আমেরিকা এবং ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় পর্বের শান্তি আলোচনা ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রতিনিধিদল পাকিস্তানের উদ্দেশে রওনা হওয়ার খবর পাওয়া গেলেও ইরান জানিয়ে দিয়েছে, তারা এখনই আলোচনায় বসতে প্রস্তুত নয়। হরমুজে অবরোধ ভাঙার চেষ্টার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পণ্যবাহী জাহাজ আটকের পর তেহরান এর জবাব দেওয়ার অঙ্গীকার করে আপাতত আলোচনায় না বসার সিদ্ধান্ত জানায়। এক খবরে বলা হয়, জাহাজ আটকের জবাবে মার্কিন যুদ্ধজাহাজে ড্রোন হামলা চালিয়েছে তেহরান। এদিকে আমেরিকা এবং ইরানের মধ্যে যে দু’সপ্তাহের সংঘর্ষবিরতি চলছে, তারও মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামীকাল বুধবার। সেই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আর বৃদ্ধি পাবে কি না, তা নিয়ে এর মধ্যে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
অপরদিকে, নতুন করে যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা উসকে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল সোমবার পাকিস্তানে দ্বিতীয় দফার আলোচনার কথা থাকলেও দুই পক্ষের ভিন্ন অবস্থান ও বক্তব্যের কারণে বৈঠক আর অনুষ্ঠিত হয়নি।
গত রোববার মার্কিন নৌবাহিনীর একটি গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার ইরানের পতাকাবাহী ‘তুস্কা’ নামের একটি কনটেনার জাহাজে গুলি চালিয়ে সেটিকে অচল করে জব্দ করে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, জাহাজটি তাদের আরোপিত নৌ অবরোধ ভেঙে যাওয়ার চেষ্টা করছিল এবং একাধিক সতর্কতা উপেক্ষা করেছিল। মার্কিন বাহিনীর গুলিতে জাহাজটির ইঞ্জিনরুম ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে চলাচল অক্ষম হয়ে পড়ে এবং বর্তমানে সেটি তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অন্যদিকে ইরান এই ঘটনাকে ‘সশস্ত্র জলদস্যুতা’ আখ্যা দিয়ে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে মার্কিন একটি যুদ্ধজাহাজে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। দেশটির আধা–সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সি এ তথ্য জানিয়েছে। যদিও হামলায় ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট তথ্য এখনও প্রকাশ করা হয়নি, তবুও এই আক্রমণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
চলমান এই সংঘাত সরাসরি প্রভাব ফেলেছে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায়। যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পাকিস্তানের ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফা শান্তি আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। প্রাথমিকভাবে মার্কিন প্রতিনিধি দল সেখানে পৌঁছানোর কথা থাকলেও ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা কোনো আলোচনায় অংশ নেবে না। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই বলেন, এ মুহূর্তে পরবর্তী দফা আলোচনার কোনো পরিকল্পনা নেই। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত নৌ অবরোধ, অবস্থান পরিবর্তন এবং ‘অযৌক্তিক দাবিদাওয়া’ আলোচনার পরিবেশ নষ্ট করেছে। একই সঙ্গে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডকে কূটনীতির সঙ্গে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা গভীর হয়েছে। দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলছে। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আজ মঙ্গলবার রাত বা আগামীকাল বুধবার সকালে শেষ হওয়ার কথা। এর আগেই নতুন কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব না হলে সংঘাত আবারও পূর্ণমাত্রায় শুরু হতে পারে।
এ প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর সম্ভাবনা খুবই কম। তিনি বলেন, চুক্তি না হলে যুদ্ধ পুনরায় শুরু হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি ‘খারাপ কোনো চুক্তি’তে সম্মত না হওয়ার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
অন্যদিকে যুদ্ধবিরতির সময়টিকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করছে ইরান। দেশটির ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আইআরজিসি জানিয়েছে, তারা দ্রুতগতিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার পুনর্গঠন করছে। আইআরজিসির অ্যারোস্পেস ফোর্সের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাজিদ মুসাভি দাবি করেছেন, এই পুনর্গঠনের গতি যুদ্ধপূর্ব সময়কেও ছাড়িয়ে গেছে।
সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালী ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সৃষ্ট এই নতুন উত্তেজনা শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি সরবরাহের জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। যুদ্ধবিরতির শেষ প্রহরে এসে কূটনীতি স্থবির, সামরিক উত্তেজনা তুঙ্গে–এ অবস্থায় সামান্য উসকানিও পূর্ণাঙ্গ সংঘাতে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।














