আষাঢ়স্য গুমোট ভাবের আছর পড়েছে মনেও।
নাহ, আজো বাইরে চকচকে রূপালি রাংতা মোড়া আকাশ থেকে ঝরছে অবিরল, ঝকঝকে তিরের ফলার মতো রোদ। মানে বরাবর এখানকার দিনগুলো যেমন দেখে আসছি, ব্যতিক্রম হয়নি তার আজো। হ্যাঁ ব্যতিক্রম দেখেছিলাম শুধু শামালের কয়েকদিন। ঐ সময় সাময়িক কালের জন্য মরচে পড়েছিল চারিদিকে। তবে সপ্তাহখানেকের ঝামা ঘষাঘষিতেই ফিরেছিল দিনগুলোর বরাবরের রুপালি ধার।
মাঝে সাঝে আচমকা বৃষ্টি হওয়ার কথা শুনলেও, হয়নি দেখা তার। অতএব আষাঢ়হীন মরুতে আবহাওয়াজনিত আষাঢ়শ্য গোমরা চেহারা দেখার প্রশ্নই উঠে না। বলছি অফিসিয়াল মানবিক সম্পর্কের বিষয়ে।
বেশ কিছুদিন ধরেই অনুভব করছি থমথমে ভাব অফিসে। ফলে আষাঢ়হীন মরুতে কালেভদ্রে হলেও যে আষাঢ়ে আড্ডা জমতো, জমছে না তা, বেশ অনেকদিন। দমবন্ধ দমবন্ধ লাগছে তাই।
সমস্যা হচ্ছে এ কারণে কাউকে দায়ি করে ভারমুক্ত হতেও পারছি না। কারণ দায়ি হলাম স্বয়ং এ শর্মা নিজে। হালাল প্যাকেজে হারাম মাল পাচার করার এখানকার একটা প্রচলিত আচার, বদলে দেবার জন্য অনেক ভেবে চিন্তে সেদিন যে একটা আপাত নিরীহ টাইপের ই–মেইল দিয়েছিলাম; কোম্পানি জুড়ে। বিধেছে সেটিই কারো কারো বুকে শক্তিশেল, হয়ে। সেই শুরু অস্বস্তিকর এই অবস্থার।
একটা বিজনেস ক্লাস টিকিট বদলে দুটো ইকোনমি ক্লাসের টিকিটে সঙ্গিনীসহ চিকিৎসকদের বিদেশের সেমিনারে পাঠানোর কোম্পানির নিয়মবিরুদ্ধ এই ব্যাপারটি যে এখানে ওপেন সিক্রেট, টের পেয়েছিলাম। যা ঠিক নয় তা ঘটলে, কাকের মতন চোখ মুদে, ঘটছে না কিছুই, বলতে না পারার ব্যর্থতার দায় তো অন্য কারো নয়!
ইভেন দ্য ডারকেস্ট ক্লাউড হ্যাজ এ সিল্ভার লাইনিং। হাঁসফাঁস করতে করতে মনে পড়েছিল এই আপ্তবাক্যটি। ফলে রূপালি রেখার খোঁজে প্রথমে তাইওয়ানের কান্ট্রি হেড আমার মেন্টর অ্যালেক্সের দরজার নেড়েছিলাম কড়া। অনেকদিন পর, তিন দিন আগে তারা সাথে ঘণ্টাখানেকের টেলিফোনিক মেন্টরিং সেশন শেষে, হয়েছিলাম কিছুটা হালকা। আমার এসাইনমেন্টটাকে বাংলার পলি থেকে মিসকিনের উড়ে এসে পেট্রোডলারে জুড়ে বসা সম যে অনেকের কাছে, তা তো জানিই। থাকি দ্বিধায় প্রায়শই তাই। ভুল করে ফেলছি না তো, কোন কিছু? চলে নিরন্তর খোঁচাখুঁচি মনে! অ্যালেক্সের সাথের ঐ মন হালকা সেশনের পর, ঠিক করেছিলাম, থাকবো না আর বদ্ধ ঘরে। ঘুরবো দুয়েকদিন মরুর মুক্ত বাতাসে। অতএব, খলিলের অফিসে চা খেতে খেতে বলেছিলাম, কাজ করতে চাই ফিল্ডে তার জর্ডানি রিপ্রেজেন্টেটিভ আনাসের সাথে। ভেবেছি কিছুটাও যদি ফিকে হয় দুজনের মাঝখানে জমে উঠা কালো মেঘ। হিতে বিপরীত হতে যাচ্ছিল প্রায়। হাস্যোজ্বল খলিল, সন্ধিগ্ন হয়ে চোখ পিট পিট করতে জিজ্ঞেস করে বলেছিল-“ফিল্ডে কাজ করবে ভাল কথা, কিন্তু আনাসের সাথেই কেন?”
দ্রুত ব্যাখ্যায় বুঝিয়েছিলাম, নাহ বিশেষ কোন কারণ নাই। ওর সাথে একদিন দেখা হওয়ার পর, পরিচিতিপর্বে বলেছিলাম কাজ করবো ওর সাথে। কাষ্ঠ হাসি হেসে খলিল করে দিয়েছিল অতঃপর ব্যবস্থা। আনাসের সাথে কাজ করতে গিয়ে তার কথায় ও আচার আচরণে বুঝেছি, আমার ই–মেইল অফিসে ঘন মেঘের ঘনঘটা তৈরি করলেও, ফিল্ডে তুলেছে ঝড়! বিশ্বাস তাদের, পরাজয়ই নিয়তি আমার। নিশ্চিত ওরা, সৌদি স্টাইল আমি বুঝি না। এ যে শুধু সেলসের লোকজনেরই বিশ্বাস, তাও নয়। ঐ ধারনার গোঁড়ায় ঢালছে পানি, আমার টিমেরও দুয়েকজন! আঁচও করেছিলাম তা। আনাসের সাথে কাজে গিয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। কিন্তু ভোগাচ্ছে বেশী যা, তা হল মেডিক্যাল ডিরেক্টর সামি আজমির দু’মুখো সাপের ভূমিকা। ঐ মেইল পাওয়ার পর পরই সেই প্রথম আমার অফিসে ঢুকে উচ্চকণ্ঠে প্রশংসা করেছে। তারপরই তাকে নানানজনের সাথে সন্দেহজনক গুঁজ গুঁজ করতে দেখেছি।
সাথে ছিল কমপ্লায়েন্সের দায়িত্ব ঘাড়ে নিয়ে সারাক্ষণ ছোক ছোক করে বেড়ানো আহমেদ মতোয়াল্লি। এই জুটির কাজ কারবার, অহরহই মনে করিয়ে দেয় বাংলার, শুঁড়ির সাক্ষী মাতাল কথাটি। আশার কথা,ঐ ই মেইলের কারণে এরই মধ্যে ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠা খলিল ধূম মেরে গেলেও, ঐ দুজনের সাথে একাট্টা হয়নি সে। সে যাক, এবার ফিল্ডে কাজ করতে গিয়ে, সৌদি রোগীদের সংস্কৃতি বিষয়ক একটা বদ্ধমূল ধারণা আমার খেয়েছে বেজায় ধাক্কা। শরিয়াহ পুলিশ, মতোয়াল্লিদের বেত নিয়ন্ত্রিত এ সমাজে ঘরের বাইরে নারীদের চলাচল যে অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত, তা তো সর্বজনবিদিত সত্য। তাতেই ধরেই নিয়েছিলাম উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে উচ্চমাত্রার কোলেস্টেরল বা চিনির উপাস্থিতির খবর পায় না সহজে নারীরা।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় লাইফ স্টাইল ডিজিজ বা যাপিতজীবনজনিত এই রোগগুলো মূলত কোন ধরনের বিরক্তিকর উপসর্গহীন। বাঁধে বাসা দেহে এই রোগগুলো নীরবে। প্রায়শই পড়ে ধরা তা, অন্য কোন বিরক্তিকর বা অসহ্য উপসর্গের কারণে কেউ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলেই। না হয় এ রোগগুলো চুপচাপ কুড়ে কুড়ে খেতে শুরু করে দেহের নানান অঙ্গ ও অংশ। এপর্যন্ত সাদা চোখে সৌদি সমাজের জীবনযাত্রার যা দেখেছি, বুঝেছি তাতে সৌদি পুরুষরা কাজ তো নয়, ইয়ারবক্সিদের সাথে গুলগাপ্পি আড্ডা মারার জন্য সকাল বেলা বের হওয়ার পর, ঘরে ফিরে গভীররাতেই। অতএব এই সময়ের মধ্যে ঘরের নারীদের কোন সমস্যার জন্য তাদেরকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ার ফুরসৎ কই তাদের?
অন্যদিকে নারীদের একাকী বাইরে যাওয়াও নিষিদ্ধ। নেই অনুমতি তাদের গাড়ী চালানোরও। এইসব বিষয় ধর্তব্যে এনে মনে মনে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়েছিল, পেট্রোডলারে চমকে, সৌদি সমাজের জাকজমকের উজ্জ্বলতা বাড়াতে নারীদের দেহে হীরকসহ নানান রঙের বহুমূল্যে পাথর গণ্ডায় গণ্ডায় শোভা পেলেও, শরীরের ভেতরে বাসা বাঁধা নীরব ব্যাধিগুলোর হয়তো কোনো খোঁজই পায় না তারা। হয় না তাই চিকিৎসাও নিয়ে গিয়েছিল আনাস রিয়াদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বেসরকারী হাসপাতাল সুলায়মান হাবিবে। ওখানকার হৃদরোগ বিভাগে প্রচুর বোরকার উপস্থিতিতে, লেগেছিল খটকা তাই। ভাবছিলাম ঘটনা কী? এনারা কি এই হাসপাতালে ভর্তি, তাদের পরিবারের কারো খোঁজ নিতে আসা আত্মীয় নাকি সব? মনের সেই, ধন্দ দূর করার জন্য জিজ্ঞেস করেছিলাম, আনাসকেই প্রথম। যতই সে আমার সাথে দেখা হলেই, তার সাথে কাজ করার কথা মনে করিয়ে দিয়ে থাকুক না কেন, কাজে নেমে হয়ে পড়েছে বেচারা নার্ভাস বেশ। এদিকে আমি করেছি ঐ আচানক প্রশ্ন। ভড়কে গিয়েছিল বেচারা তাই। তদুপরি নীরব চাহনি তার বলছিল, বসরা এসব তো জিজ্ঞেস করে না! তাদের জিজ্ঞাসা তো থাকে টার্গেট আর এচিভমেন্ট নিয়েই।
আমতা আমতা করতে থাকা কোম্পানির টপ পারফর্মারদের একজন আনাসকে তাই দ্রুত প্রশ্নটা গিলে ফেলে তার পারফরমেন্সের জন্য মোবারকবাদ জানিয়েছিলাম। তাঁকে চাঙ্গা করার নিমিত্তে। তবে প্রশ্নটা খোঁচাচ্ছিল গলায়। ফলে ডাক্তারের সাথে আনাসের কথা শেষ হবার পর, ডাক্তার সাহেবকেই জিজ্ঞেস করেছিলাম ঐ নারী সমাগম বিষয়ে।
সুদর্শন মিশরি ডাক্তার সাহেবও পড়েছিলেন ধন্দে তাতে। তাকিয়েছিলেন এই বাঙ্গালোর দিকে অবাক হয়ে। সঙ্গে সঙ্গেই খোলাসা করেছিলাম সৌদিসমাজ সংস্কৃতি বিষয়ক নিজ অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণভিত্তিক অনুমানটি। হাসতে হাসতে বলেছিলেন, “ইন্টারেস্টিং অব্জারভেশন। তবে শোন, আমরা ডাক্তাররা সৌদি সমাজের আরো ভিতরের খবর জানি কিন্তু! যা অন্য কেউ দেখে না, জানে না।” কোনই সন্দেহ নাই। সেইজন্যইতো শরণাপন্ন হলাম আপনার! “শোন সৌদি মহিলাদের ঘর থেকে বেরুবার মাত্র দুটো ছুতা আছে। তার একটা হল শপিং। আরকেটা হল হাসপাতালে আসা। অতএব মাথা ঘোরা, হাঁটু ব্যথা, পেট ব্যথা, মাথা ব্যথা, এসব ছুতায় চলে আসে হাসপাতালে।” কিন্তু মাহরাম ছাড়া তো তারা বেরুতে পারে না। “হা হা। এখানকার ছেলেরা পড়ালেখায় মোটেও সিরিয়াস না। অতএব, গাড়ি চালিয়ে তাদের শপিংমলে বা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য, টিনএজ নিজের ছেলে, ভাগ্নে বা ভাতিজাদের পাওয়া যায় হাতের কাছেই। আবার ছেলেরাওতো গাড়ি চালানোর সুযোগের জন্য থাকে মুখিয়ে। অতএব সমাধান তো আছেই হাতের কাছে। আর প্রতিদিন শপিংমলে যাওয়া তো যৌক্তিকও না। সেক্ষেত্রে হাসপাতালই তো নিরাপদ। তাই না?” তার মানে তো বিষয় উল্টা। নারীদের তাহলে পুরুষদের চেয়ে ঐ নীরব ঘাতক রোগগুলোর ডায়াগনসিস বেশি হয়। তাই কী?
“বলতেই পারো তা। এছাড়া হাসপাতালের চত্বরে কফিশপ, ফাস্ট ফুডঃ শপ সহ নানান দোকানপাঠও তো আছে। বান্ধবীদের নিয়ে আড্ডা দেবার জন্যও তো এ চমৎকার সুযোগ। ছেলেরা তো মারে আড্ডা ইয়ারবক্সিদের সাথে মরুভূমির রেস্টুরেন্টে, শিশা বারে। অসুখের ধাক্কায় বা দুর্ঘটনায় শয্যাসায়ি না হয়ে পড়লে তো হাসপাতাল, ডাক্তার বিষয়ে মোটেও ঘামায় না মাথা তারা।” ওয়াও! অসংখ্য অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে। এভাবে তো ভাবিনি!
“হুম বুঝেছি। তবে কি জানো? এইরকম প্রশ্ন আমিও আগে কখন শুনিনি। এখন মনে হচ্ছে বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তা তোমার দেশ কোথায়?” বাংলাদেশ। শুনে কিছুক্ষণ চুপচাপ আমাকে জরিপ করে রহস্যময় হাসি হেসে বললেন –
“আমার এক রোগিনী আছেন, পারলে সপ্তাহে প্রতিদিনই আসেন। প্রথমে নিজের সমস্যা নিয়ে এসেছিলেন। তারপর দেখি একদিন বোন, তো আরেকদিন খালা, অন্যদিন প্রতিবেশিনি, এমন কি একদিন তার শ্রীলংকান মেইডকেও দেখাতে নিয়ে এসেছে।” খুব কেয়ারিং নারী। খুবই কনফিডেন্স আপনার উপর, বুঝতে পারছি!
“আরে নাহ! বিষয় অন্য। বুঝলে না। ভাবতেছি কোন যে ঝামেলায় পড়তে যাচ্ছি। কিভাবে যে এড়াই বুঝতে পারছি না।” বলেই চোখে চোখ রেখে চোখ টিপে ফের হাসলেন মুচকি। ততোক্ষণে নার্স পরবর্তী রোগীর কাগজপত্র নিয়ে ঢুকতেই, আমিও হাসতে হাসতে, কিছুদিন পর ফের এসে ঐ রোগিণীর আপডেট নিয়ে যাবো বলে ধন্যবাদ দিয়ে বেরুচ্ছিলাম যখন, উচ্চ হাসি তার নিয়েছিল পিছু আমাদের। ফিল্ডে কাজ করার এ এক বিরাট সুবিধা। শুধু তো মার্কেটের না, এমনকি সমাজেরও জানা যায় এমন সব বিষয়, যা অফিসের চার দেয়ালের অতিক্রম করে ঢুকতে পারে না। সে যাক মনের আষাঢ়শ্য অস্বস্তি কাটানোর চেষ্টা করছিলাম যখন গত বেশ কয়েকদিন ধরে, এরই মধ্যে পেলাম খারাপ খবর। ডেডলাইন মিস হওয়ায়, হেডকোয়ার্টারকে বার দুয়েক অনুনয় বিনয় করে সময় বাড়িয়ে নিয়েছিলাম। তারপরও ডিস্ট্রিবিউটরের টেন্ডার ব্যবসার এক্সপার্ট নাহরাওয়ি, আমাদের সদ্য আবিষ্কৃত সোয়াইন ভ্যাক্সিন ঠিক কতোটা লাগতে পারে সৌদির, এমন প্রজেকশন বের করতে পারেনি স্বাস্থ্যবিভাগ থেকে। অর্থাৎ নিশ্চিত হাতছাড়া হয়ে গেছে ঐ ব্যবসা! “সালামালাইকুম ড. সেলিম । উই হ্যাভ এ ভিডিও কনফারেন্স উইথ বাসেল আফটার টেন মিনিটস”। হাসছে দরজায় এ অফিসে আমার গুরুত্বপূর্ণ রুপালি রেখা আহমেদ নাশাত। আসন্ন মিটিংয়ের কথা সে মনে করিয়ে দিতেই, ওকে, ইয়েস ইয়েস। লেটস গো মুভ, বলেই উঠলাম চেয়ার ছেড়ে। স্মার্ট, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার কর্মঠ এই মিশরি তরুণটি অত্যন্ত পছন্দের আমার। এখানে আসার পর হেড কোয়ার্টার থেকে আগে গ্রিন সিগন্যাল পাওয়া ওর প্লান নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারিনি। ফলে বলেছিলাম কেঁচে গণ্ডূষ করতে হবে। তাতে, প্রথমে সে মন খারাপ করলেও, যখনই কিছু প্রশ্ন তুলে বলেছিলাম, ওগুলোর উত্তর খুঁজে পাইনি তার প্লানে, কিন্তু উত্তরগুলো তো আমার চাইই, চাই।
লেখক : প্রাবন্ধিক, ভ্রমণ সাহিত্যিক।












