জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে খাণ্ডবদাহন আর কতকাল চলবে

তপন দত্ত | শনিবার , ৩ অক্টোবর, ২০২৬ at ৫:৪৯ পূর্বাহ্ণ

সীতাকুণ্ড উপজেলার উত্তর থেকে দক্ষিণে বিস্তৃত জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডসমূহ এক বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছেছে। যা শ্রমিক মৃত্যু, পরিবেশের ক্ষতি, প্রাকৃতিক বিপর্যয় হাজার হাজার মাছ ধরার জেলের মৎস্য আহরণ সরঞ্জাম, নৌকা, জালসহ বঙ্গোপসাগরের মৎস্য ধরে বহু জীবন সংসার ও বঙ্গোপসাগর ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমাদের এই সুজলা, সুফলা দেশটি দীর্ঘদিন ধরে ব্রিটিশ, ফ্রান্স, পর্তুগাল, ইউরোপীয় দেশের উপনিবেশে পরিণত হয়েছিল। নির্মম বল প্রয়োগের মাধ্যমে সীমাহীন নির্যাতন, শোষণ করে এদেশের মূল্যবান সম্পদসমূহ আর মানুষের শ্রম লুটপাট করে নিয়েছে। তাদের দেশকে সম্পদশালী করে আমাদের দেশকে পরাধীন করে রেখেছিল।

বিগত প্রায় ত্রিশ বছর ধরে জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডে যেই শ্রম শোষণের মাত্রা যে পর্যায়ে পৌঁছেছে যা গোটা দেশে এক মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করে চলেছে। এবং এটা ক্রম বর্ধমান। ইয়ার্ডে জাহাজ ভাঙার মূল কারিগর তো বাংলার শ্রমজীবী মানুষ। তাদের অরহরহ দুর্ঘটনায় মৃত্যু অবর্ণনীয়। দুকলম লিখতে কলম থেমে যায়– মননে–মগজে মৃত্যুর নাটকীয় দৃশ্যগুলো খেলা করতে থাকে।

সর্বশেষ দুর্ঘটনার কালো দিনটি হলো– বিগত ১৪ আগস্ট ছিল শুক্রবার। ঐদিন ছিল সরকারি সাপ্তাহিক ছুটির দিন। ছুটির দিনে কাজ করতে হলে তার জন্য শ্রম আইনের কিছু ধারাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে মালিকদের জন্য। সেটি হলো শুক্রবার কোনো জরুরি প্রয়োজনে শ্রমিককে কাজ করানো যায়। তবে সেই জন্য দ্বিগুণ মজুরি যত ঘণ্টা কাজ হয়েছে তত ঘণ্টার স্বাভাবিক মজুরির দ্বিগুণ হারে মজুরি দিতে হবে। ছুটির দিনে কাজ করানোর জন্য একদিন ছুটি জন্য ঐ সপ্তাহের মধ্যে ১ দিন সচেতন ক্ষতিপূরণমূলক ছুটি বাধ্যতামূলক। এটি সম্মানজনক দুয়েকটি মিল, প্রতিষ্ঠান ছাড়া কোথাও কার্যকর নেই। বিষয়টি নির্মম শ্রম শোষণের আরেক বর্বর নমুনা। দেশব্যাপী একটি বড়সর আন্দোলন গড়ে তুলতে যা পরিশেষে এই মালিকরা শোষণের সুযোগ কখনও ছাড়বে না।

বিগত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪ এরকম আরেকটি বড়ো দুর্ঘটনা ঘটেছে। এস এম কর্পোরেশনে। সেখানে ৬ জন শ্রমিক নিহত হয় ঘটনাস্থলে। আহত কয়েকজনকে ঢাকা বার্ন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে তাদের অবস্থা কী পরে আর কখনো জানা যায়নি। তারও আগে আর কে শিপ ইয়ার্ডে ২ জন শ্রমিককে রাত ৩টায় পাঠানো হয়েছিল জাহাজ ইয়ার্ডে ভিড়ানোর জন্য। কিন্তু তীব্র বেগে ঘূর্ণায়মান প্রপেলালের আঘাতে মোট ৩ জন শ্রমিকসহ উল্টে যায়। ২ জন ঘটনাস্থলে মৃত্যুবরণ করেন। একজনকে আহত অবস্থায় তীরে নিয়ে আসা হয়।

যে ঘটনাগুলো উল্লেখ করলাম এসব গ্রীন ইয়ার্ড। এখন দেখা যাচ্ছে ম্যানুয়েলি কাজ করা ইয়ার্ডগুলোর চেয়ে গ্রীন ইয়ার্ডের দুর্ঘটনা অধিকতর বিপজ্জনক। ঘন ঘন এসব দুর্ঘটনা হচ্ছে। ছোটোখাটো দুর্ঘটনা তো লেগেই আছে। ফেরদৌস স্টিলের দুর্ঘটনার ১ সপ্তাহের মধ্যে অন্য একটি ইয়ার্ডে ১ জন শ্রমিকের জাহাজ থেকে নিচে পড়ে মেরুদণ্ড ভেঙে যায়। কয়েকজন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে একটি প্রাইভেট হাসপাতালে আইসিইউতে মৃত্যুবরণ করেন। এই হিসেবে এমন কোনো মাস, সপ্তাহ নেই কোনো না কোনো দুর্ঘটনা ইয়ার্ডে ঘটছে।

তিন দশক আগে পর্যন্ত জাহাজ ভাঙা কাটা নির্মাণ করা সব কিছু মূলত ইউরোপিয় দেশসমূহে হতো। কিন্তু তাদের শ্রমিকের উচ্চ মজুরি, নিরাপত্তার কড়াকড়ি বিশেষ করে প্রাণ প্রকৃতি সমুদ্র দূষণ অতিরিক্ত ব্যয় বাঁচানোর জন্য তারা নানান ধরনের টোপ দিয়ে তার সাথে কিছু অর্থ দিয়ে উপমহাদেশসহ কিছু অনুন্নত রাষ্ট্রে এসব মৃত্যুমুখী জাহাজগুলোকে পাঠানো হয় কাটার জন্য। এসব জাহাজের গন্তব্য হয় বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত, তুরস্ক এইসব দেশ। ভারত গুজরাটের এলাং–এ জাহাজ কাটে। তাদের জাহাজ কাটা অনেক উন্নত। শ্রমিকরাও সংঘবদ্ধ।

শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়ন, সমবায় ইত্যাদির মাধ্যমে তারা তাদের দাবি আদায় করে। একটি প্রতিক্রিয়াশীল সরকার ক্রমাগত ভারতে ক্ষমতায় থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে অর্জিত ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার একেবারে খর্ব করে দিতে পারেনি। চীনও আগে বিদেশি জাহাজ কাটত। কিন্তু এখন তারা বাইরের কোনো জাহাজ কাটে না। ড্রাইডক করে সেখানে তাদের জাহাজ ভাঙা, তৈরি ইত্যাদি সব কিছু করা হয়। তাদের শ্রমিকরাও এইরকম দুর্ঘটনা বা শ্রমআইন লঙ্ঘনের শিকার হয় না। ইতোমধ্যেই আমাদের কয়েকটি ইয়ার্ডের পরিদর্শনের সুযোগ হয়েছে মালিক–শ্রমিক একটি যৌথ প্রতিনিধি নিয়ে।

শুধু তাই নয় শ্রমঘন গার্মেন্টস শিল্প উপমহাদেশ, ভিয়েতনামে চলে এসেছে। যান্ত্রিকীকরণের ফলে গার্মেন্টস শিল্প ও শ্রমিক সংখ্যার ক্রমশ নিম্নমুখী।

সাম্রতিক দুর্ঘটনার পর বেশ কয়েকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এসব কমিটির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কমিটি হলো শিল্প মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি। মন্ত্রণালয় একজন অতিরিক্ত সচিব সম্প্রতি সেই কমিটির রিপোর্ট পত্রপত্রিকায় প্রকাশ করেছেন। রিপোর্টে এই দুর্ঘটনার জন্য ফেরদৌস স্টিল কর্তৃপক্ষকে দায়ী করা হয়েছে। তাদের গাফিলতি এবং প্রয়োজনের সময় অতি জরুরি নিরাপত্তা সরঞ্জাম যথা: অ্যাম্বুলেন্স, অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা, হাইড্রোজেন সালফেট ঐ২ঝ প্রতিরোধী মাস্ক না থাকার কারণে মৃত্যুসংখ্যা ১০ জন হয়েছে। এইসব নিরাপত্তা সরঞ্জাম থাকলে এই মৃত্যু প্রতিরোধ করা যেত।

আমরা জাহাজ ভাঙা ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের দুর্ঘটনার পর পর কিছু নেতৃবৃন্দ সাথে সাথে ফেরদৌস স্টিলে যাই। দুর্ঘটনা স্থলে গিয়ে এবার কিছু নতুন পরিস্থিতির সাক্ষী হলাম। ইয়ার্ডের মূল গেইট হাটখোলা অবস্থায় যেটা অন্য কোনো দুর্ঘটনার সময় তো যায়নি। মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটলে মালিকরা শক্ত করে গেইট বন্ধ করে বাইরের কোনো লোককে ঢুকতে দেয় না। এই ব্যতিক্রম দেখলাম ফেরদৌস স্টিলে।

যাদের স্বামী, পুত্র দুর্ঘটনায় মারা গেছেন সেই নারীরা ইয়ার্ডের প্রধান কার্যালয়ের সামনে বসে আহাজারি করছেন–বুক কিলিয়ে কান্না করছেন। ইয়ার্ডের ভিতর সামরিক বাহিনী ডিজিবি সদস্য স্থানীয় জনগণ সব মিলিয়ে ৩/৪ শত লোক ইয়ার্ডে আছেন। একটা হট্টগোল অবস্থা। আমি নিজে জাহাজে উঠতে চাইলে স্থানীয় আইন–শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেতে দিতে রাজি হলেন না। তারা বলেন– জাহাজে এখনও বিপজ্জনক ঐ২ঝ আছে। উঠলেই মৃত্যু অনিবার্য। তাই উপরে আর যাইনি। পরে যে সমস্ত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের নারীরা আহাজারি করছিল তাদের কাছে এসে তাদের কান্না থামানোর জন্য বলে একটু আমাদের কথা শুনতে অনুরোধ জানাই। তাদের মধ্যে একজন বয়স্ক নারী সদস্য সবার কান্না থামালে আমরা তাদের বলি “আমরা আপনাদের সহায়তা করার জন্য আসছি। আমরা উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। এবং মৃত্যুর জন্য দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিপক্ষকে আদালতে সোপর্দ করার ব্যবস্থা করব। তবে সে ক্ষেত্রে তাদের প্রত্যেক নিহত শ্রমিকের পোস্টমর্টেম করার অনুরোধ জানাই। ইতোমধ্যে ৯টি লাশ চট্টগ্রাম মেডিকেলে নিয়ে গেছে। আমরা সেখানে যাচ্ছি। হঠাৎ দেখি কেউ একজন এসে আমাকে চলে আসতে বলেন। এটাও বলেন বড়ো সাহেব ১ জনের পোস্টমর্টেম করতে বলেছেন। আমি বারবার বুঝাতে লাগলাম। কোনো দুর্ঘটনায় ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের কোনোদিন শাস্তি হয়নি। ২/১টি উদাহরণস্বরূপ তাদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা না করলে এবং আদালত কর্তৃক শাস্তি আদেশ না দিলে এসব দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কোনো ব্যবস্থা নেবে না। তাই অন্তত একটি উদাহরণ তৈরি হোক।

দুঘর্টনা ঘটলে মালিককে শ্রম আদালতে দুই লক্ষ টাকা ক্রাইসিস কমিটির মাধ্যমে ৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দিয়ে নিজেরা নির্দোষ থেকে যায়। এবার একটা উদাহরণ সৃষ্টি হোক।

অতঃপর আমরা চট্টগ্রাম মেডিকেলের ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডে যাই। যেখানে সারি সারি ৯ জনের লাশ ভিতরে–বাইরে নিথর হয়ে পড়ে আছে। প্রত্যেকের পায়ে আঙুলে নাম লেখা কাগজ– কোন্‌টা কার লাশ শনাক্ত করার জন্য। তার মধ্যে ২ জন ইয়ার্ড নিকটস্থ জেলে পরিবারের সদস্য। আগে তারা সাগরে মাছ ধরতেন। ইতোপূর্বে কোনোদিন দেখিনি জেলেরা জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডে কাজ করতে। তারা মাছ ধরা বিক্রয়, মাছ বাছা, মান ভেদে পৃথক করা আড়তে নিয়ে আসা ও খুচরা বিক্রয়ের জন্য নিয়োজিত থাকে। কিন্তু ইয়ার্ড হওয়ার পরে তাদের জাল বসানোর যাতায়াতের পথে জাহাজ ভিড়ানোর জায়গা সংকুচিত হয়েছে। জাহাজ ভিড়ানোর আগমন, নির্গমনের ফলে জাহাজ জাল বসানোর জায়গাও সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। জাল ছিঁড়ে ফেলছে। এটা নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। বালুবাহী বাল্কহেডের শ্রমিকদের হাতে জেলেদের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। বছর দুয়েক আগে এরকম একটি ঘটনায় সাগরে ফেলে দেয় রবীন্দ্র জলদাস নামক একজন জেলেকে। বালুবাহী বাল্কহেডের আঘাতে তাদের জাল ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলে তারা বাল্কহেডের শ্রমিকদের কাছে কেন জাল ছিঁড়েছে জানতে চাইলে এবং ক্ষতিপূরণ দাবি করলে দুই ভাইকে তাদের ছেঁড়া জালসহ বাল্কহেডে তুলে নিয়ে হাতিয়ার দিয়ে যেতে থাকে। তাদের ছোটো নৌকাটি বাল্কহেডে বেঁধে নিয়ে চলে। কিছুদূর গিয়ে রাম দাশ জলদাসকে মাথায় আঘাত করে সাগরে ফেলে দেয়। ৪ দিন পর কুমিয়া ঘাটে তার লাশ ভেসে উঠলে প্রতিবেশী জেলেরা তাকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে ইমার্জেন্সিতে প্রয়োজনীয় কাজ সেরে মর্গে নিয়ে আসে পোস্টমর্টেম করার জন্য। আরেক ভাইকে উদ্ধারের জন্য পাহাড়তলী মৎস্যজীবী শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি সমীরণ দাস কোস্টগার্ডকে ফোনে জানালে কোস্টগার্ড প্রশংসনীয় তৎপরতায় হাতিয়া ঘাটে পৌঁছে ৬ জন বাল্কহেড শ্রমিক গ্রেপ্তার করে সীতাকুণ্ড থানায় পাঠিয়ে দেয়। থানা কর্তৃপক্ষ ঐসব খুনি আসামিদের আদালতে পাঠালে আদালত কারাগারে প্রেরণ করেন। রবীন্দ্র জলদাসের ছোটো ভাইকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। মামলার প্রয়োজনে নৌকা ও ছেঁড়া জাল কোস্টগার্ডের হেফাজতে আছে।

লেখক : সভাপতি টিইউসি, চট্টগ্রাম ও আহ্বায়ক, জাহাজ ভাঙা শিল্প, ট্রেড ইউনিয়ন ফোরাম।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবাংলাদেশে কিডনি রোগীর চিকিৎসা সংকট ও সরকারি সহায়তার প্রস্তাবনা
পরবর্তী নিবন্ধহল্যান্ড থেকে