সত্যের অপলাপ

শরাফী | সোমবার , ৬ জুলাই, ২০২৬ at ৫:১৫ পূর্বাহ্ণ

শুনেছি আপনাদের একটা মেয়ে আছে। আমাদেরও একটা ছেলে আছে। তাই আমরা এসেছি আপনাদের মেয়ের সাথে আমাদের ছেলের শুভ বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে। আল্লাহর হুকুম থাকলে, আপনাদের অনুমতি পেলে, আমরা প্রস্তাবটা নিয়ে এগুতে পারি।

এসব হচ্ছে বিগত প্রায় পাঁচ দশক আগের সামাজিকভাবে বিয়েশাদীর পদ্ধতি। এধরনের পদ্ধতিতে, মুরুব্বিদের খুশিমতো, চয়েজমতো নিয়মকানুন মেনে বিয়েশাদী হয়েছে বলে নবদম্পতির সারাজীবন কেটেছে সুখেশান্তিতে আলহামদুলিল্লাহ। বলতে গেলে লাখে একটা দম্পতি যৌতুকের রোষাণলে পতিত হয়ে কিংবা অন্যান্য অহেতুক দাবীদাওয়া নিয়ে সারাজীবন তুষের আগুনের মত জ্বলতে হয়নি। শেষমেশ ফাঁসির রশিতে ঝুলতে হয়নি। নদীতে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়নি। মাবাবার আদরের দুলারি পরের ঘরে সংসার করতে গিয়ে বিষপানে আত্মবিসর্জন দিতে হয়নি।

সেকালের মেয়েদের আত্মসম্ভ্রম নিয়ে বেঁচে থাকতে হতো বলে তাদের কদর ছিলো বেশি। বরপক্ষকে কনে ঘরে তোলা পর্যন্ত সামাজিকভাবে প্রথাগত নিয়মকানুন মেনে চলতে নাকানিচোবানি পোহাতে হয়েছে। কনে ঘরে না আসা অবধি বরপক্ষকে নানা আলোচনাসমালোচনা সামাল দিতে গিয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করতে হয়েছে। মোবাইল থেকে শুরু করে নানা তথ্যপ্রযুক্তির অনুপস্থিতিতে উভয়পক্ষের মতামতের গরমিলের কারণে অনেক সময় বিয়ের আসর থেকে বরপক্ষকে রিক্তহস্তে ফিরতে হয়েছে। বিয়ের দিন বরযাত্রীসহ কনে বাড়ির সীমানায় পৌঁছানো অবধি দুধদই, পানসুপারি, মণ্ডামিঠাই, উঠান খরচসহ নানাবিধ খরচ সামলাতে বরপক্ষকে শারীরিকআর্থিকভাবে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হতো।

কনেবাড়ির বিয়ের আসরে পৌঁছার প্রায় এক কিলোমিটার দূর থেকে হয়রানির দ্বিতীয় ধাপ শুরু হতো। সেখানে বাঁশ দিয়ে বরসহ বরযাত্রী আটকে মোটা অঙ্কের চাহিদাদাবী, স্টেজের মুখে ফিতা টেনে শ্যালকশালিকার চাহিদা পূরণ, স্টেজে আসন নেওয়া মাত্র বরকে ফুলের মাল্যদানের পাওনা, এরপর ভুড়িভোজন শেষে কনে বুঝিয়ে দেওয়ার আগে মায়মুরুব্বী, নানানানি, দাদাদাদি লেভেলের চাহিদা মেটানো পর্যন্ত বরপক্ষের হয়রানির শেষ হতো না। এরমধ্যে আরো কিছু সামাজিকতা নামীয় হয়রানি লেখনীতে বাদ যাচ্ছে বলে পাঠকপাঠিকারা আশা করি নিজ গুণে ক্ষমা করে দিবেন।

এখন ধরা যাক হাল জমানার বাস্তবতার তিক্ত অভিজ্ঞতা। সরষের ভিতর ভূত থাকার খবর কেউ রাখে না বলে বর্তমান যমানার দাম্পত্য জীবনের বেহাল দশা। বর্তমানে মুরুব্বি কিংবা শুভাকাঙ্ক্ষীর মহলে আশাআকাঙ্ক্ষার গুঁড়েবালি। এখন তো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেমিয়া বিবি রাজি, ক্যায়া করেঙ্গা কাজি অবস্থা। যার ফলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ঘটছে সারাজীবন মনোমালিন্য থেকে শুরু করে জীবন বলি দেওয়ার পাশবিক ঘটনা। পত্রপত্রিকায় এধরনের পাশবিকতা পাঠে নিজ জীবনের ভবিষ্যৎ চিন্তা করলে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার শামিল। যাকে জীবনসংগীনী হিসেবে গ্রহণ করেছি, তার সাথে হিংস্র জানোয়ারের চেয়ে জঘন্যতম আচরণ অমনুষ্যত্ব বইকি। স্বেচ্ছায় প্রাণপ্রিয় অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে ঘরে এনে তার সাথে স্বামীসহ শাশুড়ি, ভাইবোন মিলে পৈশাচিক আচরণ, শেষ নাগাদ মৃত্যুর পথে ঠেলে দেওয়ার মতো জঘন্যতম পিশাচের বিচার আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। আদালতের বিচারে এসব অপরাধীর বিচার ফাঁসির রশিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর কিংবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড উপযুক্ত শাস্তি বলে লেখকের ধারণায় লঘু মনে হচ্ছে। বরঞ্চ জনাকীর্ণ রাজপথে জনসমক্ষে চলন্ত গাড়ির পিছনে বেঁধে টেনেহিঁচড়ে মৃত্যু কার্যকরকে উপযুক্ত শাস্তি বলে লেখক মত ব্যক্ত করেছেন।

পত্রিকান্তরে অনেক ক্ষেত্রে তথাকথিত মৌলানা কিংবা ইমাম নামধারী চাটুকার পাপীরা এধরনের পাশবিকতার শিরোনাম হচ্ছে, আস্তাগফিরুল্লাহ। মাদ্রাসায় কিংবা আল্লাহর ঘর মসজিদে ধর্মীয় শিক্ষার দীক্ষা দিতে গিয়ে মুসলমান নামীয় চাটুকার জানোয়ারের খপ্পরে ফেরেশতারূপী নিষ্পাপ শিশুকিশোরের জীবনাবসানের কথা ভেবে নিজকে মনুষ্য না হয়ে পশু হওয়াই শ্রেয় মনে হচ্ছে। আর এদের কৃতকর্মের শাস্তি আরো জঘন্যতম হলে পাঠকপাঠিকার মনে শান্তি পাবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচুনতির জীববৈচিত্র্য রক্ষা করুন
পরবর্তী নিবন্ধসৃজনশীল পরিকল্পনা হোক যুবসমাজ রক্ষার মূল ভিত্তি