‘তোমার বাড়ির রঙের মেলায় দেখেছিলাম বায়োস্কোপ, বায়োস্কোপের নেশায় আমায় ছাড়ে না, বয়োস্কোপের নেশায় আমায় ছাড়ে না..’ বায়োস্কোপ নিয়ে চমৎকার এই গানটি অনেকেই শুনে থাকবেন। এটি বাংলা ‘দলছুট’ ব্যান্ডের গাওয়া অত্যন্ত জনপ্রিয় ও নস্টালজিক একটি গান এবং প্রয়াত সঞ্জীব চৌধুরী ও বাপ্পা মজুমদারের গাওয়া গানটির অসাধারণ এই লাইনগুলোই মনে করিয়ে দেয় বায়োস্কোপ নিয়ে সেই অতীতের দিনগুলোর কথা। গানটি এখনো সমান জনপ্রিয়। কিন্তু এক সময়ের জনপ্রিয় বায়স্কোপের সেই জনপ্রিয়তা আর নেই। শুধু জনপ্রিয়তা কেন–বায়োস্কোপ নামক শব্দটি অনেকেই শুধু বই–পুস্তকে পড়েছেন, কিন্তু স্বচক্ষে দেখার সৌভাগ্য এ প্রজন্মের অনেকেরই হয়নি। বায়োস্কোপ শব্দটি শুনলেই এ প্রজন্মের অনেকের চোখের সামনে ভেসে ওঠে নানা ধরনের ভিডিও এ্যাপস কিংবা হাতের মুঠোয় থাকা মোবাইল স্ক্রিনে নানা ধরনের ভিডিও ক্লিপস। কিন্তু এ জনপদে একসময় বায়োস্কোপ ছিল, তখন ছিল না কোনো ডিজিটাল প্রযুক্তি। এই বায়োস্কোপ যে তখন কতভাবে মানুষকে বিনোদন দিতো তা কল্পনাই করা যায় না। সময়ের বিবর্তনে আধুনিক প্রযুক্তি অনেক কিছুই সরিয়ে দেয় তা সত্য, কিন্তু বর্তমান প্রযুক্তির যুগে বায়োস্কোপের জায়গায় যে অগ্রসরমান চিন্তাভাবনা সেখানে বায়োস্কোপের অবদানকে অস্বীকার করা যাবে না। এই বায়োস্কোপ এখন গ্রাম বাংলার হারিয়ে যাওয়া এক ঐতিহ্যের নাম। একটি কাঠের বাক্সে চোখ লাগিয়ে গানের তালে তালে নানা দৃশ্য ও ছবি দেখার যে দুর্নিবার আকর্ষণ তা এখন নগরজীবনের মানুষের বিনোদনের খোরাক হয়ে সমানে আসে না এবং না আসাটাই স্বাভাবিক। কারণ বিশ্বায়নের এ যুগে নতুনকে বরণ করে নিতে হয় পুরানো দূরে রেখে। সেকালের গ্রাম বাংলার পুরানো ঐতিহ্য বায়োস্কোপ হলো ভ্রাম্যমাণ সিনেমা প্রদর্শনের একটি যন্ত্র বা মাধ্যম। যা এক শ্রেণির মানুষ পেশা হিসাবে নিয়ে গ্রামে গ্রামে মেলায় খেলায় পরিবেশন করতো। লেন্স ও ছোট পর্দাসম্বলিত একটি কাঠের বাক্সের ভেতরের স্থির বা চলন্ত ছবি ছোটো ছোটো লেন্সের সাহায্যে দেখানো হতো। এক সময় গ্রামের শিশুদের ও মানুষের প্রধান বিনোদন ছিল বায়োস্কোপ। এই বায়োস্কোপ পরিবেশনকারীরা নানা রংবেরঙের পোশাক পরে হাতে ঝুনঝুনি বাজিয়ে শিশুকিশোরদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াতো। এই বায়োস্কোপের মাধ্যমে তারা বিভিন্ন গল্প, যুদ্ধ, কিংবা দর্শনীয় স্থানের দৃশ্য দেখাতেন। সময়ের বিবর্তনে বায়োস্কোপ আজ স্থান করে নিয়েছে স্মৃতির পাতায়, গল্পের বইয়ে কিংবা কোনো গবেষকের গবেষণা কর্মে। গ্রাম বাংলার হাট উৎসব বা মেলায় বায়োস্কোপের উপস্থিতি ছিলো চোখে পড়ার মতো। বায়োস্কোপওয়ালারা তাদের বাযোষ্কোপ নিয়ে কখনো হাজির হতো বাড়ির আঙিনায, স্কুলের গেইটে, হাটের গলিতে কিংবা গ্রাম বাংলার কোনো চৌরাস্তার মোড়ে। এখন সেসব স্মৃতি শুধুই অতীত। বায়োস্কোপওয়ালার আহবানে শিশুকিশোররা দল বেঁধে ছুটে আসতো। এ যেন এক হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার বাঁশির সুরে ছুটে আসা। সেই ছুটে আসা শিশুকিশোরদের চোখমুখে থাকতো এক ধরনের উন্মাদনা কৌতূহল ও বিস্ময়। ছোট পর্দাসম্বলিত কাঠের বাক্সের ভেতরে যে ছবি বা স্লাইড রাখা হতো তা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখানো হতো আর সঙ্গে সঙ্গে চলতো বায়োস্কোপওয়ালার কণ্ঠে ছন্দময় গান। গ্রামবাংলায় একসময় যখন বিদ্যুৎ ছিল না, সিনেমা হল ছিল কল্পনার অতীত, তখন বায়োস্কোপ ছিল সিনেমারূপী বিনোদনের বিচিত্র এক অভিজ্ঞতা। একসময় বায়োস্কোপ শুধু বিনোদনের মাধ্যমই ছিল না, ছিল সামাজিক যোগাযোগের অন্যতম অনুষঙ্গ। এই বায়োস্কোপের ছলে মানুষ এক জায়গায় জড়ো হতো, গল্প করতো, হাসি ঠাট্টায় মেতে উঠতো। বায়োস্কোপ হচ্ছে গ্রাম বাংলার লোকসংস্কৃতির এক টুকরো রঙিন ইতিহাস। যে ইতিহাসের পটভূমি রচিত হতো গ্রামীণ মেলা, হাটে–বাজারে কিংবা পাড়ার অলিতে–গলিতে। একদল শিশুর কলকাকলি আর বায়োস্কোপ চালাতে চালাতে বায়োস্কোপওয়ালার কণ্ঠে বেজে উঠতো ‘কী চমৎকার দেখা গেল/ ঢাকা শহর আইসা গেল/ ঢাকার পরে মক্কা এল/ মক্কা শহর দেখিয়া লও/ মক্কাতে হাজিরা গেল/ কী চমৎকার দেখা গেল…’ এমন গানের সুর। সুর শুনলেই শিশুকিশোররা মায়ের কাছে দুএক পয়সা চেয়ে নিয়ে বায়োস্কোপ দেখতে ছুটে যেতো। রঙিন পোশাক পরে একটা খঞ্জনি বা ডুগডুগি নিয়ে বায়োস্কোপওয়ালা ছড়াও কাটতেন। সুর করে করে ভেতরের ছবির বর্ণনা দিতেন, যা দর্শকদের কল্পনার জগতকে আরও উস্কে দিত। বায়োস্কোপের কাঠের বাক্সের গায়ে গোল চশমার মত যে কাচ বা লেন্স লাগানো থাকতো সে কাচে চোখ রেখে শিশুকিশোররা অদ্ভুত এক রঙিন দুনিয়া দেখতো। বাক্সের ভিতরে একটি চরকার মত হাতল দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পর পর ছবি পরিবর্তন করা হতো। আজ প্রযুক্তির জোয়ারে তা হারিয়ে গেলেও বাঙালির স্মৃতির পাতায় এখনো বায়োস্কোপ ঠিক চিরসবুজের মত। আধুনিক সময়ের ডিজিটাল স্ক্রিন বা সিনেমার একটি আদিরূপ ছিল বায়োস্কোপ। সেই সময়ের বায়োস্কোপে সাধারণত মক্কা–মদিনা, তাজমহল, ঢাকার আহসান মঞ্জিল বা লালবাগ কেল্লা, রামায়ণ–মহাভারতের দৃশ্য বা কারবালার কাহিনী, সিনেমার নায়ক–নায়িকা, বাঘ–সিংহের লড়াই কিংবা কোনো রূপকথার গল্প দর্শকদের মনোরঞ্জনের জন্য পরিবেশন করা হতো। প্রযুক্তির আগমনের কারণে ঘরে ঘরে টেলিভিশন এবং সিনেমা হলের বিস্তৃতির ফলে বায়োস্কোপ তার আবেদন হারিয়েছে সত্য, কিন্তু এখন শিশুদের বিনোদনের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে হাতের স্মার্টফোন, ইউটিউব আর অনলাইন গেমস। ফলে কাঠের বাক্সের ভেতরের স্থির ছবি আর নতুন প্রজন্মকে কাছে টানে না। বায়োস্কোপ দেখিয়ে আর সংসার চলে না বলে এই শিল্পের কারিগররা জীবিকার তাগিদে অন্য পেশায় চলে গেছেন। শুধু প্রযুক্তি নয় অর্থনৈতিক কারণেও এ শিল্পের পতন ঘটেছে। আগে সামান্য খরচে যেখানে বায়োস্কোপ প্রদর্শন হতো সেখানে, এখন সেই আয়ে আর জীবন চলে না। একটি গবেষণায় দেখা গেছে বিগত দুই দশকে বাংলাদেশে বায়োস্কোপ প্রদর্শনের হার ৯০ শতাংশ কমে গেছে। সেই বায়োস্কোপওয়ালাদের অনেকেই আজ দিনমজুর, দোকানদার কিংবা ছোট খাটো কোনো পেশাকে বেছে নিয়েছে। বায়োস্কোপ ছিল গ্রামীণ সমাজের একটি সাংস্কৃতিক আচার। এটি মানুষকে একীভূত করে একটি সামাজিক বন্ধন সৃষ্টি করতো এবং মানুষের কল্পনার জগতকে প্রসারিত করতো। বায়োস্কোপের বিলুুপ্তি মানে শুধু একটি পেশারই অবসান নয়, একটি ইতিহাসের পরিসমাপ্তি।
লেখক: প্রাবন্ধিক, শিশুসাহিত্যিক, কলেজ শিক্ষক।











