এখন চলছে মাহে রমজানের শেষ পর্ব নাজাতের দশক। রোজাদারদের জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করাই মাসব্যাপী সিয়াম সাধনার বড় উদ্দেশ্য।
মাহে রমজানের একটি করণীয়ও যেন ছুটে না যায় রোজাদারকে সেদিকে সজাগ থাকতে হবে। এ মাসে সিয়াম সাধনা ও ইবাদত বন্দেগিতে মানুষের অংশগ্রহণের নানা নিয়ম পদ্ধতি নির্ধারিত। অজ্ঞতা বা ভুলবশত রোজার নিয়ম–পদ্ধতির ব্যতিক্রম চর্চা যে কারো দ্বারা সংগঠিত হতেই পারে। ভুল–বিচ্যুতির মার্জনা লাভের নানা উপায় সুনির্দিষ্টভাবে শিখিয়ে দিয়েছেন উম্মতের করুণাধারা মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ্ (সা.)। উম্মত কিভাবে পরিত্রাণ চাইবে তা প্রিয় নবীজীকে (সা.) কুরআনের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ্ পাক। জীবন চলার পথে কৃত অপরাধ ও ভুল–বিচ্যুতির দায় এড়াতে পবিত্র কুরআনে অনুশোচনার ধরণ ব্যক্ত হয়েছে এভাবে ‘ রাব্বানা জালামনা আনফুসানা, ওয়া ইললাম তাগফির লানা ওয়া তারহামনা, লানাকু–নান্না মিনাল খাসিরিন’ -‘হে প্রভু আমি নিজ আত্মার ওপর অবিচার করেছি, তুমি যদি আমাকে ক্ষমা না কর তবে আমি ক্ষতিগ্রস্তই থেকে যাবো’ আল্লাহ্র কাছে এভাবে প্রার্থনা জানালে প্রত্যুত্তর আসে– ‘ইন্নাল্লাহা গাফুরুর রাহিম’– ‘বান্দারা নিশ্চয়ই জেনে রাখো তোমার প্রভু আল্লাহ্ তো অতিশয় ক্ষমাশীল ও দয়ালু।’ কুরআন মজিদের অন্য একটি আয়াতে মানুষের যাবতীয় অপরাধের নিষকৃতির অব্যর্থ দিক নির্দেশনা পেশ করে আল্লাহ্ পাক বলেন, ‘ওয়ালাও আন্নাহুম ইজ্ জালামু আন্ফুসাহুম জাউকা ফাস্তাগফারুল্লাহা ওয়াস্ তাগ্ফারা লাহুমুর রাসূলু লাওয়াজাদুল্লাহা তাওয়াবার রাহিমা– ‘তোমাদের কেউ যখন নিজের ওপর জুলুম করে বসবে তোমরা আল্লাহ্র কাছে পরিত্রাণ চাইবে এবং প্রিয় রাসূলের (সা.) শরণাপন্ন হবে, তিনি যদি তোমাদের ক্ষমা করেন তবে অবশ্যই আল্লাহ্র ক্ষমা ও অনুগ্রহের আশা রাখতে পার।’ মাহে রমজানে পুণ্যের সুযোগ ও হাতছানি অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। রোজা নামাজের হুকুম–পদ্ধতি যথার্থভাবে পালনে আমরা হয়তো ব্যর্থ হয়েছি। আমাদের কথাবার্তা, উঠা বসা, চলাফেরা ও জীবনাচারে রোজার দিনগুলোতে বহু অনিয়ম ও ভুল–বিচ্যুতি যে সংঘটিত হয়েছে তা তো ধরেই নিতে পারি। পাপের কারণে জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তির দুঃসংবাদে আমরা বিচলিত হই, অনুতপ্ত হই, কৃত অপরাধ থেকে মার্জনা কিভাবে সম্ভব তা ভেবে হতাশ হয়ে পড়ি। এই হতাশা ও অনুশোচনা যতোই তীব্র হবে ততোই মঙ্গল। বলা হয়েছে ‘আন্ নাদামাতু তাওবাতুন’– অনুশোচনাই হচ্ছে তাওবা। সচরাচর আমরা দেখি যে, ভুলের জন্য লজ্জিত অনুতপ্ত ও দুঃখবোধ করলে যে কেউ তাকে রেহাই দিতে পারে। আর আল্লাহ্র কাছে অনুশোচনাই বেশি পছন্দনীয়। প্রিয় নবী (সা.), আউলিয়া কেরামের উসিলায় যখন কেঁদে কেঁদে আল্লাহ্র কাছে কৃত পাপরাশির ক্ষমা চাওয়া হয় তখন আল্লাহ্ পাক বলেন– ইন্নাল্লাহা তাওয়াবার রাহিমা– ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক মানুষের তাওবা গ্রহণে অতিশয় দয়ার্দ্র।’
রোজার ভুল–বিচ্যুতির দায় থেকে রক্ষা পেতে আল্লাহ্ পাক আমাদের সামনে সাদ্কাতুল ফিতর বা ফিতরা আদায় অত্যাবশ্যকীয় করেছেন। ফিতরা প্রদান করা ওয়াজিব। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত: রাসূল(সা.) জাকাতুল ফিতরকে রোজাদারের বেহুদা কথা ও কাজ এবং পাপ থেকে পবিত্র করা এবং নিঃস্ব অসহায় মিসকিনদের খাবারের উদ্দেশ্যে ওয়াজিব করেছেন। যে ব্যক্তি তা ঈদের নামাজের পূর্বে আদায় করে সেটি আল্লাহ্র কাছে কবুল হয়। আর যে ব্যক্তি তা ঈদের নামাজের পর আদায় করে তা অন্যান্য দান সদকার মতো বিবেচিত হবে (আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, হাকেম)। এবার ইসলামিক ফাউন্ডেশন ফিতরার সর্বনিম্ন হার নির্ধারণ করেছে জনপ্রতি ১১৫ টাকা। অন্য দিকে দেশের শীর্ষস্থানীয় দ্বীনি সংস্থা আন্জুমান–এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়ার শরিয়া বোর্ড ফিতরার হার নির্ধারণ করেছে ১২৫ টাকা। আবার কোনো কোনো ইসলামী প্রতিষ্ঠান থেকে ফিতরার হার ১২০ টাকা দিতে বলা হয়েছে। ১১৫, ১২০ বা ১২৫ টাকার মধ্যে বেশি পার্থক্য নেই। সামর্থ্যানুযায়ী উক্ত যে কোনও একটি হারে ফিতরা প্রদান করলে তা আদায় হয়ে যাবে। মনে রাখতে হবে সদ্কা–ফিতরা গরীবের হক। তাই গরীবরা যাতে হাসিখুশিতে রোজা ও ঈদের আনন্দে শামিল হতে পারে সেদিকেই দৃষ্টি রেখে জনপ্রতি ৫০/৬০ টাকা করে না দিয়ে একজনকে একটি ফিতরা কিংবা পুরো পরিবারের ফিতরা একজন গরীবকে প্রদান করা উত্তম। জাকাত–ফিতরা ইত্যাদি গরীববান্ধব কর্মসূচি দেয়া হয়েছে গরীবরা যাতে সচ্ছল জীবনযাপন করতে পারে এই উদ্দেশ্যে। তাই, জাকাত–ফিতরা এমনভাবে বণ্টন করতে হবে যাতে এই বছর যাকে জাকাত–ফিতরা দেওয়া হয়েছে আগামী বছর সে আর জাকাত নিতে আসবে না। জাকাত–ফিতরার টাকায় গরীবের ভাগ্য বদলে দিতে হবে।













