মে দিবস ২০২৬ : বাংলাদেশের শ্রমিক শ্রেণির বিদ্যমান অবস্থা

তপন দত্ত | শুক্রবার , ১ মে, ২০২৬ at ৯:৫৬ পূর্বাহ্ণ

মে দিবসের বয়স দেখতে দেখতে ১৪০ বছর হয়ে গেল, ১৪ দশক। আমাদের ছয় জেনারেশন আগের ঘটনা, এই দীর্ঘ প্রায় দেড়শত বছরে শ্রমজগতের বহু পরিবর্তন হলো। বলদে টানা লাঙ্গল থেকে এখন কম্পাউন্ড হারভেস্টিং মেশিনে কৃষিকাজ সম্পন্ন হচ্ছে। কৃষি মজুরের সংখ্যা অনেক কমছে। কৃষি ব্যবস্থা অর্ধেক বেশি কাজ এখন যান্ত্রিক হওয়ার ফলে আমাদের কৃষিতে উদ্বৃত্ত শ্রমিক সৃষ্টি হচ্ছে। গ্রামেগ্রামে প্রান্ত পর্যন্ত বিদ্যুৎ সমপ্রসারণ, যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়নের ফলে গ্রামে শহরে এখন মানুষের কাজের ক্ষেত্র কমে যাচ্ছে। কিছু বিকল্প ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। তাতেও কিছু লোকের কর্মসংস্থন হচ্ছে। শ্রম বাজারে প্রতিবছর ১৫ লক্ষ শ্রমশক্তির প্রবেশ ঘটছে। দেশের কর্মসংস্থানের তুলনায় শ্রমশক্তির প্রায় ৩ গুণ হওয়ায় বেকার বাড়ছে অগণিত। শিল্প এলাকায় ঘুরে হতাশ হয়ে নানা অসামাজিক কার্যকলাপে কাজ প্রত্যাশী মানুষ জড়িয়ে পড়ছে। সমপ্রতি মব সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ, ‘জোর যার মুল্লুক তার’ এই মাৎস্যান্যায় আমাদের দেশে চালু হয়েছে।

শ্রমশক্তি শ্রমবাজারের প্রয়োজনের তুলনায় তিনগুণ হওয়ায় পুঁজির মালিক শ্রমিক আইন না মেনে, ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের আইন না মেনে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম মজুরি দিয়ে শ্রম কিনে নিচ্ছে। ‘গোঁদের উপর বিষ ফোঁড়ার’ মত প্রতিযোগিতার বাজারে আইনসঙ্গত ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার দিন দিন খর্ব হতে চলেছে। ফলে শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার সুযোগ ক্ষীয়মান, সংগঠিত শিল্পশ্রমিকের তুলনায় অসংগঠিত ক্ষেত্রে শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। আমাদের দেশ নয় শুধু পৃথিবীর দেশে দেশে এই অধিকার আরও সংকুচিত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

১৯৭১ সালে রক্ষক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশে শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যা ছিল কোটির নিচে। শিল্পে ৮৬ ভাগ ছিল রাষ্ট্রীয় মালিকানায়। পাটশিল্প, ব্যাংক, বীমা, চিনি, সুতা, চা, বন্দর, রেল ইত্যাদি ছিল প্রধান শিল্প সেক্টর। অবাঙালি মালিকানাধীন কিছু চা বাগানসহ পাট, বস্ত্র, চিনি, ব্যাংক, বীমা সবকিছু রাষ্ট্রীয় মালিকানায় চলে আসে। শুধু তাই নয়, শ্রমশক্তির ৮৬ ভাগ ছিল সংগঠিত খাতে, মাত্র ১৪ ভাগ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। এখন প্রাতিষ্ঠানিক খাতে শ্রমশক্তির মাত্র শতকরা ১৫ ভাগ আর অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে শ্রমশক্তির শতকরা ৮৫ ভাগ, অর্থাৎ স্বাধীনতার মূল মর্মবাণী শোষণহীন সমাজব্যবস্থা থেকে ক্রমান্বয়ে একটা শ্রমশোষণমূলক সমাজব্যবস্থায় দাঁড়িয়ে গেল। এর ভিত্তি এখন খুবই শক্ত, নব বিকশিত সস্তা শ্রমনির্ভর গার্মেন্টস, বেসরকারি মালিকানায় হাজার হাজার হাসপাতাল, ডায়গনস্টিক সেন্টার, বিশাল এক নির্মাণখাতসহ অনেকগুলি প্রাতিষ্ঠানিক, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে প্রচুর পুঁজির বিনিয়োগ হয়েছে। ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার থাকলেও কার্যত এসব ক্ষেত্রে ট্রেড ইউনিয়ন করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। পাক আমলে ১৯৬৯ এর শিল্প সম্পর্ক অধ্যাদেশএ কিছুটা ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার প্রদান করা হয়। শ্রম অধিদপ্তরের অনেক কর্মকর্তা তা স্বীকার করেন। ১৯৭৬ সালে জারিকৃত অর্ডিনেন্সের বলে এক কলমের খোঁচায় আইআরও ৬৯ বাতিল হলো। বিচারপতি কুদ্দুসকে চেয়ারম্যান করে গঠিত কমিশন শ্রমিক আইন তৈরি করে একের পর এক। দীর্ঘ ২০০ বছরে অর্জিত অধিকারযা শ্রমজীবী মানুষের জীবন দেওয়া রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, কারা নির্যাতন ভোগ করে, যে আন্দোলন ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের অধিকার আদায়ের রক্তক্ষয়ী লড়াই করে ক্রমান্বয়ে গণতান্ত্রিক শ্রমআইন প্রতিষ্ঠিত করেছেসে নিম্নতম অধিকারগুলোও কেড়ে নেওয়া হলো নতুন অধ্যাদেশে যা পরবর্তীতে ২০০৬ সালে সংসদে কয়েক ঘণ্টার আলোচনায় পাস হয়ে যায়। মাননীয় বিচারপতি শ্রমিকদের প্রতি সুবিচার করলেন না। তিনি ঢাকা, চট্টগ্রামসহ কয়েকটি জেলায় শ্রমিক নেতাদের সাথে মতবিনিময় করলেন। দীর্ঘদিনের আইএলও কনভেনশন উপেক্ষা করে বাংলাদেশে বহিরাগতরা ট্রেড ইউনিয়ন কর্মকর্তা নির্বাচিত হতে পারবেনা মর্মে ট্রেড ইউনিয়ন আইনের গণতান্ত্রিক অধিকারের বারোটা বাজিয়ে দিলেন।

১৯৭৬ সালে আরেকটি অর্ডিন্যান্সে চাশিল্পে জাতীয় ইউনিয়ন করার বাধ্যবাধকতা করে দিলেন, পূর্বের ব্যবস্থায় বাগান ভিত্তিক, জেলা বা ভ্যালি ভিত্তিক ইউনিয়ন করার অধিকার ছিল। ফলে ইউনিয়নের একধরনের প্রতিযোগিতা ছিল। এই অডিন্যান্স জারির ফলে বাদী বা মালিকের পোঁ ধরার সুবিধা হয়। এখন ৮ বছর ধরে শ্রীমঙ্গল ভিত্তিক লেবার হাউসের নেতৃত্বের নির্বাচন দেওয়া হচ্ছে না অথচ এই নেতারা চা শ্রমিক সংগ্রাম কমিটির নামে অনির্বাচিত নেতৃত্বের হাত থেকে চা শ্রমিকদের নির্বাচন দিতে বাধ্য করেছিল। ‘যে যায় লঙ্কায়, সে হয় রাবণ’এখনকার নেতৃত্ব ৮ বছর কাটিয়ে দিল তারেনারে করে তবে চা শ্রমিকরা প্রচণ্ড ভাবে অসন্তুষ্ট ও ক্ষোভে ফেটে পড়ছে নির্বাচনের দাবিতে। লেবার হাউস নেতৃত্ব শ্রীমঙ্গল লেবার হাউসে সীমাবদ্ধ, চা বাগান মালিক সমিতি চেয়ারম্যানের পরামর্শে আমি নির্বাচনের জন্য কিছুদিন চট্টগ্রাম, শ্রীমঙ্গল, ঢাকা দৌড়ঝাঁপ করেছি। তৎকালীন সচিব মহোদয় ও ডিজি মহোদয় দুজনেই সজ্জন ব্যক্তি, কোন ধরনের বিলম্ব না করে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করেন নির্বাচনের জন্য। কিন্তু শ্রম উপদেষ্টা মহোদয় সব পরিকল্পনায় জল ঢেলে দিলেন। তিনি মন্ত্রণালয়ের সচিবকে নিয়ে শ্রীমঙ্গল শ্রম দপ্তরে সভা ডাকলেন। আমাকেও সে সভায় ডাকা হলো। শ্রমিকদের সাথে আগের দিন ১৬ মে সভা করে পরদিন ১৭ মে ইউনিয়নের নেতাদের সাথে বসলেন। উপদেষ্টা মহোদয় ছিলেন সর্বশেষ বক্তা। আমাকে সর্বপ্রথম বলতে বললেন সচিব মহোদয়। আমি নির্বাচন, মজুরি বৃদ্ধির কথা বললাম। সর্বশেষ বক্তা উপদেষ্টা মহোদয় জুন মাসে পিক সিজনে নির্বাচন হবে না বলে এককভাবে জানিয়ে দিলেন। আমরা হতবাক। একজন শ্রমিক নেতা বললেন, নিলামে চায়ের দাম না বাড়ালে মালিকরা বেতন বাড়াতে পারবেনা। উপস্থিত কিছু নেতা এ ওর মুখ চাওয়া শুরু করলেন। সবাই হতবাক হলেন শ্রমিক নেতার কথায়।

আরেকটি দৃষ্টান্তঅতঃপর ওই বছরের ১৯৯৬ সালে শুরু হয়ে গেল আরেক তেলেসমাতি কারবার। এক এগারোর শ্রম সচিব চট্টগ্রাম এসে যুগ্ম পরিচালকের দপ্তরে এক অভিনব প্রস্তাব উত্থাপন করলেন। সারমর্ম হলো, বন্দরে এক ইউনিয়ন থাকবে। সে সভায় প্রায় ৪০ জন নেতা উপস্থিত, আমারও উপস্থিত থাকার সুযোগ হয়েছিল। আমিই প্রথম বললাম, এক দেশে দুই আইন কেন হবে সচিব মহোদয়। আরও কেউ কেউ মৃদু আপত্তি জানালেন। অধিকাংশই নীরব। বন্দরের নেতারাও উপস্থিত ছিলেন, সচিব মহোদয় নীরব হয়ে গেলেন। পরে ঠিক ঠিক সেই আইনটি পাস হলো। প্রথমে অর্ডিন্যান্স, পরে সংসদে পাস, সেই থেকে কত সরকার এসেছে, কোন সরকার এ চরম অগণতান্ত্রিক, আইএলও কনভেনশন ৮৭, ৯৮ বিরোধী একটি কলঙ্কিত আইন রদ করেনি। এই যে শ্রমিক শ্রেণির অর্জিত অধিকার কেড়ে নিয়ে একে একে চরম শ্রমিক স্বার্থবিরোধী কতকগুলো আইন পাস হলোকই, স্বাধীনভাবে কোন রাজনৈতিক দল কোন আপত্তি করেনি, নানা সরকার, প্রশাসন ক্ষমতার জন্য পরস্পরের লড়াই কাদা ছোঁড়াছুড়ি অব্যাহত রেখেছে। স্বজনতোষী অর্থনীতির মাধ্যমে পুঁজি পাচার করা, ভিন্ন কায়দায় শ্রম শোষণের মাধ্যমে একদল বিশাল পুঁজির মালিক তৈরি করে নিজেদের আখের গোছানো। এই হচ্ছে পুঁজি, মালিক ও অগণতান্ত্রিক সরকারের যৌথ কারসাজি।

চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালনায় আমেরিকান তাঁবেদার কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দিতে অতীতের নানা সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোকে চাপ দিয়েছে। স্বৈরাচারী হাসিনা সরকার বন্দর পরিচালনা বিদেশিদের হাতে তুলে দিতে চেয়েছিলো। শেখ হাসিনা তিন বার নিজেদের ইচ্ছামতো নির্বাচন করে শাসন কুক্ষিগত রাখতে চেষ্টা করেছে। স্কপ ও বন্দরের শ্রমিকদের নেতৃত্বে আন্দোলনের মুখে ইউনূস সরকার ডিপি ওয়ার্লডকে বন্দরের পরিচালনা বিদেশীদের হাতে তুলে দিতে ব্যর্থ হয়েছে। হাসিনা ও ইউনূসের সরকার ব্যর্থ হওয়ার পর নতুন নির্বাচিত সরকার এটা উপলব্ধি করবে এবং বন্দর পরিচালনা বিদেশীদের হাতে তুলে দেবে নাএই আশা শ্রমিক জনতার।

বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষের গণতান্ত্রিক ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার না থাকার ফলে এবং বিশ্ব কর্পোরেট পুঁজির পরামর্শে তাদের স্বার্থ ও সুবিধা রক্ষার্থে শ্রমিকের অধিকার হরণ করছে নিয়োগকর্তা। এর ফলে কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়া, বেকারদের সংখ্যা বৃদ্ধি, দক্ষ শ্রমিক সৃষ্টি না হওয়া, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাজনিত শ্রম শক্তি তৈরি না হওয়া, তদুপরি চাকুরিচ্যুতি, কম মজুরি ইত্যাদি বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তুলছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারেচাবাগান শ্রমিকদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান প্রসঙ্গআইনে আছে ৭৫০ জন শ্রমিক থাকলে ১জন এমবিবিএস ডাক্তার রাখতে হবে। কিন্তু তা নেই, দুই এক জায়গায় থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে কম্পাউন্ডার, হাতুড়ে ডাক্তার ভরসা। প্রতিটি বাগানে প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকবে, কিন্তু অধিকাংশ বাগানে তা নেই, বাসস্থানের ব্যাপারে বলা আছে প্রতিটি পরিবারকে ৪৮ বর্গ গজের (৪২৫ বর্গফুট) বাসস্থান দেবার কথা, অথচ অধিকাংশ শ্রমিক থাকে ঝুপরি ঘরে। অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক গঠিত শ্রম সংস্কার কমিশনে চাবাগানে ৫ মাসের মধ্যে ভুমি সংস্কার আইন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে, কোনো কাজ হয়নি।

শোভন ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ :

আন্তর্জাতিক আইন (আইএলও) এবং দেশীয় আইনে শ্রমিককর্মচারীদের নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও ঝুঁকিমুক্ত কর্মপরিবেশের কথা বলা হয়েছে। কার্যত তা হয়নি। তাজরীন ও রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর গার্মেন্টস সেক্টরে কিছু কাজ হয়েছে। পরিবেশসম্মত বেশ কিছু গার্মেন্টস কারখানা ভাল পরিবেশের জন্য আন্তর্জাতিক পুরস্কারও পেয়েছে। নিরাপদ কর্মপরিবেশের জন্য শিল্পের স্থানীয়করণ জরুরি। অপ্রাতিষ্ঠানিক নানা খাতে দুর্ঘটনা বেশি। সম্প্রতি গ্যাস সিলিন্ডার দুর্ঘটনা ব্যাপক রূপ নিয়েছে।

জাহাজভাঙ্গা শিল্প ও নির্মাণ সেক্টরে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি। এ সকল ক্ষেত্রে মালিক ও মালিক প্রতিষ্ঠানের উদাসীনতা প্রকট। পরিবহন সেক্টরে দুর্ঘটনায় যাত্রী, পথচারী ও পরিবহন শ্রমিকের মৃত্যু দিন দিন বেড়ে চলেছে। আমাদের দেশে বেসরকারি স্বাস্থ্যখাত দিন দিন বড় হচ্ছে। এ খাতে কর্মচারীদের আইনের সীমানার বাইরে অতিরিক্ত কাজ করানো হয়, ৩০ বছর আগে এ খাতে নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত থাকলেও মালিক ও সরকারের নজর নেই। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে ৮৬ শতাংশ শ্রমিক কর্মচারীর কর্মঘণ্টা, মজুরি, ধর্মঘটের অধিকার একেবারেই উপেক্ষিত। তদুপরি ট্রেড ইউনিয়ন করতে গেলে চাকুরিচ্যুতি, দালাল মাস্তান দিয়ে নির্যাতনমারপিট নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আউট সোর্সিং, ক্যাজুয়েল শ্রমিক দিয়ে বছরের পর বছর কাজ করানো, চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক নিয়োগএ সবের ফলে বেকার তরুণরা কাজ পাচ্ছে না, তারা হতাশ হচ্ছে। চাহিদামতো, সকল ক্ষেত্রে আইন অনুসারে নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। রেল, বন্দর, ডক, চাবাগান, বেসরকারি, স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান সর্বত্রই ঠিকা নিয়োগের মহোৎসব চলেছে। এর অবসান হওয়া সময়ের দাবি।

আমাদের শ্রমশক্তির এক বড়ো অংশ নারী। সরকারিবেসরকারি প্রতিষ্ঠান, কারখানায়, গ্রামীণ কুটির শিল্প, কৃষি উৎপাদন, কৃষিসহায়ক শিল্পে নারীদের শ্রম গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু তাদের সামগ্রিক কাজের মূল্যায়ন হচ্ছে না। তদুপরি আছে মজুরি বৈষম্য, কর্ম পরিবেশ তাদের জন্য সহায়ক নয় অনেক ক্ষেত্রে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে মাতৃত্বকালীন ছুটি ৬ মাস, কিন্তু বেসরকারি ক্ষেত্রে তা ৪ মাসএটি বৈষম্য। নারীদের অধিকার, ন্যায্য মজুরি প্রদান, তাদের শ্রমের মূল্যায়ন আবশ্যক।

একটি জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের অন্যতম শর্ত জনগণের মৌলিক ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য সব চাহিদা পূরণ করে তাদের জীবনকে স্বস্তিদায়ক করে তোলা। কিন্তু আমাদের দেশে অধিকাংশ শ্রমজীবী, কৃষিজীবী, নিম্নবিত্ত, সাধারণ মানুষের জীবনের মৌলিক চাহিদা পূরণ স্বপ্নমাত্র। অথচ সমাজের সকল উপকরণ, অবকাঠামো, সমাজ ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিসকল ক্ষেত্রেই তাদের শ্রমমেধা ও ভূমিকা রয়েছে।

প্রায় দেড়শ বছর আগে ১৮৮৬ সালে শিকাগোর হে মার্কেটের প্রতিবাদ সভায় শ্রমজীবী মানুষ ৮ ঘন্টা কাজের দাবিতে, ৮ ঘন্টা করে বিশ্রাম ও বিনোদনের দাবিতে আত্মদান, করেছেতাদের সেই প্রত্যাশা আজও পূরণ হয়নি। কর্মঘন্টার বেশি সময় মালিক তাদের খাটায়, বিশ্রাম, বিনোদনের বিষয় তাদের অধরা। অনবরত জীবন সংগ্রামে তাদের সকল আশাস্বপ্নের পরিসমাপ্তি ঘটে। এর অবসান হওয়া সভ্যতা ও মানবতার স্বার্থেই প্রয়োজন।

লেখক : সহসভাপতি, কেন্দ্রিয় কমিটি, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, ঢাকা, সভাপতি, চট্টগ্রাম জেলা কমিটি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধশ্রমজীবী মানুষ : উন্নয়নের অঘোষিত কারিগর
পরবর্তী নিবন্ধজুম’আর খুতবা