হল্যান্ড থেকে

বহুল আলোচিত ট্রাম্প-শি-র শীর্ষ বৈঠক : ফলাফল কী?

বিকাশ চৌধুরী বড়ুয়া | শনিবার , ৩ অক্টোবর, ২০২৬ at ৫:৫০ পূর্বাহ্ণ

‘যত গর্জে তত বর্ষে না‘ বলে একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ রয়েছে। চীনের শীর্ষ নেতা শি জিনপিং–এর সাম্প্রতিক ওয়াশিংটন–সফরকে ঘিরে ব্যাপক জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন করা হয়। কিন্তু দিন শেষে দেখা গেল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং শি–এর শীর্ষ বৈঠক যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন– এই দুই বৈরী রাষ্ট্রের মধ্যে বিরাজমান উত্তেজনা নিরসনে তেমন কোন সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মূল বিষয়কে এড়িয়ে ‘ব্যক্তিগত সু–সম্পর্ক‘ গড়ে তোলার উপর বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে। আশা করা হয়েছিল ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স‘ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বাণিজ্য কিংবা ইরানের সাথে সংঘাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে এবং কিছুটা আশা করা হয়েছিল হয়তো বড় কোনো উল্লেখযোগ্য নীতিগত ঘোষণা না এলেও ট্রাম্পের মুখ রক্ষার কারণে হলেও কিছু ‘ঘোষণা‘ আসবে। কিন্তু না, তেমন কোন উল্লেখযোগ্য ঘোষণা আসেনি এই শীর্ষ বৈঠক থেকে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এপি এই বৈঠককে ‘অনেকটা অন্তঃসারশূন্য‘ হিসাবে আখ্যায়িত করে ‘মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্ট শি–র সাথে ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক গড়ে তোলায় অনেক বেশি ব্যস্ত ছিলেন বলে উল্লেখ করে। ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার স্ত্রী মেলানিয়া হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট শি ও তার স্ত্রী পেং লিউয়ানের সম্মানে চা–চক্রের আয়োজন করেন। সেখানেই ট্রাম্পের রাষ্ট্রীয় অতিথির আদর আপ্যায়নের শেষ ঘটেনি। দুই প্রেসিডেন্ট এবং তাদের স্ত্রীদ্বয় মিলে আমেরিকার ঐতিহাসিক ও রাষ্ট্রীয় নথিপত্র (ফাউন্ডিং ডকুমেন্টস) দেখার জন্য ‘ন্যাশনাল আর্কাইভস’ পরিদর্শন করেন। এই পরিদর্শনের মধ্য দিয়েই সফরটির সমাপ্তি ঘটে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট শি–র সাথে ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেও চীন প্রেসিডেন্ট শি, ট্রাম্পের মত অত উচ্ছ্বাস প্রকাশ না করে ‘দু–দেশের মধ্যে যাতে কোনো সংঘাত বা মুখোমুখি অবস্থান তৈরি না হয়‘, তা নিশ্চিত করতে‘ উভয় পক্ষকেই তাদের দৃঢ় অবস্থান বজায় রাখার উপর জোর দেন। তবে এমন ভাবার কোন কারণ নেই যে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট শি–র সাথে আন্তর্জাতিক সমস্যাদি নিয়ে কোন আলোচনা করেননি। জানা যায়, এই দুই নেতা ইরান ও ইউক্রেন যুদ্ধ এবং তাইওয়ান প্রসঙ্গ নিয়েও আলোচনা করেন। শীর্ষ বৈঠকের আগে ভাবখানা ছিল এই অনেক সমস্যার সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে। কিন্তু সে সম্ভাবনায় গুড়ে বালি। শীর্ষ বৈঠক শেষে যে ‘নীতিগত ঘোষণাটি‘ এসেছিল তা ছিল বেশ সাধারণ মানের এবং তা ছিল, ‘নভেম্বরে মেয়াদ শেষ হতে যাওয়া একটি বাণিজ্য যুদ্ধ বিরতি চুক্তির মেয়াদ আরও দুই মাস বাড়ানোর সিদ্ধান্ত‘। চীন এবং আমেরিকার মধ্যে এখনো যে বেশ বড় ধরনের মতবিরোধ রয়ে গেছে তা বলা বাহুল্য। কেননা বিরল খনিজ এবং কম্পিউটার চিপ রপ্তানির উপর নিয়ন্ত্রণ, ইরান–চীন সম্পর্ক এবং তাইওয়ানের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন, ইউক্রেন যুদ্ধে চীনের রাশিয়ার প্রতি সমর্থন ও সামরিক সাহায্য ইত্যাদি বিষয় নিয়ে এই দুই শক্তিশালী দেশ এখনো পরস্পর বিরোধী অবস্থানে রয়েছে। শি–র আমেরিকা সফর উপলক্ষে এমন ব্যাপক আয়োজন করা হয়েছে যে অনেকে মনে করেন ট্রাম্প তার (শি) মনোতুষ্টির জন্যে তাবৎ পদক্ষেপ নিয়েছেন। এমনকী সকল প্রথা ভেঙ্গে ট্রাম্প সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়া সত্বেও চীন নেতাকে নিজের হেলিকপ্টারে নিয়ে গেলেন। এই অতি আধুনিক, সুরক্ষিত ও নিরাপদ আকাশযান পরিদর্শনে আমেরিকার অন্যতম সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের প্রধানকে হেলিকপ্টারে ওঠার আমন্ত্রণ ছিল অবাক করা ব্যাপার। শি নুতন হেলিকপ্টার ল্যান্ডিং প্যাড পরিদর্শন করেন যা প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী শি–এর সফরের আগে তড়িঘড়ি করে তৈরী করা হয়েছিল। তবে এতো কিছু করার পরও বরফ গলেছে বলে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছেনা।

আমেরিকা ও চীনের দুই নেতা এমন সময় এই শীর্ষ বৈঠক করলেন যখন ট্রাম্প নিজ ঘরে ইরান–যুদ্ধে তার ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক অসন্তোষের মধ্যে রয়েছেন। আগামী নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন। ইতিমধ্যে বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে রিপাবলিকান পার্টির অবস্থান খুব একটা শক্তিশালী পর্যায়ে নেই। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায়ও ধ্বস নেমেছে। ঘরে–বাইরে ইরান–যুদ্ধ বন্ধ করার চাপে রয়েছেন ট্রাম্প। একই সাথে দীর্ঘ চার বছরের বেশি সময় ধরে চলা ইউক্রেন–রাশিয়ার যুদ্ধের কারণেও ডোনাল্ড ট্রাম্প চাপে রয়েছেন। অন্যদিকে, চিনেও প্রেসিডেন্ট শি নিজ ঘরে নানা অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছেন। তবে একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, প্রেসিডেন্ট শি চিন পিং তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থান নিয়ে আমেরিকা সফর করলেন। এদিকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি–কে কাছে টানার জন্যে এবং তার (শি) সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তোলার জন্যে যে ব্যাপক আয়োজন করা হয়েছিল তাতে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টির অনেক নেতা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাদের অনেকেই চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্যে ‘হুমকি‘ হিসাবে বিবেচনা করেন।

এসোসিয়েট প্রেস শি–র এই সফরকে ঘিরে যে প্রতিবেদন প্রকাশ করে তাতে মন্তব্য করা হয়, ‘শি–র জন্য ট্রাম্পের এই ‘রেড–কার্পেট‘ বা রাজকীয় অভ্যর্থনা বেশ উল্লেখযোগ্য। কারণ এক বছরেরও কম সময় আগে তাঁরা শুল্ক–সংক্রান্ত লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েছিলেন, যা বিশ্ব অর্থনীতিকে মন্দার দিকে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছিল। এই উষ্ণতা আমেরিকার উত্তরাঞ্চলীয় প্রতিবেশী ও বৃহত্তম রপ্তানি বাজার কানাডা এবং দেশটির প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির প্রতি ট্রাম্পের বৈরী আচরণের ঠিক বিপরীত।‘ স্মরণ করা যেতে পারে যে, গেল বছর ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের বিরুদ্ধে কেবল চীন এবং কানাডাই পাল্টা শুল্ক আরোপের মাধ্যমে জবাব দিয়েছিল। এর বদলা হিসাবে ট্রাম্প আরো কঠোর অবস্থান নিয়ে কিছু কানাডীয় পণ্যের ওপর ৫০% শতাংশ শুল্ক এবং মোটরসাইকেল ও অ্যালকোহল সহ নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দেন। তবে লক্ষ্যণীয় ব্যাপার হলো, কানাডার প্রতি এমন বৈরী আচরণ করলেও ট্রাম্প চীন প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের প্রতি নমনীয় আচরণ দেখিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক বাণিজ্য কর্মকর্তা জেফ মুন এর একটি সহজ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এক টিভি সাক্ষাৎকারে মুন বলেন, ‘ট্রাম্প একজন ‘বুলি’ বা দাপুটে স্বভাবের মানুষ, যিনি সুযোগ পেলে অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিপক্ষের ওপর চড়াও হতে পছন্দ করেন। কিন্তু যখন তা সম্ভব হয় না, তখন তিনি থেমে যান।‘ গত বছর চীন যখন উন্নত প্রযুক্তির পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পদার্থের সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছিল, তখন ট্রাম্প চীনের ওপর চাপ কমিয়ে দিয়েছিলেন। ‘চায়না মুন স্ট্র্যাটেজিস’–এর প্রতিষ্ঠাতা মুন বলেন, ‘তখন আর অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিপক্ষের ওপর চড়াও হওয়া সম্ভব ছিল না।‘

একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ইরানের সাথে সংঘাত সহ বৈশ্বিক নানা জটিলতায় ট্রাম্প প্রশাসন বেশ হিমশিম খাচ্ছে। চীন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরে এসে একটি ‘অন্তর্র্বর্তীকালীন চুক্তিতে পৌঁছানোর আহবান জানালেও চীনের ভূমিকাও পরিষ্কার নয়। ইরানের বড় বানিজ্যিক অংশীদার হওয়ার কারণে ইরানের উপর চীনের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। কিন্ত তা সত্ত্বেও সমঝোতার ক্ষেত্রে চীন প্রকাশ্যে তেমন কোন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা এখনো রাখেনি বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন। চীনের একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি অনুযায়ী ‘একান্ত আলোচনায়‘ শি ট্রাম্পকে বলেন যে তিনি আশা করেন যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করার ‘সঠিক অবস্থানে অটল থাকবে’– যেহেতু তাইওয়ান একটি স্বশাসিত দ্বীপ।‘ এই নিয়ে ট্রাম্প এখনো পর্যন্ত কোন মন্তব্য করেননি বলে প্রকাশ। তবে আলোচনা যতই হোক না কেন সকল পক্ষ আন্তরিক না হলে ইরান–যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাত, পাশাপাশি ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধ যে অচিরে থেমে যাবে তা এই মুহূর্তে কোনভাবেই আশা করা যাচ্ছেনা। তারপরও বলা যায়, সব সমস্যার সমাধান কেবল আলোচনার মাধ্যমেই সম্ভব। অনেক সময় রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক দেশের ‘সম্পর্ক উন্নয়নের‘ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। তাই কেউ কেউ সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে ট্রাম্পের প্রচলিত প্রথার বাইরে গিয়ে অতিথিকে অভ্যর্থনা জানানোকে সমালোচনার দৃষ্টিতে দেখলেও আমার ধারণা এর সুফল পাবারও সম্ভাবনা রয়েছে। ইতিমধ্যে ঘোষণা দেয়া হয়েছে, দুই নেতার মধ্যে চলতি বছর আরও দুবার সাক্ষাতের পরিকল্পনা রয়েছে। রাজনৈতিক ভাষ্যকারদের মতে, এর অর্থ, ‘তাঁদের মধ্যকার এই যোগাযোগ বা আলোচনা কোনো চূড়ান্ত চুক্তির সমষ্টি নয়, বরং একটি চলমান সংলাপের অংশ।‘ এর ফলে বাণিজ্য বিষয়ক যে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ ২০২৭ সালের ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল, তা আরও একবার বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।‘ নভেম্বরে চীনের শেনঝেনে এশিয়া–প্যাসিফিক ইকোনমিক কো–অপারেশন (এপেক) শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করবেন শি। আর ডিসেম্বরে ফ্লোরিডার ট্রাম্প ন্যাশনাল মায়ামি গলফ ক্লাবে অনুষ্ঠিত হবে ‘জি–২০‘ শীর্ষ সম্মেলন। ওয়াশিংটন ত্যাগের আগে চীন প্রেসিডেন্ট শি নিশ্চিত করেছেন যে, তিনি শীঘ্রই ট্রাম্পের সাথে আবারও দেখা করার আশা করছেন। আবারো বলি, সমস্যা নিরসনে আলোচনার কোন বিকল্প নেই। দেখা যাক বিশ্ব পরিস্থিতি কোনদিকে গড়ায়। আমরা আশাবাদী। (২৯–৯–২০২৬)।

লেখক : সাহিত্যিক, সাংবাদিক, কলামিস্ট।

পূর্ববর্তী নিবন্ধজাহাজভাঙা ইয়ার্ডে খাণ্ডবদাহন আর কতকাল চলবে
পরবর্তী নিবন্ধকার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের ১৪ জন গ্রেপ্তার