মুরগি ব্যবসায়ী বেলাল হোসেন। বাড়ি তার ফটিকছড়ি নাজিরহাট বাজার এলাকায়। পরিচয় দিতেন পুলিশের এসআই, ওসি, এএসপি থেকে শুরু করে র্যাব, বিজিবির শীর্ষ কর্মকর্তা। এভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে হাতিয়ে নিতো লাখ লাখ টাকা। গত বুধবার রাতে নাজিরহাট বাজার থেকে এক সহযোগীসহ তাকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। বেলাল ফটিকছড়ির ভক্তপুর গ্রামের মৃত আব্দুল মালেকের ছেলে। তার সহযোগী ভুজপুর থানার পশ্চিম সুয়াবিলের মৃত এজাহার মিয়ার ছেলে মো. ওসমান (৫৩)।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, গত ১৬ আগস্ট সন্ধ্যায় বেলাল নিজেকে এসআই পরিচয় দিয়ে মোহাম্মদ খোরশেদুল আলম নামে এক ব্যক্তিকে হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদানসহ পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা মোকাদ্দমা দায়ের করার হুমকি দিয়ে ২০ হাজার টাকা দাবি করে। তিনি সরল বিশ্বাসে প্রতারকের দেওয়া নম্বরে ১৬ আগস্ট রাতে অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ২০ হাজার ৪০০ টাকা পাঠান। পরবর্তীতে প্রতারক বেলাল থানার ওসি পরিচয় দিয়ে পুনরায় তার নিকট টাকা চাইলে খোরশেদ আলম ১৭ আগস্ট সকালে ৩ হাজার ৬০ টাকা পুনরায় বেলালের দেওয়া বিকাশ নম্বরে পাঠিয়ে দেন। এরপর সার্কেল এএসপি পরিচয় দিয়ে পুনরায় ৫০ হাজার টাকা দাবি করলে ১৭ আগস্ট খোরশেদুল আলম ২৯ হাজার ৫৮০ টাকা বিকাশে প্রেরণ করেন। এরপর বেলাল এসপি পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে খোরশেদুল আলমকে ফোন করে খোঁজখবর নেয়। এভাবে বেলাল খোরশেদুল আলমের ৫৩ হাজার ৪০ টাকা হাতিয়ে নেয়।
পুলিশ পরিচয়ে টাকা হাতানোর পর বেলাল এবার সাজেন র্যাব কর্মকর্তা। র্যাব পরিচয়ে ফোন দেয় এবং জানায় মামলাটি বর্তমানে র্যাবের নিকট এসেছে, মামলার বিষয়ে খোঁজখবরের নাম করে তার নিকট পুনরায় টাকা দাবি করে। এবার খোরশেদুল আলমের একটু সন্দেহ হয়। তিনি র্যাব-৭, চট্টগ্রামকে বিষয়টি অবহিত করেন। র্যাব অনুসন্ধান চালিয়ে প্রতারক বেলালের সন্ধান পায়। র্যাব-৭ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এমএ ইউসুফ জানান, ২০২১ সালের মে মাস থেকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন লোকের কাছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ও র্যাব বাহিনীর সদস্য হিসেবে মিথ্যা পরিচয় দিয়ে একটা প্রাইভেট কার ভাড়া করে ঘুরে বেড়ায় এবং বিভিন্ন কাজ করে দেওয়ার নাম করে বিভিন্ন অজুহাতে বিভিন্ন লোকের থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিত। সর্বপ্রথম সে তার বন্ধুবান্ধব এবং পরিচিতজনকে বিভিন্ন পুলিশ অফিসার বা র্যাবের পরিচয় দিয়ে ভয় দেখাত। তারপর ২০২১ সালের মে মাসে সে একটি মুদির দোকানে সয়াবিন তেলের ডিলার সেজে ৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়। এছাড়া সে থানার ওসি সেজে ইউনিয়ন পরিষদের দফাদারের নিকট থেকে আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মেম্বার পদ প্রার্থীদের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে পরবর্তীতে তাদের নির্বাচনে সহযোগিতা করার কথা বলে বিভিন্ন পরিমাণ টাকা আদায় করে। রাউজান থানায় একটি শিশু মারা যাওয়ার ঘটনায় তার বাবার কাছে ময়নাতদন্তের ঝামেলা এড়ানোর কথা বলে নির্মমভাবে ৫ হাজার টাকা আদায় করে প্রতারক বেলাল।
তিনি বলেন, বেলাল স্থানীয় তথাকথিত অনিবন্ধিত বিভিন্ন অনলাইন চ্যানেল থেকে বিভিন্ন ক্রাইম ও মামলার খবর, জমিজমার বিরোধের খবর নিয়ে নিজেকে কখনো এসআই বা থানার ওসি, কখনো সার্কেল এএসপি বা এসপি কখনো বা র্যাবের অফিসার ইত্যাদি পরিচয় দিয়ে কথা বলতো ও টাকা দাবি করতো এবং টাকা না দিলে কিংবা দিতে দেরি করলে হুমকি দিত। তিনি আরো বলেন, বেলাল থানার ওসি, সেকেন্ড অফিসার, মামলার তদন্তকারী অফিসার, পুলিশ, র্যাব, পিবিআই, সিআইডির কোনো অফিসারের নাম গ্রহণ করে মোবাইলে এমনভাবে কথা বলত যে, মামলার বাদী, আসামি পক্ষ বুঝতেই পারত না। বেলাল নিজে কোনো দিন কারো সঙ্গে দেখা করত না। টাকা নিত বিকাশে এবং বিকাশের দোকানেও যেত না। বিকাশের দোকানকে অন্য নম্বরে সেন্ড করতে বলত। এভাবে লোকচক্ষুর অন্তরালে দীর্ঘদিন ধরে লোকজনকে প্রতারিত করেছে বেলাল। নিয়মিত প্রাইভেটকার ভাড়া করে ঘুরে ঘুরে মোবাইলে কথা বলত এবং ফোনের অপর পাশে থাকা ভিকটিমরা তাকে ঊর্ধ্বতন অফিসার বলে মনে করত। গত দেড় বছরে প্রতারণাই ছিল তার একমাত্র আয়ের উৎস।













