ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি বর্তমানে এক গভীর রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে দিয়ে চলেছে। একদিকে দলের নেতৃত্বকে ঘিরে অভ্যন্তরীণ সংকট, অন্যদিকে দলের ক্ষমতায় টিকে থাকার সংকট। দিন যত এগুচ্ছে দলের ভেতর সংকট তত ঘনীভূত হচ্ছে। সপ্তাহ কয়েক আগে অনুষ্ঠিত স্থানীয় নির্বাচনে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির স্মরণকালের ভরাডুবি হলে দলীয় প্রধান, স্যার কিয়ের স্টরমার তোপের মুখে পড়েন। দলের এই ব্যর্থতার জন্যে তাকে এককভাবে দায়ী করেন দলীয় নেতাদের বৃহৎ একটি অংশ। দলীয় ৯৫ এমপি তার পদত্যাগ দাবি করে দলের হাল ধরার জন্যে নতুন নেতৃত্বের প্রয়োজন বলে মতামত দেন। সমপ্রতি অনুষ্ঠিত স্থানীয় নির্বাচনের যে ফলাফল তা কেবল লেবার পার্টির জন্যে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে তা নয়, সমানভাবে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিরোধী দল টোরি পার্টি সহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলির জন্যেও, তথা গণতন্ত্রের জন্য। কেননা স্থানীয় নির্বাচনে সবাইকে হতবাক করে দেখা গেল কট্টর ডানপন্থী নেতা নাইজেল ফারাজের দল, রিফর্ম ইউ কে ভূমিধস বিজয় অর্জন করে। চরম ডানপন্থী এই দলের বিশাল বিজয়ে নাড়াচাড়া দিয়ে উঠে লেবার পার্টি সহ গণতন্ত্রকামী সকল রাজনৈতিক দলগুলি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রিফর্ম ইউকে–র উত্থানে ব্রিটেনের গণতান্ত্রিক যে ধারা তার জন্যে অশনি সংকেত, পাশাপাশি ‘গণতন্ত্রের সূতিকাগার‘ হিসাবে পরিচিত ব্রিটেনের মুক্ত গণতন্ত্র হুমকির মুখে।
কিসের এই অশনি সংকেত? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আমাদের ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলিতে সামপ্রতিক সময়ে রাজনৈতিক ঘটনাবলী দেখা প্রয়োজন। হল্যান্ড সহ গোটা ইউরোপে এখন ইমিগ্রেন্ট বা অভিবাসী–বিরোধী ঢেউ বইছে। পোল্যান্ড, পর্তুগাল এবং রোমানিয়ার সামপ্রতিক নির্বাচনে অতি–উগ্রপন্থী, জাতীয়তাবাদী এবং অতি–ডানপন্থী আন্দোলনের ক্রমবর্ধমান জয়প্রিয়তা ও প্রভাব দেখা দেয়। তাদের প্রথম টার্গেট বিদেশী নাগরিক– সমুদ্রের স্রোতের মত ইউরোপের দিকে ধেয়ে আসা এই সমস্ত জনগোষ্ঠীকে, যা ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষায় ‘এলিয়েন‘ তাদের ঠেকানো এবং যারা বর্তমানে আশ্রয়ের লক্ষ্যে অবস্থান করছে তাদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে হবে। উত্তর পাড়ের যে দেশটির একসময় ‘টলারন্ট‘ হিসাবে বেশ সুনাম ছিল সেই হল্যান্ডেও এখন এন্টি–ইমিগ্রেন্ট এবং বিদেশী–ঠেকাও মনোভাব তুঙ্গে। ফি–বছর হল্যান্ড সহ বিভিন্ন পশ্চিম ইউরোপীয় দেশে অনুন্নত দেশগুলি থেকে হাজার হাজার শরণার্থী দালালের হাত ধরে, চোরা পথে, সমুদ্র পেরিয়ে আসে। এখানে আসার পর তাদের বিভিন্ন শহরে বিশেষ আশ্রয় কেন্দ্রে রাখা হয়। এর মধ্যে তাদের আশ্রয়ের আবেদনের প্রসেস চলে। দিন কয়েক আগে হল্যান্ডের একটি শহরে এমন এক রিফুজি–সেন্টার ডানপন্থী মতবাদের সমর্থকগোষ্ঠী আক্রমণ করে, তাতে আগুন লাগিয়ে দেয়। যদিও বা তাতে শরণার্থীদের কেউ হতাহত হয়নি, কিন্তু তাদের মধ্যে আতংঙ্ক দেখা দেয়। কেবল যে ওই শহরে এই ধরনের প্রতিবাদ দেখা দিয়েছে তা নয়। শরণার্থীদের জন্যে আরো কয়েকটি শহরে স্থানীয় মিউনিসিপ্যাল কর্তৃপক্ষ এই ধরণের আশ্রয় কেন্দ্র স্থাপন করতে চাইলে স্থানীয় ডাচ নাগরিকরা প্রতিবাদ জানান। তাদের মন্তব্য, এই সমস্ত কেন্দ্রে থাকা শরণার্থীরা, বিশেষ করে আফগানিস্তান, সিরিয়া থেকে আসা যুবক শ্রেণীর শরণার্থীরা স্থানীয় মেয়েদের উত্যক্ত করে, সুপারমার্কেট থেকে চুরি–চামারি করে এবং তাবৎ ‘নুইসেন্স‘ সৃষ্টি করে। তাদের এই অভিযোগ একেবারে উড়িয়ে দেবার নয়। তাদের উৎপাতে কেবল যে বিদেশী–বিরোধী রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠী ত্যক্ত বিরক্ত তা নয়, সাধারণ ডাচ নাগরিকদেরও অনেকে চাননা তাদের এলাকায় এই ধরনের ‘আশ্রয় কেন্দ্র‘ খোলা হোক। অথচ এক দশক আগে এমন পরিস্থিতি ছিলনা। গতকাল স্থানীয় এক ডাচ টিভি চ্যানেলের টক–শোতে ১৯৯৩ সালে সুদান থেকে আসা এক সুদানীজ তরুণের কথাবার্তা শুনছিলাম। উনি বর্তমানে ডাচ পার্লামেন্টের এমপি। শরণার্থী শিবিরে আক্রমণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমার এখনো মনে আছে আমি যখন যুদ্ধ–পীড়িত সুদান থেকে এদেশে আসি তখন আমাদের দু–হাত বাড়িয়ে গ্রহণ করা হয়। আমাদের থাকা খাওয়া, স্বাস্থ্য, লেখাপড়ার ব্যবস্থা করা হয়। গেল সপ্তাহে যা ঘটে গেল তা সত্যি দুঃখজনক।‘
দিন যতই যাচ্ছে পরিস্থিতি ততই মন্দের দিকে এগোচ্ছে। আর এমন পরিস্থিতি কেবল হল্যান্ড নয়, গোটা ইউরোপে ঘটে চলেছে। একই দৃশ্য আমরা দেখি জার্মানি, পোল্যান্ড এবং আরো বেশ কটি ইউরোপীয় দেশে। একই চিত্র দেখা গেল চলতি সপ্তাহে (১৬ মে) লন্ডনে। ‘ইউনাইট দ্য কিংডম‘- এর উদ্যোগে আয়োজিত বিশাল বিক্ষোভ ছিল ব্রিটেনে ‘উচ্চ–হারে অভিবাসন‘ এর বিরুদ্ধে। বিক্ষোভের আয়োজন করেছিল ইসলাম–বিরোধী কর্মী, স্টিফেন ইয়াক্সলি–লেনন, যিনি টমি রবিনসন নামে পরিচিত। বিক্ষোভকারীরা লন্ডনে জড়ো হয়ে প্রধানত ব্রিটিশ ও ইংরেজ পতাকা প্রদর্শন করেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার তার আগের দিন ‘ইউনাইট দ্য কিংডম’ মার্চের আয়োজকদের বিরুদ্ধে “সরাসরি ঘৃণা ও বিভাজন ছড়ানোর” অভিযোগ করেন। সরকার ‘বিদেশী উগ্র–ডানপন্থী উস্কানিদাতা‘ হিসেবে আখ্যায়িত ১১ জনকে এই বিক্ষোভ–জনসভায় ভাষণ দেওয়ার জন্য ব্রিটেনে প্রবেশে বাধা দেয়। আতঙ্কের ব্যাপার হলো, লন্ডনের স্থানীয় নির্বাচনে এন্টি–ইমিগ্রেন্ট সেন্টিমেন্টকে ‘হাতিয়ার‘ বানিয়ে নাইজেল ফারাজ তার কট্টর ডান দল, ‘রিফর্ম ইউ কে‘-র জন্য বিশাল জয় ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হন। নাইজাল ফারাজের এই বিজয় কেবল স্থানীয় নির্বাচনের মধ্যেই সীমিত থাকলে সমস্যা ছিল না। এখন অনুমান করা হচ্ছে নাইজেল ও তার দল আজ থেকে দু–বছর বাদে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনেও অনুরূপ সফলতা অর্জন করতে পারেন। তেমনটি হলে ইংল্যান্ডে যে বহমান গণতন্ত্রের ধারা তা যে সহসা নির্বাসনে যাবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ২০২৩ সালের জুনে নাইজেল ফারাজ ‘রিফর্ম ইউ কে‘-এর নেতা হওয়ার পর থেকে দলটি বিতর্কিত বার্তা ছড়িয়ে দ্রুত পাদপ্রদীপের আলোয় চলে আসে। রিফর্ম ইউ কে–র জনসমর্থন এখন ৩৪%, যা লেবার পার্টির চেয়ে ৯% বেশি। ২০২৪ সালের নির্বাচনে লেবার পার্টির জেতা ৯০টিরও বেশি আসনে রিফর্ম দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে এবং লেবার পার্টির বর্তমান জনসমর্থন বিবেচনা করলে, মনে হচ্ছে আগামী নির্বাচনে ‘রিফর্ম’ বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করবে।
ইমিগ্রেশন–বিরোধী এই নেতা নাইজেল ফারাজ ‘ব্রেক্সিটের‘ পক্ষে লড়েছিলেন। তিনি চান ব্রিটেন থেকে মাইগ্রেন্টসদের বের করে দিতে। তার কথাবার্তা এবং আচরণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মত। পপুলিস্ট নেতা নাইজেল ফারাজকে ‘গণতন্ত্রের মূল কাঠামোর জন্যে বড় হুমকি‘ হিসাবে দেখা হয়। তিনি অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কথা বলেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রিয়ভাজন হিসাবে পরিচিত নাইজেল ফারাজের বিরুদ্ধে অন্যতম অভিযোগ, তিনি ট্রাম্পের–আমেরিকাকে যুক্তরাজ্যে নিয়ে আসতে চান।‘ জিবি নিউজের রাজনৈতিক সম্পাদক ক্রিস্টোফার হোপের সাথে এক সাক্ষাৎকারে লিবারেল ডেমোক্র্যাট নেতা, স্যার এড ডেভি বলেন, নাইজেল ফারাজ ‘আমাদের দেশ এবং আমাদের গণতন্ত্রের জন্য একটি হুমকি। লিবারেল ডেমোক্র্যাক্ট পার্টির নেতা বলেন, যারা ব্রিটিশ মূল্যবোধের প্রতি যত্নশীল তারা ট্রাম্পের আমেরিকার সহযোগী হতে চান না।‘ তিনি বলেন, নাইজেল ফারাজ যুক্তরাজ্যে ‘আমেরিকার ধাঁচের স্বাস্থ্য বীমা’ চালু করার পক্ষে কথা বলেন। রিফর্ম ইউ–কে পার্টির পরিকল্পনার সমালোচনা করে বলেন, যেখানে পাঁচ বছর পর অভিবাসীদের যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাসের যোগ্যতা অর্জন এবং নতুন ভিসার জন্য পুনরায় আবেদন করার অধিকার রয়েছে, নাইজেল ফারাজ তা বিলুপ্ত করার দাবি জানান। পাশাপাশি ভাতা–খরচ কমানোর জন্য আরও কঠোর নিয়মকানুন প্রবর্তন করার পক্ষে তিনি।
বিষয়টি লেবার দলের নেতারা উপলব্ধি করতে পেরে এখন চাইছেন কী করে দলের এই পরাজয়কে পেছনে রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়া যায় এবং দলকে শক্তিশালী করা যায়। আর সে লক্ষ্যে দলের নেতৃবৃন্দের কেউ কেউ বলছেন, ‘ব্যক্তির চাইতে দল বড়, দলের যাইতে দেশের গণতন্ত্র বড়‘। আর আমাদের দলকে বাঁচাতে, চরম ডানপন্থী দল ‘রিফর্ম ইউ কে‘-কে ঠেকাতে ব্যক্তিস্বার্থ ভুলে দলকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। আর সে কারণে প্রথমে প্রয়োজন দলের নেতৃত্ব বদলের।‘ প্রধান মন্ত্রী কিয়ের স্টারমার যদিও বা বলে আসছেন তিনি শেষ পর্যন্ত লড়ে যাবেন, কিন্তু এখন অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে তিনি টের পাচ্ছেন যে তাকে যেতেই হবে। তার স্থলাভিষিক্ত হবার দৌড়ে যে কয়েক নেতা এগিয়ে আছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং এবং ম্যানচেস্টারের মেয়র এন্ডিবার্নহ্যাম। স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্ট্রিটিং ইতিমধ্যে পদত্যাগ করেছেন। অন্যদিকে, এন্ডি বার্নহ্যাম প্রধানমন্ত্রী পদে লড়তে গেলে তাকে প্রথমে আগামী ১৮ জুন মেকারফিল্ড উপ–নির্বাচনে এমপি হিসাবে জয়ী হতে আসতে হবে। তবে ওয়েস স্ট্রিটিং কিংবা এন্ডি বার্নহ্যাম যেই আসুক না কেন তাতে আল্ট্রা ডানপন্থী নেতা নাইজেল ফারাজ ও তার দল রিফর্ম ইউ কে–কে ঠেকাতে পারবেন তেমন সম্ভাবনা কম বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। (১৯–০৫–২০২৬)।
লেখক : সাহিত্যিক, সাংবাদিক, কলামিস্ট।












