হালদা নদীতে মা মাছ ডিম ছেড়েছে। তবে তা পরিমাণে একেবারে কম। সংশ্লিষ্টরা একে নমুনা ডিম বলে উল্লেখ করেছেন। হালদা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৃহস্পতিবার রাতে অথবা আজ শুক্রবার মা মাছ পুরোপুরি ডিম ছাড়বে। এদিকে হালদায় ডিম ধরার সময়েও নদীতে বালুবাহী যান্ত্রিক নৌযানের চলাচলে উদ্বেগ প্রকাশ করে তারা এ বিষয়ে প্রশাসনের অভিযান চেয়েছেন। অন্যদিকে হালদায় ডিম সংগ্রহে উৎসবে নেমেছেন মৎস্যজীবীরা।
আমাদের হাটহাজারী প্রতিনিধি কেশব কুমার বড়ুয়া জানিয়েছেন, দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র হালদা নদীতে মা মাছ গতকাল বৃহস্পতিবার ডিম ছেড়েছে। সকাল দাশটার দিকে নমুনা ডিম ছেড়েছে। আবার দেড়টা থেকে দুইটার দিকে পুনরায় ডিম ছেড়েছে বলে জানিয়েছেন ডিম সংগ্রহকারীরা। বাংলা বছরের প্রথম মাস বৈশাখে চলমান পূর্ণিমা তিথিতে নদীতে মাছ দুই দফা ডিম ছেড়েছে। নদীর অংকুরী ঘোনা, গড়দুয়ারায় নয়াহাট, সিপাহির ঘাট, পাতাইজ্জ্যার টেক, কাগতিয়ার টেক, সোনাইর মুখ, মাছুয়াঘোনা, আজিমারঘাট, নাপিতেরঘাট, আমতুয়া কুমারখালির টেক, মদুনাঘাট প্রভৃতি এলাকায় ডিম ছাড়ার খবর নিশ্চিত করেছেন ডিম সংগ্রহকারীরা। কয়দিন থেকে কাল বৈশাখীর দমকা হাওয়া, বজ্রসহ বৃষ্টিপাত, নদীতে, পাহাড়ি ঢলের প্রকোপ, অপেক্ষাকৃত শীতল পরিবেশ মাছের ডিম ছাড়ার উপযোগী। তাই উপযুক্ত পরিবেশ পেয়ে পূর্ণিমার জো/ তিথিতে মাছ নমুনা ডিম ছেড়েছে।
ডিম সংগ্রহে জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত গড়দুয়ারায় কামাল সওদাগর, মাছুয়াঘোনা ডিম সংগ্রহকারী সমিতির সভাপতি শফিউল আলম এবং মদুনাঘাটের প্রবীণ ডিম সংগ্রহকারী আশু বড়ুয়া হালদা নদীতে নমুনা ডিম ছাড়ার বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন। তারা প্রথম দফায় প্রতি নৌকায় ৫শ গ্রাম, থেকে দেড় কেজি, নমুনা ডিম সংগ্রহ করতে পেরেছেন বলে জানান। পরে দেড়টা দুইটার দিকে পুনরায় প্রতি নৌকায় দেড় কেজি দুই কেজি করে ডিম সংগ্রহ করেছেন।
নদীতে নমুনা ডিম ছাড়ার খবর পেয়েই ডিম সংগ্রহকারীরা নৌকা ও ডিম আহরণের সরঞ্জাম নিয়ে নেমে পড়েছেন হালদায়। এদিকে হালদা নদীর হাটহাজারী অংশে মদুনাঘাট হ্যাচারি শাহ মাদারি এবং মাছুয়াঘোনা হ্যাচারি পুরোদমে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তিনটি হ্যাচারিতে যথাক্রমে মাছুয়াঘোনা হ্যাচারিতে ৪৬ টি কুয়া, শাহ মাদারিতে ৪৫টি এবং মদুনাঘাটে ১৮টি কুয়া পাশাপাশি গড়দুয়ারা ও বারিয়াঘোনায় ৩০টি মাটির কুয়া প্রস্তুত রাখা হয়েছে। শাহ মাদারিতে ২৫ গ্রুপ, মাছুয়োঘোনাতে ২৬ এবং মদুনাঘাটে ২০টি গ্রুপ এবং মাটির কুয়াসহ পাঁচশোর অধিক ডিম সংগ্রহকারী ডিম ফোটাতে পারবেন। প্রত্যেক হ্যাচারিতে ডিম থেকে রেনু উৎপাদনের সকল কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে বলে জানান সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ শওকত আলী। ইতিমধ্যে সরকারি ভাবে তিনটি হ্যাচারি তদারকিতে মৎস্য কর্মকর্তাদেরকে জেলা থেকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এবার এ মৌসুমে যথা সময় বজ্রসহ বৃষ্টিপাত, পাহাড়ি ঢল আর উজানের পানি নেমে আসায় ডিম ছাড়ার পরিবেশ খুবই ভালো। যেহেতু সকাল থেকে কিছু কিছু জায়গায় ডিম সংগ্রহকারীরা ডিম পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন; আশা করা যাচ্ছে রাতের মধ্যে মা মাছ পুরোদমে ডিম ছাড়তে পারে।
এদিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণী বিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান, হালদা রিচার্স ল্যাবরেটরির সমন্বয়ক, হালদা গবেষক অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরিয়াও
নমুনা ডিম ছাড়ার বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করে বলেছেন, এই ডিমকে নমুনা ডিম বলা যাবে। রাতে আবার ডিম দেয়ার সম্ভবনা ওয়েছে।
অথবা আজ শুক্রবারের মধ্যে মাছ পুরাদমে ডিম ছাড়তে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এদিকে রাউজান প্রতিনিধি মীর আসলাম জানিয়েছেন, প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীতে উৎসব মূখর পরিবেশে মৎস্যজীবীরা নদীতে জাল ফেলে কার্প জাতীয় মাছের ডিম সংগ্রহ করছেন। তবে ডিম সংগ্রহের মাত্রা কম বলে সংগ্রহকারীরা জানিয়েছেন।
গতকাল বেলা এগারটা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত জোয়ারের সময় নদীর আজিমের ঘাট পয়েন্টে দেখা গেছে শতাধিক মৎস্যজীবী নৌকা নোঙর করে জাল ফেলে ডিম সংগ্রহ করছেন। সংগ্রহকারী রোসাঙ্গীর আলম বলেছেন, প্রতি নৌকায় দেড় দুই বালতি করে ডিম সংগ্রহ করতে পেরেছেন। রাউজান উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেন ফাহিম নমুনা ডিম ছেড়েছে বলে অভিমত দিয়েছেন। এদিকে ডিম সংগ্রহকালে দেখা গেছে, নদীর মদুনাঘাটের ব্রিজের কাছে বড় যান্ত্রিক নৌযান। হালদা রক্ষা আন্দোলনের সদস্য মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেছেন, মা মাছ ডিম দেয়ার পর অত্যাধিক দুর্বল হয়ে পড়ে। কোনো কারণে যান্ত্রিক নৌযানের ডুবন্ত পাখার আঘাত পেলে নিশ্চিত মরে ভেসে উঠবে। তিনি হতাশা প্রকাশ করে বলেন, আইন থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের রহস্যজনক নীবরতার কারণে প্রভাবশালীরা বালু পরিবহনে এই সময়েও নদীতে বড় বড় যান্ত্রিক নৌযান ব্যবহার করছে।














