রাউজান ছালামতউল্লাহ হাই স্কুল আমার প্রাণপ্রিয় মাধ্যমিক স্কুল। ১৯৭৮ সালের কোন এক সুন্দর সকালে মরহুম বড় ভাই আবু তাহের চৌধুরীর হাত ধরে আমি যাচ্ছি বড় স্কুলে ভর্তি হবার দুর্নিবার আশায়। বড় স্কুল মানে প্রাচীন বিদ্যাপীঠ রাউজান আর আর এ সি মডেল ইনস্টিটিউশন। রাউজানের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ বলতেই উক্ত স্কুলকে বোঝানো হত। দেশের নামী–দামী, সরকারি–বেসরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ উক্ত স্কুলের গর্বিত ছাত্র ছিলেন। সেজন্যেই অনেক নাম ডাক ছিল এই স্কুলের । স্বভাবতঃ এই স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার প্রবল আগ্রহ ও সুপ্ত বাসনা ছিল আমার এবং আমি তা প্রাইমারী লেভেল থেকেই মনে মনে আকাঙ্খা করে আসছিলাম। কিন্তু আমার সমস্ত আশা ভরসাকে ফাঁকি দিয়ে পিতৃতুল্য বড় ভাইয়ের আদেশের কাছেই নিজেকে সঁপে দিলাম। উনি আমাকে নিয়ে গেলেন মাটির তৈরি এবং ছনের ছাউনি ঘেরা আফ্রিকান এক গ্রামাঞ্চলের কুঁড়েঘরে। বৃষ্টি আসলেই ছাদ বেয়ে পানি পড়ত যেখানে, মেঘের গর্জন শুনলেই ছুটি দিতেন প্রিয় শিক্ষকেরা আর আমরা সমস্বরে বলে উঠতাম, ‘আজ আমাদের ছুটি ও ভাই আজ আমাদের ছুটি’। সেই মাটির তৈরি বিদ্যাপীঠে বড় ভাই আমাকে ভর্তি করিয়ে দিলেন। ভর্তির পর দপ্তরী নূরু বদ্দা আমাকে নিয়ে গেলেন ষষ্ঠ শ্রেণীর ক্লাস রুমে। সেখানে নাক থেকে অনবরত ঝরতে থাকা স্যালাইনের পানি দেখতে পেলাম। মাথার চুল বেয়ে গড়িয়ে পড়া তেলের সুদৃশ্য ড্রাম দেখতে পেলাম। আরো দেখতে পেলাম জীর্ণ–শীর্ণ কঙ্কালসার কিছু শরীর। পাঠদান করছিলেন নাম জানা এক শিক্ষক। আমাকে বসিয়ে দেওয়া হলে পিছনের এক টেবিলে। ক্লাস শেষে গন্তব্য যাত্রা নিজ বাসভূম পানে। কথা হল না কারো সাথে। নতুন উচ্ছ্বাস, নতুন ছন্দ, নতুন আবেগ–সব মিলিয়ে অন্য রকম এক জলজ উদ্ভিদ এর মতন নিজেকে আবিষ্কার করলাম। দিনে দিনে পরিচিত হতে থাকলাম পাঠশালার বন্ধুদের সাথে। প্রিয় বন্ধু মুরাদ, ফয়েজ, শ্যামল (বর্তমানে কানাডা প্রবাসী), সাইফুল, আজাদ, বিরু (বর্তমানে মরহুম), নারায়ণ, অরুণ, বরুণ, গোকুল, ফারুক, হানিফ–একে একে সবার সাথে হৃদ্যতা বাড়তে থাকে। কতই না খুনশুঁটি করতাম একে অপরের সাথে। সেই স্মৃতিময় দিনগুলো এখন আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। রাউজান স্কুলের মাঠে ফুটবল খেলার আয়োজন–যদিও ভালো খেলতে পারতাম না আমি। এদিকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কিছু বলার জন্য ডাক পড়ত হঠাৎ। প্রিয় সুবোধ স্যারের অসম্ভব বাগ্মিতা মুগ্ধ করত আমাদের সবাইকে। মনিটর ছিলাম আমি। আমার সাথে প্রচন্ড প্রতিযোগিতা চলত শ্যামলের সাথে। সেকেন্ড পজিশনটা সবসময় ওর দখলে থাকত। তবে ভালো বন্ধুত্বও ছিল আমার সাথে। ওর সাথে অনেকদিন দেখা হয়নি। অনেক বছর আগে গ্রামের বাড়িতে আসলে আমি তাকে রাউজান ক্লাবে নিয়ে আসি। প্রস্তাবিত রাউজান ক্লাব হাসপাতালের জন্য অনুদানের আশ্বাস প্রদান করে ও। ওর চাচা ভবতোষ দে অত্যন্ত বন্ধুবৎসল ছিলেন। উনার প্রতিষ্ঠিত মডার্ন লাইব্রেরী এক নামে পরিচিত ছিল। যেখান থেকে আমরা সব বই ক্রয় করতাম। সিনিয়র ভাইদের সাথে ছিল আমাদের অত্যন্ত মধুর সম্পর্ক। লোটন ভাই, ইকবাল ভাই, স্বপন দা, বেলাল ভাই, মাসু ভাই সবার সাথে। যোহরের নামাজ পড়তাম কাজী বাড়ী মসজিদে–যেখানে আমার সেজো ভাইয়ের শ্বশুর বাড়ি। শ্রদ্ধেয় স্যারদের কথা এখনো ভীষণভাবে হৃদয়কে নাড়া দেয়। তাঁরা শাসন না করলে হয়তো এতটুকু আসতে পারতাম না। তাঁদের কঠিন শাসন আমাদের অনেকের শিক্ষাজীবনকে করে তুলেছে সুগম, প্রাণবন্ত।
একদা মাসু ভাই সালাম স্যারের কাছে আমার ইংরেজী খাতা দেখতে চাইলেন। আমি ১০০ নাম্বারে ৭১ পেয়েছি। এটা দেখে মাসু ভাই মন্তব্য করলেন, ‘৩ পৃষ্ঠা লিখেই এত নাম্বার’? উনার ছোট ভাই বিরু আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। ২০০১ সালে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় আমাদের ছেড়ে চলে গেছে না ফেরার দেশে। এখনো মনে পড়ে সালাম স্যার, পন্ডিত স্যার, নিতাই স্যার, সাধন স্যার, পিষুষ স্যার, দিলীপ স্যার, প্রধান শিক্ষক জ্যোতিষ চন্দ্র ধর স্যার–যে স্যারেরা এখন আর বেঁচে নেই। তাঁদের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো এখনো আমাদের জীবনের মোড়কে পরিবর্তন করে দিয়েছে। শিষ্টাচারিতা, সত্যবাদিতা সবটুকুন আমরা পেয়েছি এ সমস্ত গুণধর, প্রতিভাবান শিক্ষকমন্ডলীর কাছ থেকে। এখনো আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন শ্রদ্ধেয় দুলাল স্যার, রাখাল স্যার, অরুণ স্যার. দিদার স্যার, ইউনুছ স্যার। রাখাল স্যারের সাথে এখনো কথা হয় মাঝে মাঝে। সবচেয়ে বেশি ভয় পেতাম রাখাল স্যারকে। ভীষণ রাগী ও অভিমানী ছিলেন স্যার। আমাদেরকে মানুষ করানোর জন্য তাঁর রাগ ও অভিমান। তাঁর এই রাগের কারণে আমরা সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পেরেছি আলহামদুলিল্লাহ। নিতাই স্যার ছিলেন আমার গৃহ শিক্ষক। আমাকে বেশি পছন্দ করতেন স্যার। পায়ুপথের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে বেশ কয়েক বছর আগে তিনি ইহলোক ত্যাগ করেছেন।
পন্ডিত স্যারের প্রচণ্ড মার এখনো যেন পিঠে লেগে আছে। ইংরেজি শিক্ষক সালাম স্যারও বেশ কয়েক বছর আগে আল্লাহতায়ালার মেহমান হয়েছেন। তাঁর কাছেও প্রাইভেট পড়েছি। অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষক ছিলেন স্যার। প্রধান শিক্ষক জ্যোতিষ চন্দ্র ধর স্যার ছিলেন অত্যন্ত গুরুগম্ভীর। প্রতিদিন প্রতিটি ক্লাসে রাউন্ড দিতেন। শিক্ষার মান উন্নয়নে ওনার ভূমিকা ছিল আকাশচুম্বী। ইট–সুরকিতে গড়া এই মাটির স্কুল থেকে উঠে এসেছে খ্যাতনামা শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী, ব্যাংকার ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। এখনো মনে পড়ে সেই স্মৃতিময় দিনগুলোর কথা–যেন ফিরে যেতে মন চায় সে সময়ে। ছোটাছুটি করতে মন চায় সেই কৈশোর বেলার মতন। এখন আর সেই স্কুল আর মাটির গড়া নয়। বিশিষ্ট দানবীর, সমাজহিতৈষী মরহুম সাইফুদ্দিন কাদের চৌধুরীর বদান্যতায় দৃষ্টিনন্দন ভবন তৈরি হয়েছে। মহান আল্লাহতায়ালা সাইফুদ্দিন ভাইকে জান্নাতবাসী করুন আমিন। ১৯৯২ সালে প্রথম পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান করেছিলাম আমরা। অনেক প্রাক্তন ছাত্র–ছাত্রীদের সম্মীলন ঘটেছিল সেদিন। সাবেক ব্যাংকার মরহুম নবীদুল আলম প্রধান অতিথি ছিলেন সেই অনুষ্ঠনে । পেশাগত ব্যস্ততার কারণে সেই পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান করা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি । প্রাণপ্রিয় সেই স্কুলের কথা মনে পড়লেই হারিয়ে যাই নস্টালজিয়ায়। হৃদয়ের গভীরে গেঁথেছিল যে শৈশব স্মৃতি তা যেন হঠাৎ উৎসারিত হয় অবলীলাক্রমে।
লেখক: সভাপতি, রাউজান ক্লাব, অধ্যাপক (ইএনটি)-অবসরপ্রাপ্ত,
রাঙ্গামাটি মেডিকেল কলেজ












