চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ২০১৯–২০ সেশনের লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী মো. রাসেল। তিনি ভেবেছিলেন, প্রথম বর্ষে না হোক দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় বর্ষে অন্তত একটি আবাসিক সিট পাবেন। সে আশায় বছর কেটেছে। স্নাতক শেষ হয়ে গেছে। বিভাগ বদলেছে, সিনিয়ররাও বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু অপেক্ষার অবসান হয়নি। সমপ্রতি স্নাতকোত্তর শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার সময়ও পাননি সিট। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬ বছরের বেশি সময় কেটেছে শহরের মেসে, ক্যাম্পাসের কটেজ ও ভাড়া বাসার ছোট ছোট কক্ষে। এখন বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের দিকে ফিরে তাকালে এক বড় অপূর্ণতা–আবাসিক হলের একটি সিট।
রাসেলের মতো এই সমস্যা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো শিক্ষার্থীর দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থী সংখ্যা ২৬ হাজার ৬৭৮ জন। অথচ ১৪টি আবাসিক হলে আসন রয়েছে মাত্র ৬ হাজার ৩৬৯টি। বাস্তবে একটি সিটে দুই কিংবা তিনজন করে অবস্থান করায় প্রায় ৯ হাজার শিক্ষার্থী হলে থাকতে পারছেন। বাকি শিক্ষার্থীদের বড় অংশকে নির্ভর করতে হচ্ছে ক্যাম্পাস সংলগ্ন কটেজ, মেস কিংবা শহরে ভাড়া বাসার ওপর।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহজালাল হল, সোহরাওয়ার্দী হল, এ এফ রহমান হল ও আলাওল হলের আশপাশে গড়ে উঠেছে শত শত কটেজ। শিক্ষার্থীদের আবাসনের চাহিদাকে কেন্দ্র করেই এসব কটেজের বিস্তার। পুলিশ ফাঁড়ির পিছনে ‘এতিম আলী’ ও ‘দাদা বাবা’ কটেজে ঢুকতেই চোখে পড়ে স্যাঁতসেঁতে দেয়াল, সরু করিডর এবং ছোট ছোট কক্ষ। একটি রুমে দুটি খাট ও একটি টেবিল রাখার পর আর তেমন জায়গা থাকে না। ৪০ থেকে ৫০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একটি বা দুটি শৌচাগার। অনেক জায়গায় গোসলের ব্যবস্থাও অপ্রতুল। ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী শামীম মিয়া ও তার সহপাঠীরা এমন একটি কটেজে থাকেন। কৃষক পরিবারের সন্তান শামীম টিউশনি করে নিজের পড়াশোনার খরচ চালান। তিনি বলেন, ভাড়া, খাবার আর যাতায়াত খরচ মেটাতে গিয়ে মাস শেষ হওয়ার আগেই টাকার সংকট তৈরি হয়। হলে থাকতে পারলে অন্তত কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যেত। আমার নিম্ন–মধ্যবিত্ত পরিবারের উপর একটু হলেও চাপ কমতো।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এসব কটেজের পরিবেশ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীবান্ধব নয়। পড়াশোনার জন্য নিরিবিলি পরিবেশ যেমন নেই, তেমনি নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যকর বসবাসের নিশ্চয়তা। আবাসনের সঙ্গে বাড়ছে খরচও। হলে থাকতে না পারার কারণে শিক্ষার্থীদের মাসিক ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে। বাসাভাড়া কিংবা কটেজ ভাড়া দেওয়ার পর খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটানো অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন। অনেককে টিউশনি কিংবা খণ্ডকালীন কাজ করে নিজের খরচ চালাতে হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা বলছেন, আবাসনসংকট এখন শুধু থাকার জায়গার সমস্যা নয় এটি তাদের শিক্ষাজীবনের সামগ্রিক মানকে প্রভাবিত করছে।
হলের ভেতরেও নেই স্বস্তি : যারা হলে থাকতে পারছেন, তাদের অবস্থাও খুব একটা সুখকর নয়। বিভিন্ন হলের শিক্ষার্থীরা জানান, কক্ষের ধারণক্ষমতার তুলনায় শিক্ষার্থী বেশি। অনেক কক্ষে একটি সিটে দুই বা তিনজন পর্যন্ত অবস্থান করছেন। ওয়াশরুম সংকট, পুরোনো আসবাবপত্র এবং সীমিত সুযোগ–সুবিধার কারণে আবাসিক জীবনও অনেক ক্ষেত্রে কষ্টকর হয়ে উঠেছে। একজন আবাসিক শিক্ষার্থী বলেন, সিট পেলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায় না। হলগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়নও প্রয়োজন। অনেক সময় পড়ার টেবিল ও কাপড়চোপড় রাখার জন্য পর্যাপ্ত আসবাবপত্র দেওয়া হয় না। যার কারণে পড়ার পরিবেশে ব্যাঘাত ঘটে।
খাবারের লাইনে অপেক্ষা : আবাসনসংকটের আরেকটি প্রভাব পড়েছে খাবার ব্যবস্থায়। হলের বাইরে থাকা বহু শিক্ষার্থীও কম খরচে খাবারের আশায় হলের ডাইনিংয়ে আসেন। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার পর সোহরাওয়ার্দী হলের ডাইনিংয়ের সামনে দাঁড়ালে দেখা যায় লম্বা সারি। হাতে খাবার টোকেন নিয়ে অপেক্ষা করছেন শিক্ষার্থীরা। রাত ৯টা পর্যন্ত এই ভিড় থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট ছাড়া অন্য কেউ দূর থেকে এত বড় সিরিয়াল দেখলে হয়তো ত্রাণ নেওয়ার লাইন ভাবাটা স্বাভাবিক মনে হবে। বর্তমানে হলের ডাইনিংয়ে এক বেলার খাবারের জন্য ৩৫ থেকে ৪০ টাকা ব্যয় করতে হয়। কয়েক মাস আগেও এই খরচ কিছুটা কম ছিল। দাম বাড়লেও খাবারের মান নিয়ে অসন্তোষ কমেনি। সোহরাওয়ার্দী হলের আবাসিক শিক্ষার্থী শিমুল মিয়া বলেন, দাম বেড়েছে, কিন্তু দামের তুলনায় খাবারের মানে তেমন পরিবর্তন আসেনি। অনেক সময় তরকারি খুবই পাতলা থাকে। মাছ কিংবা মুরগির পরিমাণও কম। অর্থের সংকটে এমন খাওয়া খেয়ে কোনমতে জীবন কাটাতে হচ্ছে। অনাবাসিক শিক্ষার্থী বাইজিদ মিয়া বলেন, বিকল্প না থাকায় অনেক এবং বাহিরের খাবারের দামের তুলনায় হলের ডাইনিংয়ের খাবারের দাম কিছুটা কম। যার কারণে ডাইনিংয়েই খেতে হয়। কিন্তু খাবারের মান নিয়ে শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ দীর্ঘদিনের।
তবে শিক্ষার্থীদের খাবার অসন্তুষ্টি ও খাবারের মান নিয়ে ডাইনিং কর্মচারিরা জানান, এখানে প্রতিবেলাতে খাবার খায় প্রায় ৪শ থেকে ৫শ জন শিক্ষার্থী। কিন্তু প্রতিদিন ডিউটি করে মাত্র ১৬/১৭ জন কর্মচারী। এত শিক্ষার্থীর খাবার এই গুটিকয়েক কর্মচারী দিয়ে রান্না করা পরিবেশন করা সম্ভব না। যার কারণে খাবারের মান নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন থাকাটা স্বাভাবিক। তবুও আমরা আমাদের সাধ্যমত চেষ্টা করে যাচ্ছি।
এদিকে হলের বাইরে থাকা শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ ক্যাম্পাস সংলগ্ন হোটেল ও ক্যান্টিনগুলোর ওপর নির্ভরশীল। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অনেক হোটেল ও ক্যান্টিনে মূল্যতালিকার সঙ্গে বাস্তব দামের মিল নেই। সাধারণ খাবারের জন্যও তুলনামূলক বেশি অর্থ গুনতে হয়। একই সঙ্গে খাবারের মান ও স্বাস্থ্যবিধি নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। একাধিক শিক্ষার্থী জানান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তদন্ত ও সুষ্ঠু পদক্ষেপের অভাবে হোটেল ও ক্যান্টিন মালিকরা অনেক বেশী দাম ও অস্বাস্থ্যকর খাবার পরিবেশন করে।
শাটল ট্রেনে স্বস্তির চেয়ে ভোগান্তি বেশি : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শাটল ট্রেন। প্রতিদিন প্রায় ১২ থেকে ১৩ হাজার শিক্ষার্থী এই ট্রেনে যাতায়াত করেন। তবে শিক্ষার্থীদের মতে, এই ট্রেন এখন অনেক ক্ষেত্রেই স্বস্তির বদলে ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধিকাংশ বগির দরজা–জানালা ক্ষতিগ্রস্ত। ধারণক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত যাত্রী বহন করা হয়। গরমের দিনে ফ্যান না চলার অভিযোগও রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা। সমপ্রতি একাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সময়সূচি বিপর্যয়ও নিত্যদিনের ঘটনা। সমাজ বিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষার্থী তাহিয়া তাবাসসুম বলেন, অনেক সময় শাটলে উঠলেই নিরাপত্তাহীনতা কাজ করে। আবার ট্রেন দেরি হলে ক্লাস ও পরীক্ষাতেও প্রভাব পড়ে।
এদিকে, প্রায় ৩ যুগ পর চবিতে অনুষ্ঠিত ছাত্র সংসদ নির্বাচনে আবাসন, পরিবহন ও শিক্ষার্থীদের মৌলিক সুবিধা উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শিক্ষার্থীদের একটি অংশ মনে করেন, সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন এখনো দৃশ্যমান নয়। আবাসন সংকট নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সময় আন্দোলনে নেমেছে। তাদের দাবি পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হওয়ার আগ পর্যন্ত ভাতার ব্যবস্থা করা।
চাকসুর যোগাযোগ ও আবাসনবিষয়ক সম্পাদক মো. ইসহাক ভূঁঞা বলেন, ইতোমধ্যে চাকসুর উদ্যোগে ফরহাদ হলের এঙটেনশন ৮৮ জন শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া শাহজালাল হলে সংস্কার কাজ চলমান। অনেক হলে এঙটেনশন নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি ১০টি হল নির্মাণের জন্যও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
চাকসুর ভিপি মো. ইব্রাহীম বলেন, আবাসন সমপ্রসারণ ও পরিবহন উন্নয়নের বিষয়ে কাজ চলছে। নতুন আবাসন সুবিধা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং শাটল ট্রেনের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল্–ফোরকান বলেন, আবাসনসংকট বর্তমানে শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় সমস্যা। এ সংকট নিরসনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি হলে এঙটেনশনের কাজ চলমান রয়েছে এবং পুরাতন শামসুন্নাহার হল সংস্কার করে শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ১০ তলা বিশিষ্ট পাঁচটি ছাত্র হল ও পাঁচটি ছাত্রী হল নির্মাণের লক্ষ্যে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রস্তুতের কাজ চলছে। হলগুলোর ডাইনিংয়ের খাবারের মান ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রভোস্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সোহরাওয়ার্দী হলের ক্যান্টিনে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের মাধ্যমে সেটিকে ডাইনিং ব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি অনেকাংশে কমে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তবে প্রশাসনের এসব উদ্যোগের ফল মাঠপর্যায়ে কবে দৃশ্যমান হবে, সেটিই এখন শিক্ষার্থীদের প্রধান প্রশ্ন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ পাহাড়, শাটল ট্রেন আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের গল্প প্রায়ই আলোচনায় আসে। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের আড়ালে এখনো রয়ে গেছে একটি অমীমাংসিত সংকটের গল্প। যে গল্পে কেউ ছোট্ট কটেজে গাদাগাদি করে থাকছেন, কেউ খাবারের লাইনে দাঁড়িয়ে সময় পার করছেন, কেউ প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে শহর থেকে যাতায়াত করছেন। আর কেউ কেউ রাসেলের মতো একটি হলের সিটের অপেক্ষা নিয়েই বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করে চলে যাচ্ছেন।












