শিশুকিশোরদেরকে সাহিত্যমুখী করতে অভিভাবকদের ভূমিকা চাই

আবদুল হান্নান হীরা | রবিবার , ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৫:৫০ পূর্বাহ্ণ

বর্তমান প্রজন্মের শিশু–কিশোরদের মানসিক বিকাশ, সৃজনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধ গঠনে সাহিত্যের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গল্প, কবিতা, ছড়া, উপন্যাস ও জীবনী পাঠের মাধ্যমে একজন শিশু যেমন আনন্দ পায়, তেমনি তার কল্পনাশক্তি, ভাষাজ্ঞান, চিন্তাশক্তি ও নৈতিক বোধও বিকশিত হয়। কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান সময়ে অনেক শিশু–কিশোর বই পড়ার পরিবর্তে দীর্ঘ সময় মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ডিজিটাল বিনোদনে ব্যস্ত থাকছে। এ পরিস্থিতিতে শিশুদের সাহিত্যমুখী করে তুলতে সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব নিতে হবে অভিভাবকদের।

ঘরে তৈরি করতে হবে বই পড়ার পরিবেশ: শিশুর প্রথম শিক্ষালয় পরিবার। বাবা–মা ও বড় ভাই বোন যদি নিয়মিত বই পড়েন, বাসায় পেপার পড়েন এবং বই নিয়ে সন্তানের সঙ্গে আলোচনা করেন, তাহলে শিশুর মধ্যেও বই পড়ার আগ্রহ তৈরি হয়। তাই ঘরে ছোট হলেও একটি শিশু–কিশোর পাঠাগার বা বইয়ের কর্নার তৈরি করা যেতে পারে। শিশুর বয়স ও আগ্রহ অনুযায়ী সেখানে গল্পের বই, ছড়া, কবিতা, বিজ্ঞানবিষয়ক বই, জীবনী ও কিশোর সাহিত্য রাখা যেতে পারে।

উপহার হোক বই: জন্মদিন, পরীক্ষায় ভালো ফল, পুরস্কার কিংবা বিশেষ কোনো উপলক্ষে শিশুদের খেলনা বা দামি সামগ্রীর পাশাপাশি বই উপহার দেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। শিশুর বয়স ও মানসিক বিকাশের উপযোগী বই নির্বাচন করা গুরুত্বপূর্ণ। এতে বই শিশুর কাছে আনন্দ ও ভালোবাসার একটি উপকরণ হিসেবে পরিচিত হবে।

মোবাইল ব্যবহারে অভিভাবকের সচেতনতা: মোবাইল বা ইন্টারনেট পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে এর ব্যবহার নিয়ন্ত্রিত ও উদ্দেশ্যপূর্ণ করা প্রয়োজন। নির্দিষ্ট সময় মোবাইল ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে দিনের একটি অংশ বই পড়ার জন্য নির্ধারণ করা যেতে পারে। একই সঙ্গে অভিভাবকদের নিজেদের মোবাইল ব্যবহারের অভ্যাসের দিকেও নজর দিতে হবে। কারণ শিশু সাধারণত উপদেশের চেয়ে বড়দের আচরণ থেকেই বেশি শেখে।

বইমেলা ও পাঠাগারে নিয়ে যেতে হবে: শিশু–কিশোরদের নিয়মিত বইমেলা, পাঠাগার ও সাহিত্যিক অনুষ্ঠানে নিয়ে যাওয়া দরকার। সেখানে বই দেখার ও পছন্দের বই বেছে নেওয়ার সুযোগ দিলে তাদের মধ্যে বইয়ের প্রতি স্বাভাবিক আকর্ষণ তৈরি হয়। স্কুলের পাশাপাশি স্থানীয় পাঠাগার ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকেও এ ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে ।

অভিভাবক–শিক্ষকের সমন্বয় জরুরি: শিশুকে সাহিত্যমুখী করার ক্ষেত্রে পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় থাকা প্রয়োজন। শিক্ষকরা বয়স উপযোগী বইয়ের তালিকা দিতে পারেন এবং শিক্ষার্থীদের গল্প লেখা, কবিতা আবৃত্তি, বই আলোচনা ও পাঠচক্রে যুক্ত করতে পারেন। অভিভাবকরাও সেই চর্চাকে ঘরে উৎসাহ দেবেন। বাসায় এক কোণে একটা বুক সেলফ রাখা যেতে পারে, দূরের যাত্রা পথে মোবাইল এর পরিবর্তে বই সাথে নিতে পারে।

পাঠাভ্যাস গড়ে উঠুক শৈশব থেকেই: একজন শিশুকে শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য তৈরি করলে তার শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যেতে পারে। সাহিত্য তাকে মানুষকে বুঝতে, প্রকৃতিকে ভালোবাসতে, অন্যের দুঃখ অনুভব করতে এবং সুন্দরভাবে চিন্তা করতে শেখায়। তাই শিশু–কিশোরদের শুধু পাঠ্য বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সৃজনশীল ও মননশীল বই পড়ার সুযোগ দিতে হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকবি কামিনী রায় : নারী শিক্ষার অগ্রদূত
পরবর্তী নিবন্ধবাংলাদেশের শিল্পায়ন কেন থমকে আছে