আগস্ট ২০২৬–এ হঠাৎই চট্টগ্রাম ইপিজেডে মারাত্মক লোডশেডিং শুরু হলো। আমি চট্টগ্রাম ইপিজেডে বিভিন্ন কোরিয়ান মালিকানাধীন কোম্পানিতে চাকরি করছি ১৯৯২ সাল থেকে আজ অবধি। গত ত্রিশ বছরে ইপিজেডে এই ধরনের মারাত্মক লোডশেডিং কখনো দেখিনি। এমনকি কোনো কারণে আধা বা এক–দুই ঘণ্টার জন্য বিদ্যুৎ লাইন বন্ধ রাখতে হলেও ইপিজেড কর্তৃপক্ষ ২৪ ঘণ্টা আগে নোটিশ দিয়ে সবাইকে জানিয়ে দিতেন। গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎ সংকট হঠাৎই এই বড় সমস্যার মধ্যেই আমাদের উৎপাদন কাজ চালাতে হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ এখন এই সমস্যার সমাধান হয়েছে।
চট্টগ্রাম ইপিজেড তথা চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকার বর্তমান নির্বাহী পরিচালক মো. শরিফুল ইসলাম আগস্ট মাসেই চট্টগ্রাম ইপিজেডে যোগদান করেন। তখন প্রতিদিন পাঁচ–ছয়, এমনকি কোনো কোনো দিন দৈনিক সাত ঘণ্টা করে লোডশেডিং ছিল। অনেক কোম্পানির উৎপাদন বন্ধ এবং রপ্তানি আদেশ বাতিলের পথে ছিল। এই দুঃসময়ে সদ্য যোগদান করেই উনার দূরদর্শী চিন্তা, কৌশলগত পরিকল্পনা এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানের সাথে চমৎকার যোগাযোগ দক্ষতায় উনি এই মারাত্মক সমস্যার দ্রুত সমাধান করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ এখন বিদ্যুৎ লোডশেডিং সেই রকম নেই। যেহেতু চট্টগ্রাম ইপিজেডে কোনো সময় বিদ্যুতের অভাব হয়নি, বেশির ভাগ কোম্পানি কোনো বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বা জেনারেটর রাখেনি। এখন অনেক কোম্পানি জেনারেটর আমদানি করছে। অনেকে সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে ফ্যাক্টরি চালানোর বিকল্প আয়োজন করছে।
বাংলাদেশে এখন লোডশেডিং বাড়ার কারণে সোলার তথা সৌরবিদ্যুৎ একটা আশীর্বাদ, কিন্তু এরও কিছু পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ আছে যেটা এখন থেকেই ভাবতে হবে, না হলে ১০ বছর পর বড় বিপদ হবে।
সোলার থেকে পরিবেশের ৬টা বড় সমস্যা:
১. সোলার বর্জ্য– আগামীর ই–বর্জ্য: একটা প্যানেলের আয়ু ২০–২৫ বছর। ২০১০–১৫ সালে লাগানো হাজার হাজার প্যানেল এখন নষ্ট হতে শুরু করেছে। এর ভেতর সীসা, ক্যাডমিয়াম আছে খোলা জায়গায় ফেললে মাটি ও পানিতে মিশে যাবে। বাংলাদেশে এখনও সোলার রিসাইকেল প্ল্যান্ট নেই।
২. ব্যাটারি বিপদ – সবচেয়ে বড় ঝুঁকি: আমাদের দেশে বেশিরভাগ সোলার সিস্টেম লেড–এসিড ব্যাটারি দিয়ে চলে। প্রতি ৩–৪ বছরে ব্যাটারি নষ্ট হয়। এই ব্যাটারির এসিড ও সীসা হালদা–কর্ণফুলীর পাশে ফেললে নদী দূষিত হবে। লিথিয়াম ব্যাটারিও সঠিকভাবে ডিসপোজ না করলে আগুনের ঝুঁকি।
৩. জমির ব্যবহার: চট্টগ্রাম বা সীতাকুণ্ডে বড় সোলার ফার্ম করতে গেলে কৃষি জমি বা পাহাড় কাটা লাগছে। উপকূলের চরে প্যানেল বসালে পাখির আবাস নষ্ট হয়। ছাদে সোলারই সবচেয়ে ভালো, জমিতে নয়।
৪. উৎপাদনকালীন দূষণ: প্যানেল বানাতে অনেক পানি ও রাসায়নিক লাগে, চীন থেকে আমদানির সময় কার্বন ফুটপ্রিন্টও বেশি। এটা আমাদের দেশে সরাসরি দূষণ না করলেও গ্লোবালি পরিবেশের ক্ষতি করে।
৫. তাপ ও আলো প্রতিফলন: বড় সোলার ফার্মের কালো প্যানেল সূর্যের তাপ শোষণ করে আশেপাশের তাপমাত্রা ২–৩ ডিগ্রি বাড়িয়ে দিতে পারে। পাখি অনেক সময় প্যানেলকে পানি ভেবে ধাক্কা খায়।
৬. পরিষ্কারের পানি ও রাসায়নিক: প্যানেলে ধুলা জমলে বিদ্যুৎ কমে যায়, তাই নিয়মিত পানি দিয়ে ধুতে হয়। বড় প্রজেক্টে হাজার লিটার পানি লাগে শুষ্ক মৌসুমে এটাও একটা চাপ।
তাহলে করণীয় কী? ছাদের সোলারকে উৎসাহিত করা, কৃষি জমিতে নয়। পুরাতন প্যানেল ও ব্যাটারি কেনা–বেচার জন্য সরকারি রিসাইকেল নীতি করা। ই–বর্জ্য কালেকশন ডে করা। লেড–এসিডের বদলে লাইফ সাইকেল বেশি এমন ব্যাটারি ব্যবহার করা। সোলার খারাপ নয়, কিন্তু এটাকে ব্যবহার করো আর ফেলে দাও নয়, ‘ব্যবহার করো, রক্ষণাবেক্ষণ করো, রিসাইকেল করো’ এই চক্রে আনতে হবে। তাহলেই লোডশেডিং কমবে, পরিবেশও বাঁচবে। বাংলাদেশ এর রপ্তানী আয় বৃদ্ধির সাথে সাথে দেশ আরো সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে।












