সিটি কর্পোরেশন ও সিডিএসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করলে আগামী বর্ষায় নগরের জলাবদ্ধতা ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করেন সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। সমন্বিতভাবে কাজ করায় গত বছর জলাবদ্ধতা ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কমেছে বলেও দাবি করেন তিনি। এ সময় মেয়রকে আশ্বস্ত করে সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. নুরুল করিম বলেন, মেয়রের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত প্রচেষ্টায় চলতি বছরই জলাবদ্ধতা উল্লেখযোগ্য হারে; প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে আসবে।
গতকাল মঙ্গলবার বিকালে টাইগারপাসে নগর ভবনের অস্থায়ী কার্যালয়ে জলাবদ্ধতা বিষয়য়ক সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। বক্তব্য রাখেন সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. নুরুল করিম। এছাড়া বিভিন্ন সেবা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় পরিষ্কারের পরও খাল–নালা দ্রুত ভরাট হওয়ার জন্য কয়েকটি কারণ উঠে আসে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, ভ্রাম্যমাণ হকারদের ফেলা ফলমূলসহ বিভিন্ন বর্জ্য খাল–নালায় ফেলা। এছাড়া রাস্তার পাশে বালি, ইট ও নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখা; যা ড্রেনেজ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর মধ্যে বালি খাল ভরাটের জন্য অন্যতম দায়ী। এসব সমস্যা নিরসনে যারা খাল–নালায় আবর্জনা ফেলছে এবং রাস্তায় নির্মাণসামগ্রী রাখে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেন মেয়র। একইসঙ্গে হকারের বিষয়ে সহযোগিতা চান সিএমপির। এছাড়া বর্ষায় দুর্ঘটনা এড়াতে খালের পাড়ে নিরাপত্তা বেষ্টনী, তালিকা করে স্ল্যাব দেওয়া এবং ম্যানহোলে ঢাকনা নিশ্চিত করতে জোর দেওয়া হয়। বর্ষার আগে সিডিএকে হিজরা খাল ও জামালখান খালের কাজ শেষ করা এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডকে তাদের চলমান প্রকল্পভুক্ত স্লুইচগেট নির্মাণ কাজ শেষ করতে বলেন।
ডা. শাহাদাত বলেন, নগরে প্রায় ১,৬০০ কিলোমিটার ড্রেন এবং অসংখ্য খাল রয়েছে, যা নিয়মিত পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ করার উদ্যোগ নিয়েছে চসিক। ১৬শ কিলোমিটার ড্রেন পরিষ্কারে আমরা বাজেট পেয়েছি। ইতোমধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছি। এছাড়া চসিকসহ বর্তমানে চারটি সংস্থা জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে এবং সময়মতো সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করলে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন সম্ভব হবে।
ফুটপাত দখলমুক্ত করতে যৌথ অভিযানের প্রস্তাব : সভায় মেয়র বলেন, ভ্রাম্যমাণ হকাররা যত্রতত্র বর্জ্য নিক্ষেপ করে, যা অন্যতম প্রধান সমস্যা। নালা ও খালগুলো পরিষ্কার করার পরও হকারদের কারণেই সেগুলো বারবার ময়লায় ভরে যাচ্ছে। নিউ মার্কেট, স্টেশন রোড এবং চকবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় হকাররা ফলমূলের অবশিষ্টাংশ ও অন্যান্য বর্জ্য সরাসরি রাস্তায় বা নালায় ফেলছে, যা জলাবদ্ধতা সৃষ্টিতে বড় ভূমিকা রাখছে।
মেয়র হকারদের বিষয়ে সিএমপির সক্রিয় সহযোগিতা কামনা করেন এবং পুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের রাস্তার শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব নেওয়ার অনুরোধ জানান। একইসঙ্গে কাউকে হাতেনাতে ময়লা ফেলতে দেখলে তাৎক্ষণিকভাবে জরিমানা ও কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তিনি ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ প্রশাসনকে নির্দেশ দেন। এছাড়া যারা রাস্তার পাশে বালি, ইট ও নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা ব্যবস্থা নিতে চসিকের ম্যাজিস্ট্রেটদের নির্দেশ দেন।
এ সময় সিএমপির উপ–পুলিশ কমিশনার (ডিসি, ট্রাফিক–উত্তর) নেছার উদ্দীন আহমেদ পুলিশ এবং সিটি কর্পোরেশনের ম্যাজিস্ট্রেটরা যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে রাস্তা ও ফুটপাত দখলমুক্ত করার প্রস্তাব দেন।
মেয়র বলেন, পাহাড় ক্ষয় ও মাটি ধসে খাল ভরাট হওয়া আরেকটি বড় সমস্যা। এ বিষয়ে প্রকৌশলী ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক সমাধান প্রয়োজন। পাহাড় কাটার বিষয়েও নজরদারি বাড়াতে হবে।
ডা. শাহাদাত বলেন, নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্ল্যাব ও ম্যানহোলের ঢাকনা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো নাগরিক যেন দুর্ঘটনার শিকার না হন তা নিশ্চিত করতে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। বড় নালা ও খালের পাশে যেখানে সুরক্ষা দেয়াল নেই, সেখানে অস্থায়ী হলেও নিরাপত্তা বেষ্টনী দিতে হবে। আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা ও ম্যাজিস্ট্রেটদের উদ্দেশে তিনি বলেন, বর্ষার আগে প্রতিটি এলাকায় ভাঙা বা অনুপস্থিত স্ল্যাব ও ম্যানহোলের ঢাকনার তালিকা প্রস্তুত করে দ্রুত মেরামত সম্পন্ন করতে হবে। পাশাপাশি বড় নালা ও খালের পাশে যেখানে সুরক্ষা দেয়াল নেই, সেখানে অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে বাঁশ বা অন্যান্য উপকরণ দিয়ে নিরাপত্তা বেষ্টনী নির্মাণ করতে হবে।
তিনি বলেন, আমি নিজেও প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে ১১টা পর্যন্ত মাঠপর্যায়ে তদারকি করছি। এ সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়মিত পরিদর্শন ও ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার নির্দেশ দেন।
সভায় পলিথিনে খাল–নালা ভরাট হয়ে থাকা নিয়েও আলোচনা হয়। এ বিষয়ে শাহাদাত বলেন, শুধু পলিথিন নিষিদ্ধ করলেই হবে না, এর বাস্তবসম্মত ও সহজলভ্য বিকল্প নিশ্চিত করতে হবে। বাজারে বিকল্প পণ্য না থাকলে নিষেধাজ্ঞা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে পাটজাত ব্যাগসহ পরিবেশবান্ধব বিকল্প উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
তিনি বলেন, পলিথিনের কারণে নগরের খাল–নালা ও ড্রেন দ্রুত ভরাট হয়ে জলাবদ্ধতা তীব্র আকার ধারণ করছে। ফলে প্রতি বছর বিপুল অর্থ ব্যয় করেও স্থায়ী সমাধান পাওয়া যাচ্ছে না। তাই পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
মেয়র পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্পের অধীন দক্ষিণ হালিশহর, বন্দরটিলা ও নয়াহাটসহ বিভিন্ন এলাকায় স্লুইচগেট নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করতে নির্দেশ দিয়ে বলেন, বর্ষার আগে কাজ সম্পন্ন না হলে বিকল্প পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে জনগণ ভোগান্তির শিকার না হয়।
কে কী বললেন : সিডিএর চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. নুরুল করিম বলেন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) বাস্তবায়িত জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের প্রায় ৯৫ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সম্পন্ন করেছে এবং অবশিষ্ট ৫ শতাংশ কাজ দ্রুত শেষ করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তিনি বলেন, প্রকল্পের আওতায় ৩৬টি খাল খনন কার্যক্রমের মধ্যে অধিকাংশের কাজ শেষ হলেও হিজরা খাল ও জামালখান খালের কিছু অংশের কাজ এখনো বাকি রয়েছে, যা দ্রুত সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সিডিএর জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মুহসিনুল হক বলেন, আগামী ৩০ এপ্রিলের মধ্যে খাল থেকে ময়লা পরিষ্কার করা হবে। ইতোমধ্যে ৭৫ শতাংশ শেষ হয়েছে। তিনি জামালখান ও হিজরা খাল নির্দিষ্ট সময়ে শেষ হবে বলে জানান।
চসিকের সচিব মো. আশরাফুল আমিন জলাবদ্ধতা নিরসনে নালা খাল থেকে পিডিবি, কর্ণফুলী গ্যাস ও ওয়াসাসহ বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যক্তির স্থাপিত পিলার, দেয়াল, পাইপ অপসারণ জরুরি বলে মন্তব্য করেন এবং নবনির্মিত রাস্তা না কেটে চসিকের সাথে সমন্বিতভাবে কাজ করার জন্য ওয়াসার প্রতিনিধিকে অনুরোধ জানান।
সভায় উপস্থিত ছিলেন চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী, চসিকের প্রধান প্রকৌশলী আনিসুর রহমান, চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলম, পিডিবির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী একেএম মামুনুল বাশরি, মেয়রের জলাবদ্ধতা বিষয়ক উপদেষ্টা শাহরিয়ার খালেদ এবং বন্দর, পানি উন্নয়ন বোর্ড, জেলা পরিষদসহ বিভিন্ন সেবা সংস্থার প্রতিনিধিরা।














