রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পদক ২০২৬ প্রদান’ অনুষ্ঠানে গিয়ে কিছু কিছু অনুভূতি মনে দাগ কেটেছে। রাষ্ট্রীয় প্রোগ্রামে প্রটোকল নিয়মকানুনের বাইরে যাওয়া যায় না। অনুষ্ঠানের আসন বিন্যাস তৈরি করা ছিল। যেখানটায় স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্তদের পরিবারবর্গ বসার নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে বসলাম, স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত দাদা ড. সুকোমল বড়ুয়ার পরিবারের সদস্য হিসেবে। আমার পাশে বসেছিলেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর পরিবার ম্যাডাম শিরিন হক ও তাঁর কন্যা। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী মরণোত্তর পেয়েছেন। তাই তাঁর ছেলে পদক গ্রহণ করবেন, তিনি পদকপ্রাপ্তদের সাথে সামনে বসেছিলেন। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বাড়ি চট্টগ্রামে। আমার সামনে বসেছিলেন চট্টগ্রামের রাঙামাটি ও কাপ্তাই উপজেলার জন্মজাত বিখ্যাত টেনিস খেলোয়াড় জোবেরা রহমান লিনুর পরিবার। আমার বাড়ি চট্টগ্রাম তাই চট্টগ্রামের স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত দুই কৃতী পরিবারকে পাশে পেয়ে খুব গর্ব অনুভব করছিলাম। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী সম্পর্কে তো অনেক কিছু লেখা যায়।
যা আমার মনে দাগ কেটেছে তা হলো মিস জোবেরা রহমান লীনু ও তাঁর মমতাময়ী মাকে নিয়ে। লীনুর মা ও তাঁর পরিবার যখন আসন গ্রহণের জন্য উঠে আসছিলেন তখনই আমার দৃষ্টি কেড়ে নেয়। বয়স্ক অথচ শান্ত সৌম্য সুদর্শনা একজন মমতাময়ী মাকে দুজন দুদিক থেকে ধরে ধরে তুলছিলেন। আমি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম আমার সামনের আসনে বসতে। ঠিক আমার সামনের আসনে বসলেন তিনজন। এরপর আসলেন প্রিয় মানুষ হানিফ সংকেতের পরিবার। তাঁরাও পাশে বসলেন আামার সামনের আসনে। সিঁড়ি দিয়ে উঠার সময়েই আমার হানিফ সংকেতের সঙ্গে কথা হয়, শুভেচ্ছা বিনিময় হয়। পরে হানিফ সংকেত পুরস্কার প্রাপ্তদের আসন থেকে উঠে এসে নিজের পরিবারের সাথে দেখা করতে আসলে আমরাও ছবি তুললাম। হানিফ সংকেতের বড় ছেলে অত্যন্ত বিনয়ী, তিনিই আমাদের ছবি তুলে দিলেন। কারণ তখনো অনুষ্ঠান শুরু হতে প্রায় চল্লিশ মিনিট বাকি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আসার নির্দিষ্ট সময় হয়নি, আরও গণ্যমান্য অতিথিরাও আসার বাকি ছিল। মোবাইল চেক করে ভিআইপিদের নিতে দিয়েছিল সেই একটা বড় সুযোগ ছিল নিজেরা ছবি তোলার।
কিন্তু পাশের লীনুর পরিবারের তিনজন খুব চুপচাপ বসেছিলেন। মনটা আঁকুপাঁকু করেছিল একটু কথা বলি। এখনো তো অনুষ্ঠানের অনেক বাকি। পাশে জাফরুল্লাহ চৌধুরীর সাথে পরিবারের অনেক কথা বলা ও ছবি তোলা হয়ে গেছে। শিরিন হক ম্যাডাম খুবই মিশুক একজন প্রাণবন্ত মানুষ। আর আমার শিক্ষক হান্নানা ম্যাডামের বোন। যাই হোক আমি সামনের দিকেই মনটা বার বার টানছিল কেন জানি না।
আমি একটু গলা বাড়িয়ে চুপি চুপি সালাম দিয়ে মাকেই বললাম আপনরা কি বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের আত্মীয়? কারণ ভদ্রলোক যিনি পাশে বসেছিলেন তিনিও অনেকটা সেরকম দেখতে। ‘মা’ স্মিত একটা স্নিগ্ধ হাসি দিয়ে বললেন না না আমি লীনুর মা। আমার তখন মনটা ভরে গেল। আমি জানতাম লীনুর বাড়ি চট্টগ্রামে।
তখন উনিও আমার সাথে কথা বলতে আগ্রহী হলেন, কুশল বিনিময় করলেন, আমার পরিচয় জানতে চাইলেন খুবই বিনয় বোধের সাথে। এত মিষ্টি করে বললেন আমি মুগ্ধ। মিষ্টি একটা জামদানী শাড়ি পরা, বারবার মাথায় ঘোমটা টেনে দিচ্ছিলেন। দেখছিলাম আর ভাবছিলাম সব মা–ই বোধ হয় এমনি। মন থেকে একটা শ্রদ্ধা আসলো, কিছু বলতে পারিনি, ছবিও তোলা হয়নি, শুধু অনুভব করছিলাম।
অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেল আমি কম বেশি ফাঁকে ফাঁকে ছবি তুলছিলাম বসার জায়গা থেকে নীচু হয়েই। যেই বলা শুরু হলো জোবেরা রহমান লীনু সম্পর্কে আমি ছবি তুলতে গিয়ে না তুলে স্তম্ভিত হয়ে ও গর্বের সাথে শুনছিলাম।
১৯৬৫ সালের ৯ জুন জোবেরা রহমান লীনুর জন্ম চট্টগ্রামে। তিনি স্কুল জীবন থেকেই ক্রীড়াবিদ ছিলেন, স্কুল কলেজে অসংখ্যবার পুরস্কার পেয়েছেন বিভিন্ন খেলাধুলায়, চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন অনেক বার। পরে লালমাটিয়া কলেজ ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি শেষ করলেও তাঁর ক্রীড়ার প্রতি অনুশীলন, অংশগ্রহণ, বিজয় অব্যাহত ছিল।
বাংলাদেশ টেনিস খেলার জগতে তাঁর অবিস্মরণীয় নাম। ১৯৭৪ সাল থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত টানা ২৮ বছর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে, বিভিন্ন ইভেন্টে অসাধারণ দক্ষতার স্বাক্ষর রাখেন। তিনি জাতীয় পর্যায়ে ১৬ বার চ্যাম্পিয়ন ও ৮ বার রানার আপ হন। তিনি এশিয়ান টেবিল টেনিস, পেন্টাঙ্গুলার টেবিল টেনিস, বাংলাদেশের টোবাকো কোম্পানির সিলভার জুবলিসহ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চ্যাম্পিয়নশীপ ও গৌরবোজ্জ্বল বিজয়ের স্থান অধিকার করে টেনিস জগতে কিংবদন্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ২০০২ সালে তাঁর এই অর্জন গ্রিনিস ওয়ার্লড রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত হয়। যা আমদের বাংলাদেশের খেলার জগতে অনন্য গৌরবের ও সম্মানের।
এই পরিচিতি ঘোষণা করছিলেন মন্ত্রী পরিষদ সচিব নাসিমুল গণি স্যার। আমি অভিভূত হয়ে শুনছিলাম আর হঠাৎ চোখ গেল আমার সামনে বসা জোবেরা রহমান লীনুর মা’র দিকে, তিনি কাঁদছিলেন আর চোখ মুছছিলেন। আমারও চোখে পানি এসে গেল। বলার পরপর যখন জোবেরা রহমান লীনু মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণ করছিলেন তখনও তিনি কাঁদছিলেন। আমি হাততালি দেয়া শেষ করে হাতটা আমার সামনে বসা মায়ের দিকে বাড়িয়ে দিলাম, তিনি আমার হাতটি জোরে চেপে ধরে চোখের পানি মুছতে লাগলেন। একি আনন্দাশ্রু ধারা!
মায়েরা সন্তানের জিতে যাওয়ার আনন্দেও কাঁদে আবার দুঃখেও কাঁদে। তখন আমার কি আনন্দ বেদনা মিশ্রিত সুখানুভূতি হয়েছে ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। কৃতী খেলোয়াড় মিস জোবেরা রহমান লীনু সারাজীবন উৎসর্গ করেছেন ক্রীড়াবিদ হিসেবে। দেশের জন্য, সমাজ, পরিবারের জন্য সম্মান বয়ে এনেছেন। আমি নারী হিসেবে গর্ব অনুভব করি ও সম্মানসূচক অভিবাদন জানাই সকল গুণী নারীদের পক্ষ থেকে। এ পদক তাঁর কৃতিত্বের স্বীকৃতি। নারীর অবদান সর্বক্ষেত্রেই। খুব কম সংখ্যক নারী বাংলাদেশে এই রাষ্ট্র্রীয় সর্বোচ্চ সম্মান স্বাধীননতা পদক পেয়েছেন। এবারের স্বাধীনতা পদক অনুষ্ঠানে মিস জোবেরা রহমান লীনু বক্তব্যও রাখেন, এটা আমাদের নারীদের জন্য বিশাল সম্মানের। এবারে মরণোত্তর স্বাধীনতাপদক পাওয়া মাহেরীন চৌধুরীকেও সম্মান জানাই। তাঁকে নিয়ে লিখেছি পত্রিকায়। এ মহীয়সী নারীদের জীবনের জয়গান আমাদের অনুসরণীয় হোক। জোবেরা রহমান লীনুর শ্রদ্ধেয় মায়ের আনন্দাশ্রু পুস্পাঞ্জলি হোক সকল কৃতী নারী সন্তানের জন্য।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক; অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর, অর্থনীতি বিভাগ, ইডেন কলেজ।












