হাটে হাটে ঘুরছেন ক্রেতারা, বেচাবিক্রি জমেনি

ট্রাকে ট্রাকে আসছে পশু, নগরের অলিগলিতেও বসেছে বাজার

হাসান আকবর | শনিবার , ২৩ মে, ২০২৬ at ৬:০৭ পূর্বাহ্ণ

ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে নগরী ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে বসতে শুরু করেছে স্থায়ী ও অস্থায়ী হাট। নগরীতে ফুটপাত এবং অলিগলিতেও বসেছে গরু ছাগলের অস্থায়ী বাজার। খামারিদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া নিয়ে আসছেন ব্যাপারীরা। ফলে নগরজুড়ে তৈরি হয়েছে কোরবানি ঈদের আমেজ। বাজারে প্রচুর গরু ছাগল জড়ো করা হলেও বেচাবিক্রি এখনো জমে উঠেনি। দাম বেশি হওয়ায় ক্রেতারা এক বাজার থেকে অন্য বাজারে ঘুরছেন। অপরদিকে বাজারের পাশাপাশি খামারের ওপরও নির্ভরতা বেড়েছে। অনেকে খামারেই গরু কিনে কোরবানি পর্যন্ত দেখভালের জন্য রেখে যাচ্ছেন।

সাগরিকা এবং বিবিরহাট গরু বাজারের পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে লায়ন শরাফত আলী গতকাল দৈনিক আজাদীকে বলেন, দুইটি বাজারেই গিয়েছি। প্রচুর গরু ছাগল ও মহিষ এসেছে। কিন্তু দাম বেশি চাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা দাম এখনো কমাতে চাচ্ছেন না। তাই ঘুরে চলে এসেছি। একই কথা বললেন ব্যবসায়ী শহীদুল ইসলাম। তিনি বললেন, প্রচুর গরু, তবে দাম বেশি হওয়ায় এখনো বেচাবিক্রি জমে উঠেনি। ক্রেতারা ঘুরে ফিরে দরদাম করছেন।

গরু ব্যবসায়ীরা জানান, এবার দেশীয় খামারে উৎপাদিত পশুর সরবরাহ ভালো থাকায় বাজারে কোরবানির পশুর সংকট হওয়ার আশঙ্কা নেই। বিশেষ করে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা, কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফেনী, কুষ্টিয়া, পাবনা ও উত্তরাঞ্চল থেকে বিপুল সংখ্যক পশু আসতে শুরু করেছে। বড় আকৃতির গরুর পাশাপাশি মাঝারি ও ছোট আকারের গরুর চাহিদাও বেশি দেখা যাচ্ছে।

নগরীর অন্যতম বড় পশুর হাট সাগরিকা ও বিবিরহাট পশু বাজারে প্রচুর গরু দেখা গেছে। ট্রাকে ট্রাকে উত্তরবঙ্গসহ দেশের নানা অঞ্চল থেকে প্রচুর গরু চট্টগ্রামে আসছে। ফলে বাজারে সরবরাহ বাড়লেও বেচাকেনা এখনো জমে ওঠেনি। অনেক ক্রেতা দাম জিজ্ঞেস করেই ফিরে যাচ্ছেন।

নগরীর মইজ্জারটেক, অক্সিজেন, কর্ণফুলী, আনোয়ারা, পটিয়া ও হাটহাজারীর বিভিন্ন অস্থায়ী হাটেও ক্রেতাবিক্রেতাদের উপস্থিতি বাড়ছে। প্রতিবছরের মতো এবারও নগরীর অলিগলিতে ছোট ছোট বাজার বসেছে। ৮/১০টি গরু নিয়ে বসেছে বাজার। এসব বাজার থেকে স্থানীয়রা গরু কিনবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তারা।

নগরীর আলফালাহ গলিতে গড়ে উঠা ছোট্ট একটি পশুর বাজারে বেশ কয়েকটি গরু জড়ো করে রাখা হয়েছে। এগুলো স্থানীয়ভাবে বিক্রি হয়ে যাবে বলেও বিক্রেতারা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তারা উত্তরবঙ্গ থেকে গরুগুলো কিনে এনেছেন বলেও জানান।

জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবার চাহিদার তুলনায় প্রায় ৩৫ হাজার পশুর ঘাটতি রয়েছে। ২০২৪ সালে উৎপাদন ছিল ৮ লাখ ৫২ হাজার ৩৫৯টি, ২০২৩ সালে ৮ লাখ ৪২ হাজার ১৬৫টি। চলতি বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭ লাখ ৮৩ হাজারে।

অবশ্য প্রাণী সম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, নগর এলাকায় ঘাটতি থাকলেও চট্টগ্রামের গ্রামাঞ্চলে পশু উদ্বৃত্ত রয়েছে। মীরসরাই, সন্দ্বীপ, সীতাকুণ্ড, ফটিকছড়ি ও লোহাগাড়াসহ বিভিন্ন উপজেলায় প্রচুর পশু উদ্বৃত্ত রয়েছে। এছাড়া দেশের নানা অঞ্চল থেকে যেভাবে পশু চট্টগ্রামে আসছে তাতে সংকটের বিন্দুমাত্র শংকাও নেই।

সাগরিকা পশুর হাটের একজন ব্যবসায়ী বলেন, হাটে প্রচুর পশু এসেছে। তবে ক্রেতারা এখনো কেনাকাটা শুরু করেননি। দুয়েকদিনের মধ্যে বেচাকেনা জমে উঠবে বলেও তারা জানান।

লায়ন শরাফত আলী গতকাল দৈনিক আজাদীকে বলেন, কেনার জন্য আসিনি, শুধু বাজার দেখতে ও দাম যাচাই করতে এসেছি। তিনি বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার গরুর দাম অনেক বেশি। তাই একাধিক হাট ঘুরে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিকল্পনা আছে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আলমগীর জানান, নগরের পশুর ঘাটতি দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পশু দিয়ে পূরণ হবে। পার্বত্য জেলাগুলোতেও উদ্বৃত্ত পশু রয়েছে, ফলে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।

খামারিরা বলছেন, পশুখাদ্য, পরিবহন ও পরিচর্যা ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এবার পশুর দাম কিছুটা বেশি হতে পারে। তবে ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে তুলনামূলক সহনীয় দামে পশু বিক্রির চেষ্টা করছেন তারা। অন্যদিকে ক্রেতারা বলছেন, ঈদ ঘনিয়ে আসলে বাজারে ভিড় ও দাম আরও বাড়তে পারে। তাই কেউ কেউ আগে ভাগে গরু ছাগল কিনে নিচ্ছেন বলেও জানান তারা।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ও জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, স্বাস্থ্যসম্মত ও সুশৃক্সখল পরিবেশে পশুর হাট পরিচালনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। নিরাপত্তা নিশ্চিতে আইনশৃক্সখলা বাহিনীর পাশাপাশি ভেটেরিনারি টিমও কাজ করবে। জাল টাকা শনাক্তকরণ, যানজট নিয়ন্ত্রণ এবং পশু পরিবহনে শৃক্সখলা বজায় রাখতে বিশেষ নজরদারির কথাও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে অনলাইনেও কোরবানির পশু বিক্রির প্রবণতা বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে খামারিরা পশুর ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করে আগাম বুকিং নিচ্ছেন। এতে অনেক ক্রেতা ঘরে বসেই পশু পছন্দ করার সুযোগ পাচ্ছেন।

ব্যবসায়ী ও খামারিদের প্রত্যাশা, আসন্ন ঈদুল আজহায় চট্টগ্রামের পশুর বাজারে এবার কয়েকশ কোটি টাকার বাণিজ্য হবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পর্যাপ্ত সরবরাহ ও দেশীয় খামারের উৎপাদন বৃদ্ধির কারণে এবারের কোরবানির পশুর বাজার হবে প্রাণবন্ত ও ক্রেতাবান্ধব।

পূর্ববর্তী নিবন্ধঅপরাধ ঘটার আগেই সামাজিক প্রতিরোধ গড়তে হবে
পরবর্তী নিবন্ধপল্লবীর শিশু ধর্ষণ-হত্যার অভিযোগপত্র রোববার বিকালেই : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী