আঁধারের পাহাড় সরিয়ে যখন শহর জেগে ওঠে, তখন রাস্তার মোড়ে যে মানুষটি প্রথম কেটলির আগুন জ্বালায়, অথবা ভোরের নিস্তব্ধতায় যে ঝাড়ুদার তার ঝাড়ুর ঘর্ষণে রাস্তা পরিষ্কার করে নতুন দিনের সূচনা করে–তাদের ওপর দাঁড়িয়েই টিকে আছে আমাদের এই বিশাল রাষ্ট্র। আমরা উন্নয়নের কথা বললে প্রথমেই চোখ চলে যায় মেগা প্রকল্পের কংক্রিট বা স্টিলের কাঠামোতে, কিংবা জিডিপির প্রবৃদ্ধির গাণিতিক হিসাবে। কিন্তু উন্নয়নের এই বিশাল মহাকাব্য যে আসলে কোটি কোটি মানুষের ঘাম, শ্রম এবং নিঃশব্দ পদচারণায় লেখা, সেই সত্যটি আমরা প্রায়শই এড়িয়ে যাই। রাষ্ট্র যখন উন্নয়নের স্বপ্ন দেখে, তখন সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের রূপকাররা আসলে তারা নন, যারা এসি রুমে বসে নীল নকশা আঁকেন; বরং তারা সেই মানুষ, যাদের নাম ইতিহাসের পাতায় খুঁজে পাওয়া দুষ্কর, যাদের ছবি সাইনবোর্ডে জায়গা পায় না। অথচ আমাদের প্রতিদিনের যাপিত জীবনের প্রতিটি পরতে মিশে আছে তাদের শ্রমের অণু–পরমাণু।
একটি রাষ্ট্রের অবকাঠামো কেবল রড–সিমেন্টের মিশ্রণ নয়, এটি মূলত মানুষের পারস্পরিক নির্ভরতার এক গভীর অংকশাস্ত্র। সকালে অফিসে যাওয়ার সময় যে রাস্তাটি আমরা ব্যবহার করি, সেই পিচঢালা পথ তৈরির পেছনে যে শ্রমিকের ঘাম ঝরেছে, যে প্রকৌশলীর বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রম বিনিয়োগ হয়েছে, কিংবা যে ট্রাকচালক দূর থেকে পাথর এনেছেন–তাদের প্রত্যেকের জীবনের গল্প ওই রাস্তার প্রতিটি ধুলিকণায় মিশে আছে। সমাজ ব্যবস্থায় আমরা পেশাকে বিভিন্ন উচ্চতা দিয়ে পরিমাপ করি, যা এক গভীর মানসিক বিভ্রম। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, প্রতিটি পেশা হলো একটি চেইন–লিংকের মতো; কোনো একটি লিঙ্ক ছিঁড়ে গেলে পুরো ব্যবস্থার ভারসাম্য নষ্ট হয়। অথচ যখন আমরা পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পেশাকে নিচু চোখে দেখি, তখন আসলে আমরা পুরো সামাজিক কাঠামোর স্বাস্থ্যকেই অসুস্থ করে তুলি। একটি শহর যদি একদিনের জন্য তার আবর্জনা অপসারণ না করে, তবে কি আমাদের তথাকথিত ‘আধুনিক’ জীবনযাত্রা সচল থাকে? সুতরাং পরিচ্ছন্নতাকর্মী কি কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ? এই বোধটি আমাদের জাতীয় চারিত্রিক গঠনে থাকা জরুরি।
উন্নয়ন ও অবকাঠামোর স্বরূপ বুঝতে হলে আমাদের তাকাতে হবে সেইসব মানুষের দিকে, যারা প্রযুক্তির অভাবকে জয় করে তাদের কায়িক শ্রমে সভ্যতাকে আগলে রেখেছেন। কৃষক–যিনি রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে আমাদের অন্নের জোগান দেন–তার চেয়ে বড় অবকাঠামো নির্মাতা আর কে হতে পারেন? তিনি কেবল খাদ্য উৎপাদন করছেন না, তিনি একটি জাতির মেরুদণ্ড সোজা করে রাখছেন। যদি কৃষকের উৎপাদিত পণ্য বাজারে না পৌঁছাত, তবে কি কোনো শিল্প বা কোনো কর্পোরেট হাউসের চাকচিক্য বজায় থাকত? তাহলে কেন তাদের উন্নয়নের মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করার পরিবর্তে কেবল পরিসংখ্যানের খাতায় আটকে রাখি?
রিকশাচালক থেকে শুরু করে অফিসের ক্লার্ক, কিংবা ছোট দোকানদার থেকে গার্মেন্টস কর্মী–প্রত্যেকের কাজের সাথে মানবিকতার একটি অদৃশ্য সুতো জড়িয়ে আছে। যখন একজন ব্যবসায়ী সততার সাথে তার পণ্য বিক্রি করেন, তখন তিনি সমাজের ওপর যে আস্থা স্থাপন করেন, সেটিই উন্নয়নের আসল ভিত। যখন একজন সরকারি কর্মকর্তা ফাইল আটকে না রেখে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করেন, তখন তিনি দেশের অর্থনীতির গতিপথকে সচল রাখেন। এখানে নৈতিকতা কেবল একটি শব্দ নয়, এটি উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। আমরা যদি অবকাঠামো তৈরি করি কিন্তু মানুষের চারিত্রিক অবকাঠামো না গড়ি, তবে সেই দালানগুলো খুব দ্রুতই ধসে পড়বে–কখনো দুর্নীতিতে, কখনো অযত্নে, কখনো বা অব্যবস্থাপনায়।
বর্তমান সময়ের উন্নয়নের সংজ্ঞা এখন অনেক বদলে গেছে। আগে মনে করা হতো, রাস্তাঘাট বা বড় ভবন মানেই উন্নয়ন। এখন বিশ্বব্যাপী উন্নয়নের নতুন মানদণ্ড হলো ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল’ বা মানবসম্পদ উন্নয়ন। এই মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন প্রত্যেকের কাজের প্রতি সম্মান। যখন সমাজের সর্বস্তরের মানুষ অনুভব করবেন যে, তার কাজটি দেশের জন্য একটি ছোট হলেও অপরিহার্য অবদান, তখন তার মধ্যে এক ধরনের আত্মসম্মানবোধ জাগ্রত হয়। এই আত্মসম্মানবোধই পারে একটি জাতিকে ভেতর থেকে বদলে দিতে। আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, একজন শিক্ষক যখন শ্রেণিকক্ষে একটি শিশুকে মূল্যবোধ শেখান, তিনি আসলে কত বড় অবকাঠামো নির্মাণ করছেন? তিনি তো ইটের দালান বানাচ্ছেন না, তিনি বানাচ্ছেন আগামীর মানুষ, যারা ভবিষ্যতে সেই বড় বড় দালানগুলো শাসন করবে, পরিচালনা করবে।
উন্নয়ন ও অবকাঠামোর এই মহাকাব্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘আন্তঃনির্ভরশীলতা’। আমরা সবাই একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। একজন আইটি বিশেষজ্ঞের জন্য যেমন তার কম্পিউটারটি জরুরি, তেমনি তার ইন্টারনেট সংযোগ ঠিক রাখার জন্য যে লাইনম্যান মাঠে কাজ করছেন, তিনিও জরুরি। আমাদের সমাজে এই পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ যখন কমে যায়, তখন উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। আমরা যখন একে অপরকে ছোট করে দেখি, তখন আমরা আসলে নিজেরাই নিজেদের উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াই। উন্নয়নের জন্য যে ঐক্য প্রয়োজন, তা কেবল স্লোগান দিয়ে হয় না; তা হয় পরস্পরের পেশার প্রতি শ্রদ্ধার মাধ্যমে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বোঝা যায়, বড় বড় কর্পোরেট হাউসের চেয়ে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প আমাদের অর্থনীতিতে যে অবদান রাখছে, তা অভাবনীয়। গ্রামের একজন তাঁতি, কামার বা কুমোর–তারা যে পণ্য উৎপাদন করেন, তা যেমন সংস্কৃতির অংশ, তেমনি অর্থনীতিরও অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমরা এদের ‘অতীত’ মনে করে ভুল করছি। প্রযুক্তির এই যুগে এদের সাথে যদি আধুনিক কৌশলের সমন্বয় ঘটাতে পারি, তবেই আমাদের অর্থনীতি আরও মজবুত হবে। অবকাঠামো মানে কেবল হাইওয়ে নয়, অবকাঠামো হলো গ্রামের সেই কুটির শিল্পের সাথে শহরের বাজারের সংযোগ। এটিই প্রকৃত উন্নয়ন, যা সবার ঘরে ঘরে সুফল পৌঁছে দেবে।
মানবিক উন্নয়নের আরেকটি দিক হলো প্রতিকূলতাকে জয় করার মানসিকতা। আমাদের দেশের শ্রমজীবী মানুষ প্রতিকূলতার সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকতে অভ্যস্ত। বন্যার সময় যে কৃষক ফসল রক্ষার জন্য দিনরাত পরিশ্রম করেন, কিংবা অতিমারীর সময় যে পরিবহন শ্রমিক ঝুঁকি নিয়ে পণ্য সরবরাহ করেছেন–তাদের এই সাহস ও দায়বদ্ধতাও উন্নয়নের অংশ। আমাদের জাতীয় নীতিনির্ধারণে এই মানুষেরা প্রায়শই উপেক্ষিত থাকেন। বড় বড় বাজেটে বড় বড় প্রকল্পের ফিরিস্তি থাকে, কিন্তু প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নয়নের সেই সূক্ষ্ম বিষয়গুলো অনেক সময় হারিয়ে যায়। একটি দেশ তখনই উন্নত হয়, যখন দেশের সর্বশেষ ব্যক্তিটি অনুভব করেন যে, এই দেশের উন্নয়নে তারও অংশীদারত্ব আছে।
ভবিষ্যতের বাংলাদেশের কথা ভাবলে আমাদের উন্নয়ন দর্শনকে পুনর্গঠন করতে হবে। আমাদের অবকাঠামো উন্নয়ন হতে হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক। এটি এমন হতে হবে যেখানে একজন রিকশাচালকও নিজেকে উন্নয়নের অংশীদার মনে করবেন।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক, শিক্ষক














