরপর তিনি আমাদের দিকে এমন গুলি ছোঁড়া (তাঁর বুলি আমার কাছে গুলি) শুরু করলেন যে আমার মন ঝাঁঝরা হয়ে গেলো। নীচে তার কথাগুলোর আবয়ব লিখে দিচ্ছি। আমার মনের পটে কথাগুলো খোদাই হয়ে আছে। আমার সাথে কবরে যাবে।
“What is your east Bengal? So much of water (floods), so much of population, so much of student’s trouble. I think the Dacca University should be near Tongi. All right, if you don’t like to live with us go to the Baboos. The Baboos will show you.”
“তোমাদের পূর্ব বঙ্গের হলো কি? এতো জল (বন্যা), এতো জনসংখ্যা, এতো ছাত্র গোলযোগ (ভাষা আন্দোলন)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় টঙ্গীর কাছাকছি কোথাও হলে ভালো হয়। বেশতো, আমাদের সাথে থাকতে না চাইলে বাবুদের কাছে যাও (ভারতের সাথে যুক্ত হও) বাবুরা মজা দেখিয়ে ছাড়বে।”
“সন্ধ্যার অন্ধকারে ভুতে চাপড় মারলে যে অবস্থা হয় আমারও সে অবস্থা হলো। মিনিট খানেকের জন্য আমি বিমূঢ় হয়ে পড়ি। আমার গুলিবিদ্ধ অবস্থা। কি পাশবিক, কি বর্বর অপ্রত্যাশিত আক্রমণ। কি অসভ্য, অমার্জিত উচ্চারণ। এ কোন বেজন্মার পাল্লায় পড়লাম। আমার মন থেকে রক্ত ঝরছিল।”
“তাড়াতাড়ি সম্বিৎ ফিরে পেলাম বা ফিরিয়ে আনলাম। নিজের সম্মান, আমাদের ভাষার দাবির সম্মান–মর্যাদা আমাকে রক্ষা করতেই হবে। ওখানেতো লাথি মার্কা কথা শুনতে যাই নাই, বরং পারলে দুটো সঠিক কথা শুনিয়ে দিতে গেছি। তা না হলে ভাষা আন্দোলনের ধাক্কা খাওয়া পারস্পরিক শুভেচ্ছার নড়বড়ে ভিত্তির মেরামত হয় কি করে। তাদের হাতে কিছু ভাড়াটে বাঙালি ছিল। আমি তো সেই দালালদের তালিকাভুক্ত নই। আমি ‘দালাল হালাল করো’ শ্লোগান দেয়া মানুষ। মনের ঘর হাতড়িয়ে আমি ধারাল যুক্তির একটা অদৃশ্য সেভেনঅ ক্লক ব্লেড বের করে ধীরস্থিরভাবে তার বক্তব্যকে কেটে টুকরো টুকরো করতে বদ্ধপরিকর হলাম। ভদ্রভাবে বললাম, You see, the election of 1946 were fought on the issue of Pakistan. And the 97 p.c Bengali Muslims cast their votes in favour of Pakistan. That’s how Pakistan was achieved. At that time in the Punjab the Unionist Ministry Khijir Hayat Khan was opposing Muslim League and Pakistan. Very few Punjab Muslims voted for Pakistan. Frontier was totally under the influences of Gandhi through his disciple, Gaffer khan nick named Frontier Gandhi, Sind with G.M. Syed was on enigma. So, Pakistan is practically the creation of Bengal Muslims. Most Bengal Muslims peasants can read the Holly Quran. When it is time for prayer they stop their plough and say their prayer in the fields. Indeed, they are very good Musalmans.”
“দেখুন, ১৯৪৬ সালে পাকিস্তান ইস্যুতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। শতকরা ৯৭ জন বাঙ্গালী মুসলমান পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দিয়েছিল। এর ফলে পাকিস্তান হাসিল হয়। সে সময় সীমান্ত প্রদেশ গান্ধীর শিষ্য সীমান্ত গান্ধী গাফ্ফার খানের কুক্ষিগত ছিল। মুসলিম লীগ সেখানে দাঁত ফুটাতে পারে নাই। আর পাঞ্জাবে তখন খিজির হায়াত খানের পাকিস্তান বিরোধী ইউনিয়নিষ্ট মন্ত্রীসভা ক্ষমতাসীন ছিল। মুসলিম লীগের ভোটের বাক্স খালি এসে খালি ফিরে যায়। সিন্ধুর নেতা জি. এম সৈয়দ ছিল মুসলিম লীগের জন্য অনির্ভরযোগ্য ধাঁধা। কাজেই পাকিস্তান কার্যত বাঙ্গালী মুসলমানদের সৃষ্টি। সেখানে যাদের আমরা নিরক্ষর বলি তারাও শুদ্ধভাবে পবিত্র কোরআন পড়তে পারে। নামাজের সময় হলে হাল চাষের কাজ স্থগিত রেখে আলের উপর নামাজ আদায় করে। তাঁরা খাটি মুসলমান। (একথা বলার কারণ হলো, পাকিস্তান কায়েম হওয়ার পূর্ব মুহূর্ত থেকে কেন্দ্রিয় শোষক শাসকগোষ্ঠী আমাদের ন্যায্য দাবি দাওয়া নস্যাৎ করার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানে জোর প্রচার চালাতো যে, আমরা ‘ভেজাল’ মুসলমান, অর্থাৎ পাকাপোক্ত মুসলমান নই। আর তারাই খাটি নির্ভেজাল মুসলমান।)”
“আমার প্রত্যেকটি বাক্য শেষ হওয়ার সাথে সাথে আযুব খান বলতে লাগলেন ‘অবকোর্স’। তাঁর বেয়াই বাড়ির বার কোর্স খাওয়ার পর তিনি বারটি ‘অবকোর্স’–এর ঢেকুর তোললেন। আমার কথাগুলো তাঁর কানের ভিতর দিয়ে মরমে পশার সাথে সাথে তাঁকে কেমন যেন রণক্লান্ত মনে হলো।”
“আমাদের সম্পর্কে খারাপ মনোভাব আয়ুবের একার নয়, গোটা পশ্চিম পাকিস্তানী কেন্দ্রীয় সামন্তমুৎসুদ্ধি শাসকগোষ্ঠীরও তাই ছিল। আয়ুবের কথায় আমার মন ভাঙ্গে। আয়ুব গোষ্ঠীর এই মনোভঙ্গীতে শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান ভাঙে। আযুবের কথা থেকে দু’টো কথা সুস্পষ্ট হয়ে উঠে। এক–এই সামন্তমুৎসুদ্দীদের গনতন্ত্রমনা বাঙ্গালীদের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব ছিল। দুই–আমরা যখন বিচ্ছিন্ন হওয়ার কথা স্বপ্নেও ভাবিনি তখনই তারা ধরে নিয়েছিল যে, আমাদের ন্যায্য দাবীর সংগ্রাম বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগ্রাম। প্রতিক্রিয়ার শক্তি সব সময় অন্ধ হয়। আযুব পয়গম্বরী নাম। আয়ুবের কথাই সত্যি হলো। ১৯৭১ সালে দেখা গেল আমরা তাদের সাথে সম্পর্ক রাখতে চাই না। আমরা আয়ুব কথিত বাবুদের কাছে গেলাম। বাবুরা তাদের (আয়ুবদের) বাম্বু চালালো। পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ হলো। সে বাম্বু খোলার জন্য ভুট্টোকে সিমলা গিয়ে ইন্দিরাকে ‘আপা বাঁচান’ ‘আপা বাঁচান’ করতে হলো।
“এক কথায় অবৈজ্ঞানিক হলেও বাঙালি মুসলমানরাই মূলত পাকিস্তানের সৃষ্টিকর্তা আর অবাঙ্গালী পশ্চিম পাকিস্তানি কেন্দ্রীয় শাসকরা পাকিস্তানের ধ্বংশকর্তা। গুডউইল মিশন উপলব্ধি করলো ওখানে এখানকার জন্য ইল উইল (অশুভ ইচ্ছা) ছাড়া কিছুই নেই।” দু’টি মন্তব্য জানিয়ে তোমার চুম্বক পরিচিতি এখানে শেষ করছি – বাংলা সাহিত্যের পুরোধাব্যক্তি পশ্চিমবঙ্গের নারায়ণ চৌধুরী লিখেছেন “বাংলা সাহিত্যে অনেকে সেক্সপিয়রীয় পান ব্যবহারের চেষ্টা বা চর্চা করেছেন, তাদের মধ্যে অধ্যাপক আসহাব উদ্দিনই সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছেন। সাবেক উপাচার্য প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ড. আবদুল করিম লিখেছেন – “অধ্যাপক আসহাব উদ্দিন আহমদ ছিলেন একজন প্রকৃত ক্যালিভার। আসহাব উদ্দিনরা গণ্ডায় গণ্ডায় জন্মায় না। এক আসহাব উদ্দিন প্রয়াত হয়েছেন, প্রজন্ম আরেক আসহাব উদ্দিনের আবির্ভাবের অপেক্ষায় থাকবে।”
সূত্র : “গণমানুষের সাথী কমরেড আসহাব উদ্দিন” – ইয়াকুব আলী মোল্লা। প্রকাশক – আসহাব উদ্দিন স্মৃতি সংসদ।
লেখক : প্রাবন্ধিক, শিক্ষা–সংগঠক; অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, বাঁশখালী উপকূলীয় কলেজ।











