সকল ঈদের সেরা ঈদ, ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মোমিনেরই ঈদ। ১২ রবিউল আওয়াল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা এ পৃথিবীতে শুভাগমন করেন। এ মিলাদুন্নবী তারিখে অধিকাংশ মুসলমান খুশি উদযাপন করেন তথা ঈদ–এ মিলাদুন্নবী পালন করেন। প্রথম তিন যুগে বর্তমানের ন্যায় জাঁকজমকপূর্ণভাবে ঈদ এ মিলাদুন্নবী পালিত না হলেও পরবর্তীতে চার মাযহাবের সর্বজন স্বীকৃত উলামায়ে কেরাম ঈদ–এ মিলাদুন্নবী পালন করেছেন এবং কেউ কেউ এর গুরুত্ব ও তাৎপর্যের উপর কিতাবও রচনা করেছেন। শত শত বছর ধরে পবিত্র মক্কা মদীনাসহ পৃথিবীর সকল ইসলামী রাষ্ট্রে ব্যাপক আকারে ঈদ–এ মিলাদুন্নবী পালিত হয়েছে।
মহান আল্লাহর অপার রহমত ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের ১২ রবিউল আউয়াল সোমবার সুবহে সাদিকের সময় মানবতার মুক্তির দূত রহমাতুল্লিল আলামিন প্রিয়নবী (দ.) এর পৃথিবীতে শুভাগমনের আনন্দকেই ‘ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.)’ বলা হয়। যার নূরের আলোয় সারা পৃথিবী আলোকিত হয়েছিল। তার ওপরই নাজিল হয়েছে আসমানি গ্রন্থ আল– কোরআন।
জশনে শব্দের অর্থ খুশি উদ্যাপন করা, আনন্দ প্রকাশ করা আর জুলুছ শব্দের অর্থ বিশেষ কোনো উপলক্ষকে সামনে রেখে অনেক লোক জমায়েত হয়ে রাজপথ প্রদক্ষিণ করা (ফিরুজুল লুগাত)। সুতরাং জশনে জুলুছ এর অর্থ হলো গুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয়কে উপলক্ষ করে রাজপথে আনন্দ মিছিল করা, যা হবে নেয়ামতের শোকর (কৃতজ্ঞতা) আদায়ের বহিঃপ্রকাশ।
‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ –তিনটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত । এক. ঈদ দুই. মিলাদ তিন. নবী। প্রথমত ঈদ শব্দটি আরবি। এর শাব্দিক অর্থ উৎসব, আনন্দ, খুশি। বিশ্ববিখ্যাত অভিধান প্রণেতা ইবনু মনযুর বলেন– সমবেত হবার প্রত্যেকদিনকে ঈদ বলা হয়। মুফতি আমীমূল ইহসান আলাইহির রাহমাহ বলেন– কোন মর্যাদাবান ব্যক্তিকে স্মরণের দিন বা সমবেত হবার দিনকে ঈদের দিন বলা হয়। দ্বিতীয়ত মিলাদ শব্দটি আরবি। এর শাব্দিক অর্থ: জম্মকাল, জম্মদিন। এ অর্থে মাওলিদ (দ.) শব্দের ব্যবহার আরবি ভাষায় অত্যধিক। তৃতীয়ত নবী, এখানে নবী বলতে হযরত মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামাকে বুঝানো হয়েছে। কারণ মুসলিমজাতি ও পুরো সৃষ্টিজগত তাঁর আগমনের শোকরিয়া আদায় করে।
সুতরাং ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ অর্থ নবী করিম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামার আগমনের আনন্দ।
‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা বলতে এ ধরাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামার আগমনে আনন্দিত হওয়া এবং এ অদ্বিতীয় নিয়ামত পাবার কারণে সৎকাজ ও ইবাদত বন্দেগীর মাধ্যমে আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করাকে বুঝায়।
বর্তমান বিশ্বের মুসলমানদের কাছে জশনে জুলুছ আর অপরিচিত কোন বিষয় নয়। বিশ্বনবী রাহমাতুলল্লিল আলামীন হুজুর মুহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে বিশাল রহমত এর ভাণ্ডার নিয়ে পৃথিবীর বুকে শুভাগমন করেছিলেন সে নেয়ামত কেবল মানবজাতির জন্য নেয়ামত এমনটি নয়, বরং তা ছিল সমগ্র বিশ্বভ্রমাণ্ডের আঠার হাজার মাখলুকাতের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত। তাই এই মহান দিবসকে উপলক্ষ করে প্রতি বৎসর ঐ দিনে নেয়ামতের শোকরিয়া প্রকাশের নিমিত্তে মিলাদ মাহফিল করা জিকির আজকার করা আনন্দ উদযাপন করা জশনে জুলুছ করা কেবল নৈতিক দায়িত্ব নয় বরং বড় ফজিলতপূর্ণ ইবাদতের কাজ।
হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম এর বেলাদত (জন্ম) মানব জাতির মুক্তির বড় উপলক্ষ। তিনি বিশ্ব মানবতার মুক্তির পথ প্রদর্শক হিসেবে দুনিয়াতে এসেছিলেন। তাই তাঁর আবির্ভাব মানব জাতির জন্য আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহ ও নেয়ামত। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ অনুগ্রহ বা নেয়ামত প্রাপ্তির পর খুশী ও আনন্দ উদযাপনের জন্য মানুষের প্রতি আল্লাহর তাগাদা রয়েছে। এ খুশী বা আনন্দ বিশেষ গোষ্ঠী দল বা দেশের জন্য সীমাবদ্ধ নয় এ খুশী সমগ্র মানব জাতির জন্য।
আল্লাহতায়ালা প্রিয় নবী (দ.) কে দু’জাহানের রহমত স্বরূপ প্রেরণ করেছেন, আল্লাহর নবীকে দুনিয়ায় প্রেরণ মানুষের প্রতি স্রষ্টার বড় করুণার নিদর্শন। যারা এতবড় অনুগ্রহ প্রাপ্তির পরও কৃতজ্ঞতা স্বীকার করবে না তারা কেয়ামত পর্যন্ত অকৃতজ্ঞ হিসেবে পরিচিতি বহন করবে। আজকের আধুনিক যুগ সীমাবদ্ধ জ্ঞানের অধিকারী মানুষের বিশেষ বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তাদের জন্ম–মৃত্যু দিবস খুব ঘটা করে পালন করে থাকেন। অথচ যাঁর অবদান মানব জাতির সকল দিকেই রয়েছে, যিনি মানুষের নৈতিক, সামাজিক, রাষ্ট্রিক, রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সাংস্কৃতিক সহ সকল বিষয়ের বিজ্ঞান সম্মত সমাধান দিয়ে গেছেন তাঁর জন্মকে উপলক্ষ করে মানুষকে কতটুকু খুশি উদযাপন করা উচিত? এ ব্যাপারে আল্লাহ মানব জাতিকে স্বরণ করিয়ে দিয়ে এরশাদ করেন–
‘মুমিনদের কাছে রাসুল প্রেরণ করা আল্লাহ তায়ালা বড়ই অনুগ্রহ ও এহসান করেছেন।’ যেদিনে মানব জাতি এমন নেয়ামত ও আল্লাহর অনুগ্রহ লাভে ধন্য হয়েছে– সেদিনে ঈদ উদযাপনের কথা। পবিত্র কোরানে আল্লাহ আরো বলেছেন ‘হে বনী ইসরাইল তোমরা স্মরণ করো, যে সব নেয়ামত আমি তোমাদেরকে দান করেছি। আল্লাহ বণী ইসরাইলের প্রতিদেয় নেয়ামতকে স্মরণ করতে বলেছেন। অর্থাৎ নেয়ামত প্রাপ্তির জন্য খুশী হতে বলেছেন, তুষ্ঠ হতে বলেছেন। ঠিক একইভাবে বিশ্বমানবতার জন্য হযরতের আবির্ভাব আল্লাহর অপরিসীম দান বা রহমত। অবশ্যই এ নেয়ামতকে উপলক্ষ করে মানুষকে খুশি উদযাপন করতে হবে। এ নেয়ামত প্রাপ্তির যথাযথ কদর বা শুকরিয়া আদায় করতে হবে।
সমাজ বিপ্লবের যে মন্ত্র প্রিয় নবী (দ.) আজ থেকে প্রায় চৌদ্দশ বছর পূর্বে মানুষকে শিখিয়ে গেছেন, সে মন্ত্র আজ নতুন করে রপ্ত করতে হবে। তারই ভিত্তিতে পবিত্র জশ্নে জুলুসে ঈদ এ মিলাদুন্নবী (দ.) মুসলিম জাতির ঐক্যের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনে শান্তি ও কল্যাণ ফিরে আসবে, সমৃদ্ধির পথ সুগম হবে।
লেখক: অধ্যক্ষ, ওয়াছিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিম মাদ্রাসা












