চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে গ্রাফিতিতে ‘ছাত্র’ মুছে দিয়ে ‘গুপ্ত’ লেখা নিয়ে ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সকালে ও বিকালে দুই দফায় কলেজ ক্যাম্পাস ও নিউ মার্কেট এলাকায় এ সংঘর্ষ হয়। এ সময় ধাওয়া–পাল্টা ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এতে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় নিউ মার্কেটসহ আশপাশের এলাকা। সংঘর্ষ চলাকালে উভয় পক্ষের কয়েকজনের হাতে ধারালো অস্ত্র, লোহার রড ও লাটিসোঁটা দেখা গেছে। সংঘর্ষে দুই পক্ষের ৩০–৪০ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। তাদের বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। উভয়ে সংঘর্ষের জন্য একে অপরকে দায়ী করে।
এদিকে কলেজ প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সংঘর্ষের জেরে কলেজের স্বাভাবিক কার্যক্রম কিছুটা ব্যাহত হয়। দুপুরের পর থেকে কলেজের সব অভ্যন্তরীণ ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। তবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চলমান ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষ ও মাস্টার্সের পরীক্ষা নির্ধারিত সময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সংঘর্ষে সাধারণ শিক্ষার্থী, পরীক্ষার্থী এবং পথচারীদের মধ্যে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। আতংকে বন্ধ হয়ে যায় দোকানপাট। সাময়িকভাবে বন্ধ ছিল যান চলাচলও।
ছাত্রদলের দাবি, ছাত্রশিবির পরিকল্পিতভাবে তাদের ওপর হামলা করে। এতে সিটি কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি সোহেল সিদ্দিকী রনি, যুগ্ম আহ্বায়ক ইসমাইল ভুইয়া, মেহরাজ, নাজিম, মিরাজ, রেশাদ, মাসফিসহ অনেক নেতা আহত হয়ে নগরের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। এদিকে ছাত্রশিবিরের দাবি, ছাত্রদল তাদের উপর হামলা চালিয়েছে। এতে ৩০ জন আহত হন। এর মধ্যে আশরাফুল ইসলাম, মাহমুদুল হাসান, ফয়সালসহ চারজনকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আহত আশরাফুল পাহাড়তলী ওয়ার্ড ছাত্রশিবিরের সভাপতি। তার পায়ের গোড়ালি কেটে গেছে।
উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ ক্যাম্পাস কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) নিয়ন্ত্রণে ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে ক্যাম্পাসটি রাজনীতিমুক্ত করার ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে সে বছর কমিটি দেয় ইসলামী ছাত্রশিবির। আগে কমিটি থাকলেও ৫ আগস্টের পর সক্রিয় হয় ছাত্রদল।
সংঘর্ষ যেভাবে শুরু : সরকারি সিটি কলেজের একটি ভবনে জুলাই–আগস্টের গ্রাফিতির নিচে লেখা ছিল ‘ছাত্র রাজনীতি ও ছাত্রলীগমুক্ত ক্যাম্পাস’। সোমবার রাতে কলেজ শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুল্লাহ আল মামুনের নেতৃত্বে কয়েকজন নেতাকর্মী গিয়ে ‘ছাত্র’ শব্দটি মুছে দিয়ে লিখে দেন ‘গুপ্ত’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এটা পোস্ট করলে কমেন্ট–পাল্টা কমেন্টে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এর জের ধরে গতকাল সকালে কলেজ ক্যাম্পাসে বাগবিতণ্ডায় জড়ায় দুই পক্ষ। এরপর দুপুর ১২টার দিকে দুই পক্ষ মুখোমুখি অবস্থান নিয়ে পাল্টাপাল্টি স্লোগান দেয়। একপর্যায়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে তারা। এতে উভয় পক্ষের কয়েকজন আহত হন। পুলিশ ও কলেজ প্রশাসনের হস্তক্ষেপে দুপুরে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়।

দুপুরের ঘটনার প্রতিবাদে বিকাল ৪টার দিকে নিউ মার্কেট মোড়ে বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দেয় ছাত্রশিবির। নিউ মার্কেট মোড় থেকে মিছিল নিয়ে তারা কলেজ ক্যাম্পাসের দিকে যায়। সেখানে আগে থেকে অবস্থানে ছিল ছাত্রদল। শিবিরের মিছিল আইস ফ্যাক্টরি রোডে পৌঁছুলে ধাওয়া–পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। দ্বিতীয় দফার এ সংঘর্ষে ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। মূলত দ্বিতীয় দফার সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় নিউ মার্কেট এলাকা। এ সময় আতংকে ছুটোছুটি করেন পথচারীরা।
এদিকে সংঘর্ষের খবর ছড়িয়ে পড়লে নগরের বিভিন্ন এলাকা থেকে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা নিউ মার্কেট মোড়ে জড়ো হন। পরে তারা মিছিল নিয়ে কলেজের সামনে অবস্থান নেন এবং বিভিন্ন স্লোগান দেন। সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানে তাদের অবস্থান দেখা গেছে।
সরকারি সিটি কলেজের উপাধ্যক্ষ জসীম উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, গ্রাফিতির লেখা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে ডাকা হয়। পরে কলেজের সব ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত করা হয়।
মহানগর (দক্ষিণ) ইসলামী ছাত্র শিবিরের প্রচার সম্পাদক জাহিদুল আলম জয় আজাদীকে বলেন, কলেজে আমরা কিছু গ্রাফিতি এঁকেছিলাম। সেগুলোতে ছাত্রদল বিভিন্ন ধরনের উস্কানিমূলক কথাবার্তা লিখে নষ্ট করে দিয়েছে। আমাদের ভাইয়েরা অনলাইনে প্রতিবাদ জানিয়েছিল। আজকে (মঙ্গলবার) সকালে আমাদের কর্মীরা কলেজে যাওয়ার পর তাদের উপর বিনা উস্কানিতে ছাত্রদল হামলা চালিয়ে কয়েকজনকে আহত করেছে। তিনি বলেন, আহত চারজনকে পার্কভিউ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পাহাড়তলী ওয়ার্ড ছাত্রশিবিরের সভাপতি আশরাফুল ইসলামের পায়ের গোড়ালি কেটে ফেলেছে তারা। এছাড়া আমাদের ৩০ জন আহত হয়েছেন।
নগর ছাত্রদলের সভাপতি এস এম সাইফুল আলম আজাদীকে বলেন, সকালে ছাত্রশিবির অতর্কিতভাবে ছাত্রদলের কর্মীদের উপর হামলা চালিয়েছে। ‘গুপ্ত’ লিখলে তাদের সমস্যা কী। তারা ‘গুপ্ত’ না হয়ে থাকলে জ্বলে কেন? ছাত্রশিবির ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চলমান পরীক্ষা যেন না হয়। ছাত্রশিবিরের হামলায় ছাত্রদলের ১১/১২ জন আহত হয়েছে।
চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি সৌরভ প্রিয় পাল আজাদীকে বলেন, শিবিরের নেতাকর্মীরা কলেজ ক্যাম্পাসে ঢুকে হামলা চালিয়েছে। আমাদের নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।
নগর পুলিশের উপকমিশনার (দক্ষিণ) হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূঁইয়া সাংবাদিকদের বলেন, এক পক্ষ নিউ মার্কেট থেকে মিছিল নিয়ে সিটি কলেজের দিকে গেলে অন্য পক্ষের মুখোমুখি হয়। তখন ঘটনাটা ঘটেছে। উভয় পক্ষে আহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন। আহতদের হাসপাতালে নিতে বলেছি। ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন আছে। এলাকার পরিস্থিতি এখন শান্ত। দুই পক্ষের নেতাদের বলেছি, আপনারা নিজেরাই কথা বলে বিরোধটা মিটিয়ে ফেলেন। এটা নিয়ে আর কোনো ঘটনা যেন না হয়।














