মে দিবসের আলোকে নারীর শ্রম ও কিছু কথা

ড. আনোয়ারা আলম | বৃহস্পতিবার , ৩০ এপ্রিল, ২০২৬ at ৬:৩১ পূর্বাহ্ণ

গ্রিক শব্দ Marius থেকে মের উৎপত্তি। দেবী মেইয়া কে প্রাচুর্য ও প্রবৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে মানতো। কারণ এই মাস হচ্ছে তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের মাস তথা ফসলের মওসুম। আর এই মে মাসের প্রথম দিন আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস বা মহান মে দিবস। প্রায় দেড়শত বছর আগে তাদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে সূচিত হয়েছিল নারী ও পুরুষ উভয়ের বিজয়ের ধারা।

একজন শ্রমিকের অধিকার বা দাবি হলোতার ন্যায্য মজুরি। কিন্তু দেশে দেশে তখন মালিকেরা তাদের নানা শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন চালিয়ে দাসের মতো ব্যবহার করতেন। শুধু তাই নয়অতিরিক্ত কাজ ও চাপিয়ে দেওয়া হতো। অতঃপর বিন্দু বিন্দু জমে থাকা ক্ষোভের বিপরীতে জন্ম নেয়, বিদ্রোহ। একটা সময়ে জন্ম নেয় বিশ্বের প্রথম ট্রেড ইউনিয়ন ফিলাডেলফিয়ার মেকানিক ইউনিয়ন। পরবর্তী তে ধাপে ধাপে বিভিন্ন আন্দোলন ও সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে দৈনিক আট ঘণ্টা কাজ করার দাবি স্বীকৃতি পায়। এখন প্রশ্নটা এসে যায়নারী শ্রমিকের স্বীকৃতি এখনো পর্যন্ত সেভাবে অর্জিত হয়েছে কি! বিশেষত বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে। নারীর শ্রম ঐতিহাসিক পর্যায় থেকে আজ অব্দি নানাভাবে স্বীকৃতি পায়নি। যদি গৃহস্থালি শ্রমের কথা বলি তাহলে একজন নারী সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত আপাদমস্তক একজন শ্রমিক। কিন্তু এই ক্ষেত্রে নারী যেন দাসেরও দাস।

কৃষি খাতে নারী যেমন শ্রম দেয়তেমনই পোশাক, খনি, নির্মাণ, চা বাগান সহ নানাখাতে। বি বি এস এর তথ্যানুযায়ী২০২২ শ্রমশক্তি জরীপ অনুযায়ী পোশাক খাতে মোট লোকবল ৪৩ লাখ ১৯ হাজার নারী শ্রমিক আশির দশকে এর উত্থানে রফতানি শিল্পের এক স্বর্ণদ্বার খুলে গেলেও এরপরে শুধুই বঞ্চনার ইতিহাস। লিঙ্গবৈষম্য, যৌন হয়রানি, কণ্ঠরোধ, অসম মজুরি সহ নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে শ্রম বাজারে নারীরা পিছিয়ে যাচ্ছেন ক্রমশ।

নারী শ্রমিক শব্দটি তৃতীয় বিশ্বে এবং অবশ্যই বাংলাদেশে বহুল প্রচলিত শব্দ। গভীর বেদনার হলেও সত্যিযে পোশাক শিল্পের নারী শ্রমিকদের ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে তাদের জীবনের একটা দিক শুধু অন্ধকার। মাতৃত্বকালীন নারীদের কৌশলে ছাঁটাই করা হয় ব্যয় সংকোচনের নামে। বেশি দিন যারা কাজ করেনতাদের ও কৌশলে ছাঁটাই করা হয়।

এর বাইরে আমরা জানি নারী শ্রমিকেরা এখন দেশের বাইরে কাজ করে বৈদেশিক মুদ্রা আনছেন। কিন্তু সেখানে ও নানাভাবে লাঞ্চিত ও বঞ্চিত এবং নানাভাবে এতটা নির্যাতিত হনকখনো কখনো তাদের মৃতদেহ আসে দেশে।

এমনকি যে পরিবারের জন্য তাদের এই আত্মত্যাগ সেখানে ও চরম বঞ্চনার শিকার হন।

মে দিবসের আলোকে বলতে হয়শ্রমিকদের কিছু নির্দিষ্ট অধিকার ও প্রয়োজন থাকে। নারীর জন্য এটি আরও বেশি প্রয়োজনীয়। বাংলাদেশ কর্তৃক অনুসরণকৃত আই এল ওর সাতটি কনভেনশনে নারী শ্রমিকের অধিকারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এছাড়াও বাংলাদেশের শ্রম আইন ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৮) এর ৯৩,৯৪,৯৫ ধারা অনুযায়ী নারী শ্রমিকদের জন্য বিশ্রাম কক্ষ বা শিশু দিবা যত্ন কেন্দ্র রয়েছে। মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয়মাসের বলা হলেও খুব কমই তাদের দেওয়া হয়। আনুষ্ঠানিক খাতে উচ্চ পদে বৈষম্য কম হলেও অনানুষ্ঠানিক খাতেই বৈষম্য বেশি। দক্ষতা ও প্রযুক্তির দিকেও নারী শ্রমিকেরা পিছিয়ে আছেন।

মে দিবসের আলোকে বলতে হয়নারীর শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। নারী এক্ষেত্রে আত্ম পরিচয়ের একটা সংকট আছে। অনেক ক্ষেত্রে নারী নিজের শ্রমকে নিজেই অস্বীকার করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় মানসিক চাপ। এটি নারীর জন্য এক বিপরীত মূল্যবোধের সীমাবদ্ধতার বহিঃপ্রকাশ। যার জন্য পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্র দায়ী। এক্ষেত্রে স্বীকৃতি ও দৃষ্টিভঙ্গীর ইতিবাচক পরিবর্তন দরকার। নারীর শ্রম নিঃশব্দ ত্যাগ এর যথাযথ মূল্যায়ন প্রয়োজন।

মে দিবসের আলোকে নারী শ্রমিকের গৃহস্থালি কাজের স্বীকৃতি প্রয়োজন কর্মক্ষেত্রে নারী শ্রমিকের নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি ও সম্মান নিশ্চিত করা মে দিবসের মূল বার্তা হওয়া দরকার। এছাড়া নিরাপদ কর্মপরিবেশ বা কর্মক্ষেত্রে শারীরিক হয়রানি বড়ো একটা চ্যালেঞ্জ এটি অবশ্যই বন্ধ করার ক্ষেত্রে কঠোর আইনের যথাযথ প্রয়োগ প্রয়োজন।

পরিশেষে মে দিবসের আলোকে বলতে হয়ন্যায্যতার ভিত্তিতে দেশের শ্রম নীতি ঢেলে সাজাতে হবে। জাতীয় ন্যূনতম মজুরি যথাযথ হতে হবে। শ্রমঘন এলাকায় শ্রম আদালত প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শ্রমিকদের পেশাগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। কল কারখানায় নারী শ্রমিকের প্রসূতিকালীন ছুটিসহ শিশু যত্নাগারের ব্যবস্থা করতে হবে।।

শিশু শ্রম বন্ধ করতে হবে। আই এল ও কনভেনশন ৮৭ ৯৮ এর পূর্ণ বাস্তবায়ন করে সব পেশায় অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিকের প্রতি মালিকের সহনশীল মনোভাব থাকতে হবে। যদি মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে সহযোগিতামূলক মনোভাব থাকে তবে সেই প্রতিষ্ঠান সাবলীল ভাবে এগিয়ে যেতে পারে।

মে দিবসের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও গুরুত্ব অনুধাবন করে দেশের সব শ্রমিক পরিপূর্ণ মর্যাদা পাবে সেই প্রত্যাশা করছি।

লেখক: প্রাবন্ধিক, শিক্ষাবিদ; সাবেক অধ্যক্ষ, আগ্রাবাদ মহিলা কলেজ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকীর্তিমানদের জীবনের জয়গান
পরবর্তী নিবন্ধশরীয়ত-ত্বরীক্বতের মহান পথ প্রদর্শক সৈয়্যদ আহমদ শাহ্‌ সিরিকোটি (রহ.)