বাংলাদেশ পোশাকশিল্পে বিশ্বে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করলেও নিম্ন থেকে উচ্চ প্রযুক্তির কোনো স্তরের পণ্যেই শক্তিশালী দেশীয় ব্র্যান্ড গড়ে তুলতে পারেনি। এই ব্যর্থতার মূলে রয়েছে কাঠামোগত দুর্বলতা, কিন্তু তার চেয়েও গভীরে রয়েছে একটি মানসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকট।
প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ সরকারি বিনিয়োগের অভাব। জগএ খাতের সাফল্য কোনো স্বতঃস্ফূর্ত ঘটনা নয় এর পেছনে ছিল রাষ্ট্রীয় নীতি–সহায়তা: বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা, রপ্তানি ভর্তুকি, ব্যাক–টু–ব্যাক এলসি, বিশেষায়িত শিল্প এলাকা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত ধারাবাহিকতা। অন্য কোনো খাতে রাষ্ট্র এই মাত্রার প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দেয়নি। ফলে হেলমেট থেকে সেমিকন্ডাক্টর কোনো খাতেই সেই একই মডেল পুনরাবৃত্ত হয়নি। এটা প্রমাণ করে, বাংলাদেশের সমস্যা উদ্যোক্তার অভাব নয়, বরং রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের সংকীর্ণতা।
দ্বিতীয়ত, শিল্প–দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন সুশিক্ষিত মানুষের ঘাটতি একটি নীরব কিন্তু গভীর সংকট। প্রযুক্তিগত দক্ষতা থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি শিল্প কৌশল ভাবতে পারা অর্থাৎ কোন পণ্যে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টেকা সম্ভব, কোথায় গবেষণায় বিনিয়োগ করলে দশ বছর পর ফল মিলবে এই ধরনের কৌশলগত চিন্তার মানুষ সংখ্যায় সীমিত। ফলে বেশিরভাগ বিনিয়োগ হয় স্বল্পমেয়াদি লাভের হিসাবে, দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্যে নয়।
তৃতীয়ত, একটি সামাজিক মানসিকতাও এই সংকটকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে ‘যা পাচ্ছি তাতেই খুশি’ এই প্রবণতা ভোক্তা ও উদ্যোক্তা উভয় পর্যায়ে বিদ্যমান। উদ্যোক্তারা প্রায়ই সহজ, স্বল্প–ঝুঁকির ব্যবসায় সন্তুষ্ট থাকেন, উচ্চ–ঝুঁকির দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করার তাগিদ অনুভব করেন না। আবার ভোক্তারাও মানের প্রশ্নে খুব বেশি দাবি তোলেন না, ফলে বাজারেও চাপ তৈরি হয় না।
এই তিনটি বিষয় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের অভাব, কৌশলগত চিন্তার শিক্ষিত জনশক্তির ঘাটতি এবং সামষ্টিক সন্তুষ্টির মানসিকতা একে অপরকে শক্তিশালী করে একটি ‘দুষ্টচক্র‘ তৈরি করেছে। রাষ্ট্র বিনিয়োগ করে না কারণ সাফল্যের নিশ্চয়তা নেই; সাফল্যের নিশ্চয়তা নেই কারণ পরিকল্পনার মানুষ নেই; আর উচ্চাকাঙ্ক্ষার অভাবে কেউ এই চক্র ভাঙার তাগিদও অনুভব করে না। জগএ প্রমাণ করেছে, রাষ্ট্র ইচ্ছা করলে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতায় টিকতে পারে। প্রশ্ন হলো, সেই ইচ্ছা ও কৌশলগত ধারাবাহিকতা অন্য খাতে তৈরি করার রাজনৈতিক সদিচ্ছা আমাদের আছে কি না।













