বঙ্গোপসাগরে মাছের পরিমাণ কমে গেলেও এক বুক আশা নিয়ে আজ মধ্যরাত থেকে সাগরমুখী যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছেন মৎস্যশিকারীরা। ২২ দিন বন্ধ থাকার পর আজ থেকে শুরু হচ্ছে সাগরে মাছ শিকার। এতে করে গত কদিন ধরে বাজারে চলা মাছের আকাল ঘুচতে শুরু করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। তবে কী পরিমাণ মাছ ধরা পড়বে তা নিয়ে সংশ্লিষ্টরা সংশয় প্রকাশ করেছেন। বছরের পর বছর বেপরোয়া মাছ শিকার, ক্ষতিকর পন্থায় মাছ ধরা, সামুদ্রিক আবাসস্থল ধ্বংস এবং জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা কারণে সাগরে মাছের উৎপাদন উদ্বেগজনক হারে কমে গেছে। গত অর্থবছরের দেশের ১৬ বছরের ইতিহাসে সব থেকে কম সামুদ্রিক মাছ আহরিত হয়েছে।
মৎস্য অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক মৎস্যসম্পদের বড় সম্ভাবনা থাকলেও তা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। দেশের সামুদ্রিক জলসীমার পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার। উপকূলীয় এলাকার দৈর্ঘ্য প্রায় ৭১০ কিলোমিটার। এই বিশাল জলসীমায় বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, পেলাজিক মাছ এবং গভীর সমুদ্রের সম্পদ রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের মাছ ধরার কার্যক্রমের বড় অংশ এখনো উপকূলসংলগ্ন ও অপেক্ষাকৃত অগভীর জলসীমায় কেন্দ্রীভূত।
অতিরিক্ত আহরণ, গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার সীমিত সক্ষমতা, ক্ষতিকর পন্থায় মাছ শিকার, মাছের মজুত সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং দুর্বল নজরদারির ফলে সাগরে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে উল্লেখ করে মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেছেন, একই জলসীমায় ক্ষুদ্র নৌযান ও বড় ট্রলারের প্রতিযোগিতা, নিষিদ্ধ এলাকায় মাছ ধরা এবং কার্যকর নজরদারির ঘাটতিতে মাছের উৎপাদন কমছে।
দেশের সাগরে ২০০৯–১০ অর্থবছরে মাছের উৎপাদন ছিল ৫ লাখ ১৭ হাজার টন। এরপর প্রতি বছর উৎপাদন বাড়ে। সর্বশেষ ২০২১–২২ অর্থবছরে দেশে সামুদ্রিক মাছের উৎপাদন গিয়ে ঠেকে ৭ লাখ ৬ হাজার টনে, যা দেশের সামুদ্রিক মৎস্যখাতের রেকর্ড হয়ে রয়েছে। এরপর থেকে টানা চার বছর সামুদ্রিক মাছের উৎপাদন কমছে। সর্বশেষ ২০২৫–২৬ অর্থবছরে মাত্র ৫ লাখ ১৫ হাজার টন সামুদ্রিক মাছ উৎপাদন হয়। যা গত ১৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে ২০২৩–২৪ অর্থবছরে সামুদ্রিক মাছের পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ২৮ হাজার ৬২৩ টন। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ছিল ৫ লাখ ৬৮ হাজার টন। পাঁচ বছরে বাংলাদেশের সামুদ্রিক মাছ আহরণ কমেছে ১৬.৫৭ শতাংশ।
সাগরে মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাব পড়ছে দেশের সব মানুষের উপর। এ খাতের উপর নির্ভরশীল ব্যবসায়ী এবং সাধারণ জেলেরা আর আগের মতো মাছ পাচ্ছেন না। বিশেষ করে উপকূলীয় জেলে পরিবারগুলো আর্থিক সংকট মোকাবেলা করছেন। তাদের জীবনযাত্রায়ও এর প্রভাব পড়ছে। শিল্পভিত্তিক ট্রলারের মালিকেরা খরচ পোষাতে হিমশিম খাচ্ছেন। অন্যদিকে মাছের যোগান কমে যাওয়ায় বাজারে মাছের দাম বেড়ে যাচ্ছে। এর যোগান দিতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ রক্ষায় কয়েকটি পদক্ষেপ নিলে বিশেষ সুফল পাওয়া যাবে। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরে মাছের মজুত নিরূপণে নিয়মিত বৈজ্ঞানিক জরিপ, শিল্পভিত্তিক ট্রলার ও ছোট নৌযানের মাছ ধরার এলাকা এবং পদ্ধতি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এছাড়া নিষিদ্ধ মৌসুম ও প্রজননক্ষেত্রে মাছ ধরা বন্ধে নজরদারি জোরদার করতে হবে।
এর পাশাপাশি অবৈধ ও ক্ষতিকর জাল ব্যবহার বন্ধ, সামুদ্রিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ, মাছ অবতরণকেন্দ্রে আহরণের তথ্য সংরক্ষণ এবং গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার উপযোগী প্রযুক্তি উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, সমুদ্রে ব্যাপকভাবে অবৈধ ট্রলিং বা ক্ষতিকর জালের ব্যবহার চলছে। একসময় গভীর সমুদ্রে চলাচলকারী বড় জাহাজে ট্রলিংয়ের ব্যবহার সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন কাঠের তৈরি ট্রলারেও অগভীর সমুদ্রে এ পদ্ধতিতে মাছ ধরা হচ্ছে। ট্রলিং জালে আকার ও প্রজাতি নির্বিশেষে সব ধরনের মাছ ধরা পড়ে। জালে আটকা পড়ার পর ছোট মাছগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মারা যায়। এতে সামুদ্রিক আবাসস্থল এবং মাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে।
কম মাছ পাওয়ায় অনেক জেলে ট্রলারের জ্বালানি, খাবারসহ সমুদ্রযাত্রার খরচও তুলতে পারছেন না। একসময় একটি বড় ট্রলার সাগরে গিয়ে দেড় থেকে দুই টন পর্যন্ত ইলিশসহ বিভিন্ন ধরনের মাছ নিয়ে ফিরত। এখন তা কমে গেছে। ইলিশের পরিমাণ আরো বেশি কমে গেছে উল্লেখ করে একজন ট্রলার মালিক বলেছেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা তেল পুড়িয়ে জাহাজ চলে, অথচ যে মাছ পাওয়া যায় তাতে খরচই ওঠে না। উপকূলীয় জেলেদের অবস্থা আরো শোচনীয়। তাদের মাছ আহরণের পরিমাণ কমে যাওয়ায় সামগ্রিক জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।











