আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যগুলোর একটি ছিল আছরের ওয়াক্তে নটর ডেমের রেজাল্ট দেবার মুহূর্ত। আম্মু নামাজ পড়তে যান, এমন সময় খবর পেলেন নটর ডেমের ভর্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশিত। আমি সুযোগ পেয়েছি নটর ডেমে পড়ার। মুখে লেগে থাকা অযুর পানি এবং তৎক্ষণাৎ নির্গত চোখের পানির পার্থক্য যে কতটা নিখুঁত হতে পারে, এলইডি লাইটের নিম্নমানের আলোতেও সেদিন তা স্পষ্ট ছিলো। আম্মুর মুখে ছিল হাসি, দীর্ঘ একটি নিঃশ্বাস ফেলে সদ্য খালি হওয়া ফুসফুসের আবেদন তোয়াক্কা না করে বাক্যহীন একটা দৃশ্য, আম্মুর চোখের পাতাও নিয়মের অনুসরণে অনড় ছিলো। হাসির শুরুটা কীভাবে অশ্রুহীন মুখাবয়বে কপালের ভাঁজে রুপ নিতে পারে, সেদিন পর্যন্ত নিজের চোখে দেখিনি। মধ্যবিত্ত ইকোনমিতে হাসি কখনো ধ্রুবরাশি নয়। অবশ্যম্ভাবী বাস্তবতা হলো কপালে পড়া সেই ভাঁজটুকু, যার পরিবর্তনের আশাই ক্ষেত্রবিশেষে মুখ্য হয়ে ওঠে। ঋণের ভারে আব্বুর দৈনন্দিন জীবন যখন ভারসাম্যহীনতায়, তখন ঢাকায় এসে পড়ার স্বপ্ন অপরাধবোধ জাগ্রত করে। স্বাভাবিক। দাম্পত্যে জীবনের ভালোবাসার একমাত্র নিদর্শন হিসেবে অবশিষ্ট ছিল আম্মুর গয়নাটি, ডিজাইন তথাকথিত হিসাবে অচল, কিন্তু আবেগ অক্ষত। আম্মু সিদ্ধান্ত নিলেন গয়নাটি বিক্রি করার। আমি বিপক্ষে ছিলাম। কিন্তু যায় আসে না। মনে পড়ে সেই দিনটি, আম্মু নিষ্পলক চেয়ে ছিলেন গয়নাটির দিকে, হয়তো শেষ একটিবার দেখে নেয়া?
আম্মুর চোখে সেবার কোনো পানি দেখিনি। পেয়েছিলাম মধ্যবিত্তের সেই চিরপরিচিত কপালের ভাঁজ। তবে চেহারার ভাষ্য ছিল ভিন্ন। চোখে ছিল অপার সম্ভাবনা, প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেছিলো গয়না–গাত্রে। ছেলে একদিন বড় মানুষ হবে। হঠাৎ অশ্রুসিক্ত হলো নয়ন। সেদিন জীবনে হয়তোবা প্রথম অনুভব করি অশ্রুর ভিন্নতা।
আরেকটি দিনের কথা মনে পড়ে। সেপ্টেম্বরের ঊনত্রিশ তারিখ নটর ডেম কলেজে নবীনবরণ। আটাশ তারিখেই আমার ঢাকায় পদার্পণ। আগের দিন, অর্থাৎ সাতাশ তারিখে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আম্মুর কিছু রিপোর্ট হাতে আসে। এসএসসি পর্যন্ত যা ইংরেজি পড়েছি, অন্তত দেখে রিডিং পড়তে জানতাম, কিছু ভোক্যাবুলারি আয়ত্তে ছিল।
আমার মনে নেই রিপোর্টটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কতবার পড়েছি। শুধু এইটুকু মনে পড়ে, শক্ত মাটিতে দাঁড়িয়ে ‘পায়ের তলায় মাটি না থাকার’ অনুভূতিটা কেমন ছিলো।
আম্মুর পিত্তথলিতে পাথর এবং টিউমার ধরা পড়ে। এবং টিউমারও অপত্য ছিল না। ডাক্তার সাহেব বললেন, যত দ্রুত সম্ভব, অপারেশন করাতে হবে। ওষুধ দিয়ে বেশিদিন দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়। খরচের ব্যাপার। ওদিক ভাবতে গেলে তো আবার ছেলেকে ঢাকা পড়ানো যাবে না। এবারও কপালে ভাঁজ, কিন্তু মুখাবয়বের আবেদন এবার ভিন্ন ছিল। চেহারায় স্পষ্ট ছিলো নিয়তির পরিহাসে অসহায়ত্বের ছাপ। উনিশ বছরের ছোট্ট এই জীবনে দেখেছি অশ্রুহীন মুখাবয়বে কীভাবে নিষ্ঠুর বাস্তবতার চিত্র ফুটে উঠে, কীভাবে বাস্তবতার চাপে পিষ্ট মনস্তত্ত্বও চায় আশার আলো।












