সাত দিন ধরে বন্ধ সাজেক, বেকার ৩ হাজার পরিবহন শ্রমিক

সমির মল্লিক, খাগড়াছড়ি | বৃহস্পতিবার , ২৯ অক্টোবর, ২০২৬ at ৭:০৭ পূর্বাহ্ণ

রাঙামাটির সাজেক পর্যটনকেন্দ্রে সড়ক অবরোধের প্রভাব পড়েছে খাগড়াছড়ির পর্যটনশিল্পেও। সাজেককে কেন্দ্র করে আসা পর্যটকেরা খাগড়াছড়িতে ভ্রমণ করে। এছাড়া খাগড়াছড়ি থেকে গাড়ি রির্জাভ করে পর্যটকেরা সাজেকে বেড়াতে যায়। অবরোধের কারণে ২২ অক্টোবর থেকে সাজেক বন্ধ থাকা ও পর্যটক না আসায় বিপাকে পড়েছেন পরিবহন শ্রমিক, হোটেল–মোটেল ব্যবসায়ী ও স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা। গতকাল বুধবার সরেজমিনে খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ হর্টিকালচার পার্ক, আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্র, রিছাং ঝরনা ও মায়াবিনী লেকসহ জেলার বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়–পর্যটকদের আনাগোনা নেই। পর্যটন মৌসুমে এসব স্থানে দর্শনার্থীদের ভিড় থাকলেও এখন অনেকটা সুনসান পরিবেশ বিরাজ করছে।

এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে পরিবহন শ্রমিকেরা। খাগড়াছড়িতে জিপ), পিকআপ, মাহেন্দ্র সিএনজি চালকেরা এখন বেকার হয়ে পড়েছে। পরিবহন মালিকদের আয়ের বিকল্প উৎস থাকলে শ্রমিকেরা আয়শূন্য হয়ে এখন দিশেহারা।

অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধের কারণে পর্যটকদের ভ্রমণ পরিকল্পনায় পরিবর্তন এসেছে। সাজেকে যেতে না পারার আশঙ্কায় অনেকে খাগড়াছড়িতে ভ্রমণও বাতিল করছেন। ফলে সাজেকের পাশাপাশি খাগড়াছড়িও পর্যটকশূন্য হয়ে পড়েছে। খাগড়াছড়ি–সাজেক সড়কে নিয়মিত পর্যটকদের আনা নেওয়া করেন মাহেন্দ্র চালক মনসুর আলী। তিনি বলেন, খাগড়াছড়িতে ৪৫০টি মাহেন্দ্র গাড়ি আছে। খাগড়াছড়ি থেকে সাজেক আসা যাওয়া ভাড়া ৭ হাজার টাকা। মাসে অন্তত ১০টি ট্রিপ ঘুরলে একজন চালকের আয় অন্তত ৭০ হাজার টাকা। কিন্ত গত সাত দিন ধরে কোনো আয় নেই। অনেকে গাড়ি নিয়ে লোকাল ট্রিপ মারছে। কিন্ত সেখানেও কোনো আয় নেই। সারাদিনে উপজেলাগুলোতে একটা ট্রিপ মারতে পারি। জ্বালানি তেলের খরচও উঠে না। হোটেল মোটেল মালিকদের বিকল্প আয় থাকে, কিন্তু রুটি রুজির একমাত্র খোরাক পর্যটক না আসায় আমাদের উর্পাজন বন্ধ হয়ে গেছে।

সাজেক রোডের সিএনজিচালিত টেঙিচালক মোহাম্মদ হারুন বলেন, সাজেক অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হওয়াতে আমরা খুবই কষ্ট ও হতাশার মধ্যে দিন যাপন করছি। আমাদের কিস্তি আছে, ধারদেনা আছে। আমরা তো গাড়ি চালিয়ে ভাত খাই। কিন্ত আমাদের গাড়িগুলো বন্ধ। সারা বছর আশা করি এই সময়ে পর্যটক সংখ্যা বাড়বে। আমরা চাইব সমস্যাটা সমাধান করে দেওয়া হোক।

খাগড়াছড়ির পিকআপ চালক প্রদীপ ত্রিপুরা বলেন, পর্যটন সিজনে প্রতিদিন দেড়শ থেকে দুইশ পিকআপ সাজেক যাতায়াত করে। প্রতিটি গাড়িতে চালক ও সহকারী থাকে। গাড়িগুলো এখন বন্ধ। শ্রমিকেরা বেকার। পর্যটন মৌসুমের আগে অনেকে ঋণ করে কিস্তিতে গাড়ি কিনেছে। তারা এখন বেকার। সাত দিন ধরে গাড়ির চাকা ঘুরছে না। এভাবে আর কত দিন? চালক, সহকারীদের এখন দিশেহারা অবস্থা।

খাগড়াছড়ির সাজেক কাউন্টারের ব্যবস্থাপক মো. আরিফ উদ্দিন বলেন, প্রতিদিন আমাদের কাউন্টার থেকে অন্তত ১০০ থেকে ১৫০টি পর্যটকবাহী জিপ সাজেকের উদ্দেশে ছেড়ে যেত। তবে তৃতীয়বারের মতো অবরোধ শুরু হওয়ায় গত বৃহস্পতিবার থেকে কোনো পরিবহন সাজেকের উদ্দেশে ছেড়ে যায়নি। পরিস্থিতি জানিয়ে পর্যটকদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

পার্বত্য যানবাহন মালিক সমিতির সভাপতি আয়ুস চাকমা বলেন, সাজেক পরিবহন বন্ধ হওয়ার কারণে, আমাদের বর্তমানে প্রায় ৩,০০০ ড্রাইভার এবং হেলপার বসা অবস্থায় আছেন। আমাদের গাড়িগুলো এখনো বসা এবং আমাদের চলাফেরা খুবই কষ্ট হচ্ছে। আমি অনুরোধ জানাব প্রশাসনের কাছে, অচিরেই যেন সাজেকে পর্যটন কেন্দ্র খুলে দেওয়া হয় এবং নিরাপদে যেন পর্যটক ঘুরে ফিরে আসতে পারে। আমাদের যে হাজার তিনেক পরিবহন শ্রমিক আছেন, ড্রাইভার আছেন, হেলপার আছেন, তারা জীবিকা নির্বাহ করতে, পরিবার যেন চলতে পারে এবং তাদের ছেলে–মেয়ের লেখাপড়াসহ অবাধে যেন চলতে পারে, এই প্রত্যাশা রাখছি।

গত বৃহস্পতিবার থেকে পাঁচ দফা দাবিতে সাজেক সড়কে ইউপিডিএফ–সমর্থিত সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারী অ্যাসোসিয়েশনের ডাকা অনির্দিষ্টকালের এ অবরোধের সাজেকে বন্ধ রয়েছে যান চলাচল।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক মৎস্যসম্পদের সঠিক ব্যবহার কীভাবে
পরবর্তী নিবন্ধজাবেদসহ ৩৬ জনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ সমাপ্ত ঘোষণা