‘অধিক (সম্পদ) লাভের পারস্পরিক প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে গাফেল করে রেখেছে, এমনি করেই (ধীরে ধীরে) তোমরা কবরের কাছে গিয়ে হাজির হবে’–সূরা আত্–তাকাসুর (আয়াত–১, ২)। দুনিয়ার সমগ্র মানবজাতির জন্য একমাত্র জীবন বিধান পবিত্র আল্–কোরআনে আকাশ–জমিনের একচ্ছত্র অধিপতি মহান আল্লাহ্তায়ালা এমনিভাবে অর্থলোভকারীদের উদ্দেশ্যে বর্ণনা করেছেন উপরোক্ত আয়াত। আমরা দুনিয়ার মানুষ অতি ব্যস্ত হয়ে পড়েছি, কেউ বা বিশাল বিশাল দালানকোঠা নির্মাণ প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত, শেয়ার বাজারে অর্থ বিনিয়োগে ব্যস্ত, ব্যবসা–বাণিজ্যে অধিক হারে পুঁজি বিনিয়োগে ব্যস্ত, কেউ বা সোনা কারবার, মাদক কারবার, ইয়াবা ব্যবসাসহ বিভিন্ন অবৈধ পথে উপার্জনের সব পথগুলো আঁকড়ে ধরে তা আয়ত্তে আনতে ব্যস্ত। একটু চিন্তা করুন, এখনই যদি আপনার মৃত্যু হয়–আপনি চলে যাবেন পরপারে। কবরের মুখোমুখি হবেন মুনকার–নাকিরের। কবর হল আখেরাতের প্রথম স্টেশন–এটিতে যদি আপনি পাশ মার্ক পেয়ে যান তবে পরবর্তী স্টেশনগুলো অনায়াসে পার পেয়ে যাবেন– এটি পবিত্র কোরআনের অমোঘ বিধান। আপনি কবরে নিয়ে যাবেন এক টুকরো সেলাইবিহীন শাদা কাপড়, যেমনিভাবে এ ধরনের শ্বেত, শুভ্র কাপড় পরিধান করে তাওয়াফ করেছিলেন পবিত্র বাইতুল্লাহ্ শরীফ। এ কবরে নেয়া হবে না দালান–কোঠার হিসাব, ব্যবসা–বাণিজ্যের হিসাব– শুধু নেয়া হবে জিন্দেগীর আমলের হিসাব, দুনিয়ার অর্থ সম্পদ কোন খাতে ব্যয় করেছেন? যৌবনকাল কিভাবে কাটিয়েছেন? অথচ শুধুমাত্র আল্লাহ্র বিধান কোরআনের মর্মকথা না বুঝার কারণে আমরা ছুটছি পাগলের মতন টাকার পেছনে। এখন সে টাকা আপনার জন্য বুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের প্রশাসনযন্ত্র চোখ মেলেছে, শুভবুদ্ধির উদয় হয়েছে–বিবেক তাড়নায় নড়ে চড়ে বসেছে।
সম্প্রতি ঢাকায় ক্যাসিনো বা জুয়ার আসর বসে এমন নামি–দামি ক্লাবগুলোতে অভিযান চালিয়ে প্রচুর জুয়ার সামগ্রী, মাদক, ইয়াবা, নগদ অর্থ জব্দ করেছেন। ইয়ংম্যান্স ক্লাব, ওয়ান্ডারার্স ক্লাব, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্র, আবাহনী ক্লাব, মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবসহ অনেকগুলো অভিজাত ক্লাব সীলগালা করে দিয়েছে র্যাব–পুলিশ। গ্রেফতার করা হয়েছে যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, জি কে শামীমসহ অনেক বিত্তশালী জুয়াড়ীদের। এই উদ্যোগকে বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের সাধুবাদ দেয়া উচিত। আজ যদি জি কে শামীম কিংবা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া–কে তার পিতা–মাতারা আল্–কোরআনের শিক্ষা দিতেন, নামাযের শিক্ষা দিতেন, সৎ পথে চলার পরামর্শ দিতেন তাহলে হয়তো তারা এ কুপথের সহযাত্রী হত না। ‘যে (কাঁড়ি কাঁড়ি) অর্থ জমা করে এবং তা গুণে রাখে, সে মনে করে, (তার এ) অর্থ তাকে (এ দুনিয়ায়) স্থায়ী করে রাখবে, না কখনো নয়, অল্প দিনের মধ্যেই সে নির্ঘাত চুর্ণ বিচূর্ণকারী আগুনে নিক্ষিপ্ত হবে, তুমি কি জানো, (এই) চুর্ণ বিচূর্ণকারী আগুন কেমন? (এ হচ্ছে সম্পদলোভীদের জন্যে) আল্লাহ্তায়ালার প্রজ্জ্বলিত এক আগুন, যা (এর দহন যন্ত্রণাসহ) মানুষের হৃদয়ের উপর পর্যন্ত পৌঁছে যাবে, (অগ্নিকুন্ডলির গর্ত বন্ধ করে) তাদের উপর ঢাকনা দিয়ে রাখা হবে, (তা গেড়ে) রাখা হবে উঁচু উঁচু থামের মধ্যে’ –সূরা আল্ হুমাযাহ (আয়াত ২–৯)। এ
ভাবেই পবিত্র কোরআনে আল্লাহ্তায়ালা সম্পদলোভীদের উদ্দেশ্যে হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করেছেন। ওদিকে যারা অবৈধ পথে সম্পদ অর্জন করে তাদের ব্যাপারে মক্কার কাফের আবু লাহাবকে উদ্ধৃত করে আল্লাহ্তায়ালা কোরআনুল করিমে বলেছেন, ‘তার ধন সম্পদ ও আয় উপার্জন তার কোন কাজে আসবে না।’ নিঃসন্দেহে যারা ক্যাসিনো বা জুয়ার আসর জমিয়ে হাজার হাজার মানুষকে পথে বসিয়েছে তারা সবাই ইসলামের দৃষ্টিতে গর্হিত কাজ করেছেন। এ সমস্ত জুয়া খেলায় শত শত মানুষ বিরাট অংকের টাকা হারিয়ে মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ে। অনেক সময় তারা আত্মহননের পথ বেছে নেয়। সংসারে দেখা দেয় বিশৃঙ্খলা ও স্বামী–স্ত্রীর পারস্পরিক মতবিরোধ। আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে সেই সত্তার কাছে– যাঁকে ঘুম তো দূরের কথা, সামান্য তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না। যিনি সৃষ্টিকূলের সব কিছুর উপর একক ক্ষমতাবান। যাঁর হাতে রয়েছে আসমান–জমিনের সার্বভৌমত্ব। প্রতিদিন ঘটছে সড়ক দূর্ঘটনা– যা একেবারেই অনাকাঙ্ক্ষিত। এ পথের যাত্রী তো আমিও হতে পারি–এ চিন্তাটা যদি আমাদের সবার মননে থাকত তাহলে উপরোক্ত অপরাধ সংঘটিত করা আমাদের কারো পক্ষে সম্ভব হত না। অতিব্যস্ত জীবন থেকে পালিয়ে সুশীতল গাছের ছায়ায় একটু আশ্রয় নিই। নিজের জীবনকে বুঝি, আখেরাতের জন্য বিনিয়োগ করি, মৃত্যুর কথা সদা–সর্বদা চিন্তা করি। পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের জামাতে শামিল হই। বেশি বেশি সৎ কর্ম করি আর আল্–কোরআনের সেই কঠিন আয়াতের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করি, ‘আজ আমি তাদের মুখের উপর মোহর মেরে দেব, তাদের হাতগুলো (এখন) আমার সাথে কথা বলবে, তাদের পা–গুলো সাক্ষ্য দিবে (দুনিয়ায়) তাঁরা যা কিছু অর্জন করেছিল।’
– সূরা ইয়াসীন (আয়াত– ৬৫)
লেখক: সভাপতি, রাউজান ক্লাব, জুনিয়র কনসালটেন্ট (ইএনটি), জেনারেল হাসপাতাল, রাঙামাটি










